মনে কেমন একটা দুঃখ হল। এই অভাগিনী পল্লিবধূর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উপযুক্ত সম্মান এখানে রক্ষিত হল না। মনে হল ও এখানে কেন? এই জ্যোৎস্নাপ্লাবিত গঙ্গার উদ্দাম তরঙ্গ-ভঙ্গ, এই হিমবর্ষী নক্ষত্রবিরল বিরাট আকাশ, এই অমঙ্গলময়ী মহানিশার মৃত্যু অভিযান—জীবনের নানা ছোটোখাটো সাধ যাঁদের মেটেনি, এ রুদ্ধ আহ্বান তাদের বেলা আর কিছুদিন স্থগিত রাখলে বিশ্বকর্মার কাজের কী ক্ষতিটা হত?…ছোট্ট একটি গৃহস্থবাড়ির দাওয়ায় মেয়েটি খোকাকে কোলে নিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে, সবে সে নদীর ঘাট থেকে গা ধুয়ে এসেছে, পায়ে আলতা, কপালে টিপ, খোঁপাটি বাঁধা—ওকে মানায় জীবনের সেই শান্ত পটভূমিতে—শ্মশানে মাতালের হুড়োহুড়ির মধ্যে ওকে এনে ফেলা যেমনি নিষ্ঠুর তেমনি অশ্লীল…
রাতদুপুর…
বিনোদ বাঁড়য্যে হঠাৎ কী মনে করে আমার পাশে এসে বসল। সে আমার প্রতি অত্যন্ত ভক্তিমান হয়ে উঠেছে…আমি কী করি কোথায় থাকি, বাড়িতে কে কে আছে,–এইসব নানা প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল।
—আপনি মশাই এর মধ্যে মানুষ। মানুষ চিনি মশাই, আজ না-হয় দেখছেন ইস্টিশানে পাউরুটি ফিরি করি…আমরা গড়বাড়ির বাঁড়য্যে…যান যদি কখনো ওদিকে, পায়ের ধুলো ঝেড়ে দিলেই বুঝতে পারবেন—সুতোহাটা পরগনার মধ্যে—
সব শেষ হতে রাত একটা বাজল। চাঁদ ঢলে পড়েছে।
চিতা ধুতে গিয়ে ভদ্রলোক আবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন—আমরা অনেক সান্ত্বনা দিয়ে তাঁকে থামালুম। আমি ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা পিসিমার বাড়ি চলে আসব—ওরা কিছুতেই ছাড়ে না। টিকিটবাবু বললেন— আসুন আসুন, অতটা মাংস খাবে কে? সব গরম গরম পাবেন—আমার বলে দেওয়া আছে—রাত বারোটার পর তবে ময়দায় জল দেবে। গিয়েই গরম গরম…চলুন মশাই…
অতিকষ্টে ওদের হাত এড়িয়ে পিসিমার বাড়ি ফিরলুম। কিন্তু সকালে উঠেই খোকাকে দেখবার ইচ্ছে হল। সাড়ে সাতটার ট্রেনে নৈহাটি গিয়ে ছোটোবাবুর বাসায় হাজির। খোকা নাকি অনেকক্ষণ উঠেছে। ভোরবেলা থেকে মায়ের কাছে যাবার জন্যে কাঁদছিল, বাসার মেয়েরা অনেক কৌশলে থামিয়ে রেখেছেন।
ভদ্রলোকটিও এলেন। তিনি টিকিটবাবুর বাসায় রাত্রে শুয়েছিলেন—দেখে মনে হল রাতে বেশ ঘুমিয়েচেন। খোকা এখন আর কাঁদছে না। বাসার মেয়েরা কমলালেবু দিয়েচে হাতে; তাই খেতে খেতে ঝিয়ের কোলে বাইরে এল। ঝি বললে—কাল ছোটোবাবুর বউ নিজের কোলের কাছে ওকে নিয়ে শুয়েছিলেন। জেগে উঠলেই মুখে মাই দিয়েছেন, রাতের ঘুমের ঘোরে ও ভেবেচে ওর মা। কিন্তু ভোরে উঠেই সে কী কান্নাটা! কেবল বলে ‘মা যাব’ ‘মা যাব’—আহা বাছা আমার, মানিক আমার…
একটু পরে আমি ভদ্রলোককে ট্রেনে তুলে দিতে গেলুম, খোকাকে কোলে নিয়ে। তিনি এই ট্রেনে মুর্শিদাবাদে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবেন। আমায় বল্লেন—কি করে সেখানে ঢুকব মশাই, ভেবে আমার হাত-পা আসছে না। তবে যেতেই হবে, খোকাকে ওর দিদিমার কাছে দিয়ে আসব—নইলে কে দেখবে আর ওকে?
তারপর পাগলের মতো হাসি হেসে বললেন—যাত্রাটা বদলে আসি মশাই, কী বলেন?…হ্যাঁ-হ্যাঁ—
আমি বললুম—টিকিটবাবু কাল আপনাকে কিছু ফেরত দিয়েছেন?
—না, আমিও চাইনি। তবে আজ সকালে একটা ফর্দ দেখাচ্ছিলেন, বলেন সব খরচ হয়ে গেছে। সে ফর্দ আমি দেখিওনি—যা উপকার করেছেন আপনারা, তার শোধ কী কখনো দিতে পারব?…
ট্রেন ছেড়ে চলে গেল।…
প্ল্যাটফর্মে বিনোদ বাঁড়য্যের সঙ্গে দেখা। আমায় একপাশে ডেকে মুখ ভার করে বললে—শুনেচেন টিকিটবাবুর আক্কেলটা? সাড়ে সাত টাকা হাতে ছিল কালকের দরুন। কাল রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরে বললাম—ভাগ করো। তা আমাদের দিলে এক টাকা করে—দুজনকে দু-টাকা। নিজে নিলে সাড়ে পাঁচ টাকা। বলে ওদের দুজনের ভাগ, ও আর ওর ভাইপো। আচ্ছা, ভাইপো কী করেচে মশাই? শুধু কাপড়ের পুঁটলিটা হাতে ঝুলিয়ে গিয়েছে বইতো নয়?…আর আমাদের অত ছোটো নজর নেই…হাজার হোক, কুলিন বামুনের ছেলে মশাই…না–হয় পেটের দায়ে আজ পাউরুটি ফিরিই করি…
রাণুর প্রথম ভাগ
আমার ভাইঝি রাণুর প্রথমভাগের গণ্ডি পার হওয়া আর হইয়া উঠিল না।
তাহার সহস্রবিধ অন্তরায়ের মধ্যে দুইটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য,—এক, তাহার প্রকৃতিগত অকালপক্ক গিন্নীপনা আর অন্যটি, তাহার আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। তাহার দৈনিক জীবনপ্রণালী লক্ষ্য করিলে মনে হয়, বিধাতা যদি তাহাকে একেবারে তাহার ঠাকুরমার মত প্রবীণা গৃহিণী এবং কাকার মত এম. এ. বি. এল, করিয়া পাঠাইতেন, তাহা হইলে তাহাকে মানাইতও ভাল এবং সেও সন্তুষ্ট থাকিত তাহার ত্রিশ-চল্লিশ বৎসর পরবর্তী ভাবী নারীত্ব হঠাৎ কেমন করিয়া ত্রিশ চল্লিশ বৎসর পূর্বে আসিয়া পড়িয়া তাহার ক্ষুদ্র শরীর-মনটিতে আর আঁটিয়া উঠিতেছে না—রাণুর কার্যকলাপ দেখিলে এই রকমই একটা ধারণা মনে উপস্থিত হয়। প্রথমত, শিশুসুলভ সমস্ত ব্যাপারেই তাহার ক্ষুদ্র নাসিকাটি তাচ্ছিল্যে কুঞ্চিত হইয়া উঠে খেলাঘর সে মোটেই বরদাস্ত করিতে পারে না, ফ্রক-জামাও না, এমন কি নোলক পরাও নয়। মুখটা গম্ভীর করিয়া বলে, “আমার কি আর ওসবের বয়েস আছে মেজকা?”
বলিতে হয়, “না মা, আর কি—তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকল।”
রাণু চতুর্থ কালের কাল্পনিক দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় মুখটা অন্ধকার করিয়া বসিয়া থাকে।
আর দ্বিতীয়ত কতকটা বোধ হয় শৈশবের সহিত সম্পর্কিত বলিয়াই—তাহার ঘোরতর বিতৃষ্ণা প্রথম ভাগে দ্বিতীয় ভাগ হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার কাকার আইন-পুস্তক পর্যন্ত আর সবগুলির সহিতই তাহার বেশ সৌহার্দ্য আছে, এবং তাহাদের সহিতই তাহার দৈনিক জীবনের। অর্ধেকটা সময় কাটিয়া যায় বটে, কিন্তু প্রথম ভাগের নামেই সমস্ত উৎসাহ একেবারে শিথিল হইয়া আসে। বেচারীর মলিন মুখোনি ভাবিয়া মাঝে মাঝে আমি এলাকাড়ি দিই—মনে করি, যাকগে বাপু, মেয়ে—নাই বা এখন থেকে বই স্লেট নিয়ে মুখ খুঁজড়ে রইল, ছেলে হওয়ার পাপটা তো করে নি! নেহাতই দরকার বোধ করা যায়, আর একটু বড় হোক তখন দেখা যাবে’খন।
