শ্মশানঘাট নৈহাটি স্টেশন থেকে প্রায় তিন পোয়া পথ দূরে। বাজার ছাড়িয়ে দক্ষিণে মাঠের মাঝখান দিয়ে পথ, সুমুখে জ্যোৎস্নারাত, সন্ধ্যার পরে মেঘশূন্য আকাশে ফুটফুটে চাঁদের আলো ফুটেচে, কনকনে হাড়কাঁপানো শীত, মাঝে মাঝে পৌঁষ রাত্রির ঠান্ডা হাওয়া বাধাশূন্য প্রান্তরে আমাদের শিরার-উপশিরার রক্ত জমিয়ে দিচ্ছে, তার ওপরে মুশকিল—আমন ধানের জমির ওপর দিয়ে পথ—ধান কাটা হয়ে গিয়েছে, শীতের ঘায়ে ধানের গোড়াগুলো পায়ে যেন কুশাঙ্কুরের মতো বিঁধছিল।
হঠাৎ পিছন থেকে ভদ্রলোক মেয়েমানুষের মতো আকুল সুরে কেঁদে উঠলেন। আমরা অবাক হয়ে ফিরে চাইলুম। টিকিটবাবু বল্লেন—ওকি মশাই ওকি, অত ইয়ে হলে চলবে কেন—ছিঃ—আসুন এগিয়ে আসুন।
পুরুষমানুষকে অমন অসহায়ভাবে কখনো কাঁদতে শুনিনি, তখন বয়স ছিল অল্প, লোকটির কান্না শুনে যেন আমার চোখও অশ্রুসজল হয়ে উঠল। তারপর তিনি চুপ করলেন, আমরা সবাই আবার চুপচাপ চলতে লাগলুম।
শ্মশানে যখন পৌঁছানো গেল, রাত তখন সাড়ে সাতটা হবে। মৃতদেহ চিতায় উঠানো হল। সেই সময় সর্বপ্রথম লক্ষ করলুম বধূটির দু-পায়ে আলতা—কোথাও বেরুতে হলে গ্রামের মেয়েরা পায়ে আলতা পরে থাকে জানতাম, মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল, মেয়েটি কী ভেবেছিল আজ কোন যাত্রার জন্যে তাকে দুপুরে আলতা পরতে হয়েছিল? কপালে খানিকটা সিঁদুর-ভদ্রলোকটি নিজেই দিয়েছিলেন—বধূটিকে সর্বপ্রথম এই ভালো করে দেখে মনে হল সত্যই সুন্দরী। টানা টানা জোড়া ভুরু, পাণ্ডুর বর্ণের গৌর মুখ, অনিন্দ্য দেহকান্তি। মৃত্যুতেও যেন ম্লান হয়নি, মুখের চেহারা দেখে মনে হয় যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে গোলমালে এখুনি ঘুম ভেঙে পড়বে বুঝি।
জ্বলন্ত চিতার একটু দূরে সেই পাউরুটি ভেন্ডার ও তার বন্ধু। পাউরুটি ভেণ্ডার আমার দিকে চেয়ে দাঁত বার করে হেসে বললে—যাক, আজ শীতের রাতটা কাটবে ভালো—কী বলেন? লালু চক্কোত্তির পরোটার দোকানে পরোটা ভাজতে দিয়ে এসেছি। আমাদের শশী আচার্যিকে বসিয়ে রেখে এসেছি, রাত বারোটার মধ্যে
এখানকার কাজ শেষ হয়ে যাবে—গরম গরম বেশ তার বন্ধু বললে—মাংস কতটা? কুলোবে তো?
—বাঃ, জোনাজাৎ দেড়পোয়া হিসেব করে দিয়ে এসেচি—মোট তিন সের— কজন আছি আমরা, তুমি, আমি, যতীনবাবু, যতীনবাবুর ভাইপো লালু, শশী আচার্যি, (আমার দিকে আঙুল দিয়ে) এই বাবু—
আমি বললুম—আমি খাব না।
দুজনেই আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে চাইল। আমার কথা যেন বুঝতেই পারলে লো কিংবা বুঝে বিশ্বাস করতে পারলে না। পাউরুটি ভেন্ডার বললে—খাবেন না কিছু? সে কী মশাই! এই হাড় কনকনে পৌঁষ মাসের রাত, খাবেন না তো এলেন কেন?…পাগল!…তার বন্ধু বললে—খাবেন না কেন? ভালো জিনিস মশাই, আমরা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কিনিয়েচি—খাসা চর্বিওয়ালা খাসি। লালু চক্রবর্তি নিজে রাঁধবে, অমন মাংস-রাঁধিয়ে গঙ্গার এপারে পাবেন না। ওই যে দেখচেন নৈহাটির বাজারের চাটের দোকানখানা—শুধু ওর রান্নার গুণে আজ পনেরো বছর একভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে—দেখবেন খেয়ে
এই সময় টিকিটবাবুর ইশারায় দুজনেই অন্যদিকে একটু দূরে কী জন্যে উঠে গেল এবং একটু পরেই আবার নিজেদের জায়গাটিতে মুখ মুছতে মুছতে এসে বসল। আমায় বললে—আপনার চলে না বুঝি?
আমি বললুম—কী?
—একটু-আধটু…এই শীতের রাতে, নইলে চলে কী করে বলুন,…বেশ ভালো মাল। কেন এদের টিকিটবাবু ডেকেচে ওদিকে, তখন ব্যাপারটা বুঝলুম। ও আমার চলে না শুনে তারা আরও আশ্চর্য হয়ে গেল। এই শীতের রাতে শ্মশানে আসবার স্বার্থটা যে আমার কী, এ তারা ভেবেই পেলে না। আমার দিকে আর কোনো মনোযোগ না-দিয়ে তারা নিজেদের বিষয় কথাবার্তা বলতে লাগল। নৈহাটি স্টেশনে পাউরুটির ব্যাবসা করে আর কেউ কিছু করতে পারবে না। রেল কোম্পানির লাইসেন্সের দাম ক্রমেই বাড়ছে, তার ওপরে শিখেরা এসে চায়ের স্টল খুলে ওদের অর্ধেক ব্যাবসা মাটি করেচে। খরচা ওঠাই দায়! দেশে সুবিধে নেই তাই ওরা পেটভাতায় এখানে পড়ে আছে। নইলে কাঁথিতে ওদের অমন চমৎকার দোকান ছিল—
পাউরুটি ভেন্ডারটির নাম বিনোদ বাঁড়য্যে। সে আর একবার উঠে গেল ওদিকে। আমি ওর বন্ধুকে জিজ্ঞেস কললুম—খাবার-টাবার কত খরচ হল?
—তা প্রায় টাকা সাতেক ধরুন। কিছু মিষ্টিও আছে। তা ছাড়া দু-একটা আপনার তো দেখছি ওসব চলে না।
বিনোদ ফিরে এসে নিজেদের মধ্যে আবার গল্প শুরু করলে। হঠাৎ আমার মনে পড়ল আমার গরম কোটের পকেটে বিস্কুট আছে, নৈহাটির প্ল্যাটফর্মে কিনেছিলুম সেই, কিন্তু খাওয়া হয়নি। টিকিটবাবুর ভাইপোকে ডেকে বললুম—আমার কোটের পকেটে বিস্কুট আছে দয়া করে আমার মুখে খানকতক ফেলে দিন না—আমি এই হাত আর ওতে দেব না—
আমায় ওভাবে বিস্কুট খেতে দেখে টিকিটবাবু অবাক হোলেন। আমি শব ছুঁয়ে স্নান না করেই বিস্কুট খাচ্ছি! আমায় বললেন—আপনার খুব খিদে পেয়েছে দেখচি, তা চলুন নৈহাটিতে ফিরে, খুব খাওয়াব
আমি বললুম—আমি খাব না কিছু। তা ছাড়া আমি স্টেশনের দিকেও যাব না —এখান থেকে সোজা ভাটপাড়া চলে যাব।
—খাবেন না আপনি, সে কী মশাই? না না, তা কী হয়?…অতটা মাংস…ওহে বিনোদ, কাঠ দাও ঠেলে—বসে বসে গল্প-গুজব করবার জন্যে তোমাদের আনা হয়নি।
টিকিটবাবু আমার দিকে চেয়ে আবার কী বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমি তাঁকে সে সুযোগ না-দিয়েই নিজের জায়গাটিতে গিয়ে বসলুম।
