বিনোদ বাঁড়য্যে চিতায় কাঠ ঠেলে দিয়ে ফিরে এসেচে। দুই বন্ধুর মুখের বিরাম নেই। এবার তারা কার বিয়ের কথা আলোচনা করছে—বোধ হল বিনোদ বাঁড়য্যের ভাইয়ের। বিনোদ এক পয়সা সাহায্য করতে পারবে না। ভ্রাতৃদ্বিতীয়াতে বিনোদের বউ ওর কাছে টাকা চেয়েপাঠিয়েছিল, সে দুটো টাকা বাড়িতে মনিঅর্ডার করে দেয়।
—সোজা লিখে দিলাম দু-টাকার বেশি হবে না—এতে ভাইদুতিয়েই করো—
বিনোদের বন্ধুটি বললে—আর বোনদুতিয়েই করো—হি-হি-কী বলো?
বিনোদ দু-পাটি দাঁত বার করে হেসে বলল—হ্যাঁ হ্যাঁ–তাই বলি, বিয়ে করলেই হয় না। তুলো দেখতে নরম, ধুনতে লবেজান—বিয়ে করে এই বাজারে সংসারটি চালানো—সে বড়ো ঠ্যালা।…
রাত অনেক বেশি—বোধ হয় এগারোটা। হালিশহর জুট মিলের আলোর সারি নিবে গিয়েছে। প্রকাণ্ড একটা অশরীরী পাখি যেন জ্যোতির্ময় পাখা মেলে গঙ্গার ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে, এক-একবার সেটা যেন জলের কাছাকাছি আসচে, স্নিগ্ধ জ্যোতির বিশাল প্রতিবিম্ব ফুটে উঠচে গঙ্গার বুকে—আবার যখন দূরে চলে যাচ্ছে, তখন অল্প সময়ের জন্য সে জায়গাটা অন্ধকার—আবার আলো ফুটে উঠল, আবার অন্ধকার।
এতক্ষণ ভদ্রলোকটি চিতার শিয়রের একটু দূরে চুপ করে বসেছিলেন। হঠাৎ তিনি আমার পাশে উঠে এলেন। বল্লেন—খোকা বোধ হয় এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে—কী বলেন?
—হ্যাঁ এতক্ষণ নিশ্চয়ই।
খানিকটা চুপ করে থেকে বল্লেন—কাল সকালে নৈহাটিতে দুধ পাওয়া যাবে না মশাই?
—অভাব কী? সেজন্য ভাববেন না। সে জোগাড় হয়ে যাবে।
একটু চুপ করে থেকে আমি জিজ্ঞেস করলুম—আপনারা কোথায় যেতেন? পশ্চিমে কোথাও বুঝি?
ভদ্রলোক বললেন–পশ্চিমে বেশি দূর নয়—আমি যাচ্ছিলাম আসানসোেলে। সেখানে চাকরি করি। অনেক দিন চাকরি খুঁজে বেড়িয়ে বেড়িয়ে শেষে ওইটি জুটিয়েছিলাম। তা চাকরিও করচি আজ এক বছর। এতদিন রেলবাবুদের মেসে খেতাম, আশ্বিন মাসে মেসে খেয়ে খেয়ে ডিসপেপসিয়া গোছের দাঁড়াল। এত ঝাল দেয় মশাই, অত ঝাল খাওয়া আমার অভ্যাস নেই। আমার স্ত্রী বললে—যা পাও, একটা বাসা করো, আমাদের দুজনের খুব চলে যাবে। তোমারও কষ্ট থাকবে না, আমারও এখানে তোমায় বিদেশে ফেলে থাকতে ভালো লাগে না। তাই এবার বাসা করে বড়োদিনের ছুটিতে একে আনতে যাই শ্বশুরবাড়িতে—সেখানেই বিয়ের পর আজ চার-পাঁচ বছর রেখেছিলাম। দেশে আমার বাড়িঘর সবই আছে, কিন্তু সেখানে মশাই শরিকি গোলমাল। সেখানে ওকে রাখার অনেক অসুবিধে-বার দুই নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতেই জানি।
আমি বললুম—ওঁর কী কোনো অসুখ ছিল—হঠাৎ এমন—
—অসুখের কথা তো কিছুই জানিনে। তবে মাঝে মাঝে বুক ধড়ফড় করত বলতে শুনেচি।…অসুখটা আমার বাড়িতে যখন আনি আর-বছর, তখন বড়ো বেড়েছিল। আমার সে সময় নেই চাকরি, হাতে নেই পয়সা, আর এদিকে বাড়িতে আমার জাঠতুতো ভাইয়ের স্ত্রী—তার যৎপরোনাস্তি দুর্ব্যবহার। এইসবে সংসারে শান্তি তো ছিল না একদণ্ড।…ও আবার ছিল একটু ভালোমানুষ মতো—ওর ওপরই যত ঝক্কি।
খানিকটা আপন মনেই যেন বলতে লাগলেন—কালও বিকেলে কত কথা বলেচে। বাসার কথা আমায় কত জিজ্ঞেস করলে। বলছিল, সেখানে পাতকুয়ো না পুকুর? আমি বললাম—দুই-ই আছে। তবে পুকুরে রেলের কুলি চাপরাশিরা নায় আর কাপড় কাচে—তার চেয়ে তুমি বাসার পাতকুয়োর জলেই নেও। খাবার জন্যে রেলের বাবুদের কোয়ার্টারে টিউবওয়েল আছে—নিকটেই সেখান থেকে জল আনাব। বাসায় পেঁপে গাছ আছে শুনে কত খুশি! বললে, হ্যাঁ গা, ওদেশের পেঁপে নাকি খুব বড়ো বড়ো? কাল দুপুরের পর থেকে বাক্স গুছিয়েছে…মানকচু সঙ্গে নিয়ে যাবে বলে বিকেলে বেছে বেছে বড় মানকচুটা ওর ভাইকে দিয়ে তোলালে। রাত্রে ঘুমোয় না—কেবল বাসার গল্প করে…এ করব…ও করব…আমায় বললে–পেতলের ডেকচিতে খেয়ে খেয়ে তোমার অসুখ হয়েছে…তারা তো আর তেমন মাজে না?…অসুখের আর দোষ কি? সেখানে মাটির হাঁড়ি-কুড়ি পাওয়া যাবে তো?…রাত অনেক হয়েছে দেখে আমি বললাম—শোও ঘুমোও, কাল আবার সারাদিন গাড়ির কষ্ট হবে…রাতদুপুর হল…ঘুমিয়ে পড়ো…কোথায় চলে গেল আজ…আর আমায় বেঁধে খাওয়াতে আসবে না।…
হঠাৎ একটা গোলমাল ও বচসার আওয়াজে ভদ্রলোক ও আমি দুজনেই ফিরে চাইলুম। বিনোদ বাঁড়য্যে ও তার বন্ধু টিকিটবাবুর সঙ্গে কী নিয়ে ঝগড়া বাধিয়েছে এবং আমার মনে হল তারা এমন সব কথা বলচে যা হয়তো তারা স্বাভাবিক অবস্থায় বলতে সাহস করত না টিকিটবাবুকে। বিনোদ বাঁড়য্যে বলচে, যান যান মশাই, অনেক দেখেচি ওরকম—আমরা গড়বাড়ির বাঁড়য্যে-সুতোহাটা পরগনার মধ্যে যেখানে যাবেন ওদিকে তমলুক এস্তেক—আমাদের একডাকে চেনে— ছোটো নজর যেখানে দেখি সেখানে আমরা থাকি না। এই শীতের রাতে কে আসত মশাই?—আমাদের আগে খোলসা করে আপনার বলা উচিত ছিল, তা হলে দেখতাম নৈহাটির বাজার থেকে কোন ব্যাটা পৈতেওলা বামুন আজ মড়া নিয়ে আসত …মুর্দফরাস দিয়ে না-যদি…
ব্যাপার কী উঠে দেখতে গেলুম; বিনোদ বাঁড়য্যে আমায় দেখে বললে, এই তো এই ভদ্দর–লোক রয়েছেন—আচ্ছা বলুন তো আপনি? আমরা সকলের আগে বলে দিয়েছি আমাদের এই চাই, এই চাই…এখন আসলে হাত গুটোলে চলবে কেন? আপনিই বলুন তো?…হ্যাঁ, মানুষ বলি এই বাবুকে…কোনো লোভ নেই, উনি খাবেন না, কিছু করবেন না—উনি এসেছেন মড়া নিয়ে এই শীতে। উনি বলতে পারেন—ওঁর পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় দিতে হয়—
ঝোঁকের মাথায় বিনোদ বাঁড়য্যে সত্যিই আমার পায়ে হাত দেবার জন্যে ছুটে এল। আমি সেখান থেকে সরে পড়লুম—এদের অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ভাগ–বাঁটোয়ারা সংক্রান্ত কথার মধ্যে আমার থাকবার দরকার কীসের?
