চাঁদমুখোনি হইতে মেঘটা সরিয়া গিয়া হাসি ফোটো তখন আমাদের দুইজনের মধ্য হইতে প্রথম ভাগের ব্যবধানটা একেবারে বিলুপ্ত হইয়া যায় এবং রাণু দিব্য সহজভাবে তাহার গিন্নীপনার ভূমিকা আরম্ভ করিয়া দেয়। এই সময়টা সে হঠাৎ এত বড় হইয়া যায় যে, ছোেট ভাইটি হইতে আরম্ভ করিয়া বাপ, খুড়া, ঠাকুরমা, এমন কি ঠাকুরদাদা পর্যন্ত সবাই তাহার কাছে। নিতান্ত ক্ষুদ্র এবং স্নেহ ও করুণার পাত্র হইয়া পড়ে। এই রকম একটি প্রথম ভাগ ঘেঁড়ার দিনে কথাটা এইভাবে আরম্ভ হইল—”কি করে শাসন করব বল মেজকা? আমার কি নিশ্বেস ফেলবার সময় আছে, খালি কাজ কাজ—আর কাজ।”
হাসি পাইলেও গম্ভীর হইয়া বলিলাম, “তা বটে, কতদিকে আর দেখবে?”
“যে দিকটা না দেখেছি সেই দিকেই গোল— এই তো খোকার কাণ্ড চোখেই দেখলে! কেন রে বাপু, রাণু ছাড়া আর বাড়িতে কেউ নেই? খাবার বেলা তো অনেকগুলি মুখ বল মেজকা! আচ্ছা, কাল তোমার ঝাল-তরকারিতে নুন ছিল?”
বলিলাম, “না, একেবারে মুখে দিতে পারি নি!”
“তার হেতু হচ্ছে, রাণু কাল রান্নাঘরে যেতে পারে নি—ফুরসৎ ছিল না। এই তো সবার রান্নার ছিরি! আজ আর সে রকম কম হবে না, আমি নিজের হাতে দিয়ে এসেছিনুন।”।
আমার শখের ঝাল-তরকারি খাওয়া সম্বন্ধে নিরাশ হইয়া মনের দুঃখ মনে চাপিয়া বলিলাম, “তুমি যদি রোজ একবার করে দেখ মা—”
গলা দুইটি অভিমানে ভারী হইয়া উঠিল। —”হবার জো নেই মেজকা, রাণু হয়েছে বাড়ির আতঙ্ক। “ওরে, ওই বুঝি রাণু ভাঁড়ার ঘরে ঢুকেছে রাণু বুঝি মেয়েটাকে টেনে দুধ খাওয়াতে বসেছে, দেখ দেখ তোকে কে এত গিন্নীত্ব করতে বললে বাপু?’ হ্যাঁ মেজকা, এত বড়টা হলুম, দেখেছ কখনও আমায় গিন্নীত্ব করতে-ক-খ-নও—একরত্তিও?”
বলিলাম, “বলে দিলেই হল একটা কথা, ওদের আর কি!”
“মুখটি বুজে শুনে যাই একজন হয়তো বললেন, “ওই বুঝি রাণু রান্নাঘরে সেঁধোল!’ রাঙী বেড়ালটা বলে, আমি পদে আছি। কেউ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ওরে রাণু বুঝি ওর বাপের’ আচ্ছা। মেজকা, বাবার ফুলদানিটা আমি ভেঙেছি বলে তোমার একটুও বিশ্বাস হয়?’
এ ঘটনাটা সবচেয়ে নূতন গিন্নীপনা করিয়া জল বদলাইতে গিয়া রাণুই ফুলদানিটা চুরমার করিয়া দিয়াছে, ঘরে আর দ্বিতীয় কেহ ছিল না আমি বলিলাম, “কই, আমি তো মরে গেলেও এ কথা বিশ্বাস করতে পারি না।”
ঠোঁট ফুলাইয়া রাণু বলিল, “যার ঘটে একটুও বুদ্ধি আছে, সে করবে না। আমার কি দরকার মেজকা, ফুলদানিতে হাত দেবার? কেন, আমার নিজের পেরথোম ভাগ কি ছিল না যে, বাবার ফুলদানি ঘাঁটতে যাব?”
প্রথম ভাগের উপর দরদ দেখিয়া ভয়ানক হাসি পাইল, চাপিয়া রাখিয়া বলিলাম, “মিছিমিছি দোষ দেওয়া ওদের কেমন একটা রোগ হয়ে পড়েছে।”
দুষ্টু একটু মুখ নীচু করিয়া রহিল, তাহার পর সুবিধা পাইয়া তাহার সদ্য দোষটুকু সম্পূর্ণরূপে স্খালন করিয়া লইবার জন্য আমার কোলে মুখ খুঁজিয়া আরও অভিমানের সুরে আস্তে আস্তে বলিল, “তোমারও এ রোগটা একটু একটু আছে মেজকা,—এক্ষুনি বলছিলে, আমি পেরথোম ভাগটা ছিঁড়ে এনেছি!”
মেয়ের কাছে হারিয়া গিয়া হাসিতে হাসিতে তাহার কেশের মধ্যে অঙ্গুলি সঞ্চালন করিতে লাগিলাম।
বই হারানো কি ছেঁড়া, পেট-কামড়ননা, মাথা-ব্যথা, খোকাকে ধরা প্রভৃতি ব্যাপারগুলো যখন। অনেক দিন তাহাকে বাঁচাইবার পর নিতান্ত একঘেয়ে এবং শক্তিহীন হইয়া পড়ে, তখন দুই-এক দিনের জন্য নেহাত বাধ্য হইয়াই রাণু বই স্লেট লইয়া হাজির হয়। অবশ্য পড়াশুনো কিছুই হয় না।প্রথমে গল্প জমাইবার চেষ্টা করে। সংসারের উপর কোনো কিছুর জন্য মনটা খিচড়াইয়া থাকায় কিংবা অন্য কোন কারণে যদি সকলের নিজ নিজ কর্তব্য সম্বন্ধে আমার মনটা বেশি সজাগ থাকে তো ধমক খাইয়া বই খোলে তাহার পর পড়া আরম্ভ হয়। সেটা রাণুর পাঠাভ্যাস, কি আমার ধৈর্য, বাৎসল্য, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি সদগুণের পরীক্ষা তাহা স্থির করিয়া বলা কঠিন। আড়াইটি বৎসর গিয়াছে, ইহার মধ্যে রাণু ‘অজ-আম’র পাতা শেষ করিয়া ‘অচল-অধম’র পাতায় আসিয়া অচলা হইয়া আছে। বই খুলিয়া আমার দিকে চায়—অর্থাৎ বলিয়া দিতে হইবো আমি প্রায়ই পড়াশুনার অত্যাবশ্যকতা সম্বন্ধে একটি ক্ষুদ্র উপদেশ দিয়া আরম্ভ করি, “আচ্ছা রাণু, যদি পড়াশুনা না কর তো বিয়ে হলেই যখন শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে—মেজকাকা কি রকম আছে, তাকে কেউ সকালবেলা চা দিয়ে যায় কি না, নাইবার সময় তেল কাপড় গামছা দিয়ে যায় কি না, অসুখ হলে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় কি না—এসব কি করে খোঁজ নেবে?”
রাণু তাহার মেজকাকার ভাবী দুর্দশার কথা কল্পনা করিয়া মৌন থাকে, কিন্তু বোধ হয় প্রথম ভাগ-পারাবার পার হইবার কোন সম্ভাবনাই না দেখিয়া বলে, “আচ্ছা মেজকা, একেবারে দ্বিতীয় ভাগ পড়লে হয় না? আমায় একটুও বলে দিতে হবে না। এই শোন না—ঐক-য়ে য-ফলা—”
রাগিয়া বলি, “ওই, ভেঁপোমি ছাড় দিকিন, ওইজন্যেই তোমার কিছু হয় না। নাও, পড়। সেদিন কত দূর হয়েছিল? ‘অচল’ ‘অধম’ শেষ করেছিলে?”
রাণু নিষ্প্রভভাবে ঘাড় নাড়িয়া জানায়, “হ্যাঁ।”
বলি, “পড় তা হলে একবার।”
‘অচল’ কথাটির উপর কচি আঙুলটি দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। আমার মাথার রক্ত গরম হইয়া উঠিতে থাকে এবং স্নেহ, করুণা প্রভৃতি স্নিগ্ধ চিত্তপ্রবৃত্তিগুলো বাষ্প হইয়া উড়িয়া যাইবার উপক্রম হয়। মেজাজেরই বা আর দোষ দিই কি করিয়া? আজ এক বৎসর ধরিয়া এই ‘অচল’ ‘অধম লইয়া কসরৎ চলিতেছে, এখনও রোজই এই অবস্থা।
