একটু পরে সাহেব স্টেশনমাস্টার ও তাঁর সঙ্গে একজন ভদ্রলোক এলেন। বুঝতে দেরি হল না যে ভদ্রলোকটি ডাক্তার, তিনি বউটির নাড়ি দেখলেন, চোখ দেখলেন, স্টেশনমাস্টারের সঙ্গে কী কথা হল তাঁর, স্বামীটির সঙ্গেও কী যেন বললেন, তারপর তাঁরা চলে গেলেন।
মৃত্যুই তা হলে ঠিক!…
কৌতূহলী জনতা আরও খানিকক্ষণ তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল—মৃত পল্লি বধূ, তার শোকস্তবু স্বামী, অবোধ ক্ষুদ্র পুত্র ও তাদের ঘর-গৃহস্থালীর সাধের দ্রব্যাদি। তারপর একে একে যে যার কাজে চলে গেল—আরও নতুন দল এল— তারাও খানিকটা থেকে নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করতে করতে ফিরে গেল। এবার এল রেলওয়ে পুলিশের লোক, তারা খানিকক্ষণ ধরে ভদ্রলোকটিকে কী সব প্রশ্ন করলে, নোটবুকে কী টুকে নিলে—তারপর তারাও চলে গেল—কেবল একজন কনস্টেবল একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
এ সবে কাটল প্রায় এক ঘণ্টা। তখন সন্ধে প্রায় হয়-হয়। স্টেশনের আলো জ্বালিয়েচে, আপডাউন দু-দিকের সিগন্যালে লাল সবুজ বাতির সারি জ্বলেচে; কিন্তু তখনও অন্ধকার হয়নি, সিগন্যালের পাখা তখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, আপ লাইনের হোম স্টার্টার নামানো—বোধ হয় কোনো ট্রেন আসছে।
যা হবার তা তো হয়ে গিয়েছে, এখন সৎকারের ব্যবস্থা। এ ধরনের প্রশ্ন কেউ ভদ্রলোকটিকে করলে না—তিনিও কাউকে করলেন না। এদিকে ভিড় ক্রমেই পাতলা হয়ে এল—অনেকেই আপ ট্রেনের যাত্রী কলকাতার দিকে দু-খানা সিগন্যাল নামানো দেখে তারা ওভারব্রিজ দিয়ে উঠি-পড়ি অবস্থায় ছুটল আপ প্ল্যাটফর্মের দিকে। এটা যে গ্রু ট্রেন আসছে, তা ভেবে তখন কে দেখে? ভিড়ের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল হিন্দুস্থানী কুলি-খালাসির দল, তারা খৈনি টিপতে টিপতে নিজেদের কাজে চলে গেল।
আমি একটু দুরে দাঁড়িয়েছিলুম-ভদ্রলোক আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। কাছে যেতেই আকুলভাবে বললেন—মশাই আপনি তো দেখছেন, একটা ব্যবস্থা করুন দয়া করে। এখন কী করি আমার মাথামুণ্ডু, এই অচেনা দেশ, তাতে শীতের রাত। আমরা ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের দেহ শেষে কী অন্য জাতে ছোঁবে?…এই একটা বাচ্চা, এরই বা উপায় কী করি?
মুখে অবশ্যি তাকে সাহস দিলুম। কিন্তু তারপর আধ ঘণ্টা এদিক-ওদিক ঘুরেও সৎকারের কোনো ব্যবস্থাই আমায় দিয়ে হয়ে উঠল না। না আমাকে এখানে কেউ চেনে, না আমি কাউকে চিনি—অধিকাংশ লোকই বলে তারা যাত্রী, এই ট্রেনেই তাদের অমুক জায়গায় যেতে হবে। কেউ কথা শোনে না। আকস্মিক ব্যাপারের
উত্তেজনাটুকু কেটে যাবার পর সবাই বুঝেচে বেশি ঘনিষ্ঠতা করতে গেলে এই শীতের রাত্রে দুর্ভোগ আছে কপালে—কাজেই সবাই আমায় এড়িয়ে চলতে চায়। অবশেষে একজন টিকিট কালেক্টরকে কথাটা বললুম। অনেক সাধ্য-সাধনার পরে তাঁকে রাজি করানো গেল। তিনি বললেন, কিন্তু শুধু আমি আর আপনি এতে তো হবে না? আপনি দাঁড়ান—আমি দেখে আসি।
একটু পরে একজন অতি কদর্য চেহারার ময়লা কাপড় পরা লোককে সঙ্গে করে তিনি ফিরে এলেন। আমায় বললেন—শুনুন মশাই, লোক যেতে চায় না কেউ শীতের রাতে। এই লোকটি ভালো বামুন, আমাদের ইস্টিশানে পাঁউরুটির ভেন্ডার, এ যেতে রাজি হয়েছে, এ আরও দুজন লোক আনতে রাজি আছে। কিন্তু–
টিকিটবাবু সুর নীচু করে বল্লেন—জানেন তো ছোটোলোক—ওদের কিছু খাওয়াতে হবে, নইলে রাজি হবে না। একটু ইয়ে—মানে—বুঝলেন তো? ওরা নেশাখোর লোক, লেখাপড়া জানে না—সবই বুঝতে পারচেন। তার একটা ব্যবস্থা করতে হয়–
আমি বললুম—সে কীরকম খরচ পড়বে-না-পড়বে আমায় বলুন, আমি গিয়ে বলচি। ঘাট খরচের হিসাবটাও ধরবেন। টিকিটবাবু টাকা-পনেরোর এক ফর্দ দাখিল করলেন। আমি ফিরে গিয়ে বলতেই ভদ্রলোক মানিব্যাগ খুলে দু-খানা দশ টাকার নোট আমার হাতে দিয়ে বললেন—এই নিন—যা ব্যবস্থা করবার করুন, আমায় এ দায় থেকে উদ্ধার করুন, বাঁচান আপনি—কথা শেষ না-করেই আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরতে এলেন—আর আমার এই খোকার একটা কিছু…ওকে তো এই ঠান্ডায় সেখানে নিয়ে যেতে পারিনে, তাহলে ও কী বাঁচবে?…
আমি ফিরে এসে খোকার কথা তুলতেই তিনি বললেন—আমার তো ফ্যামিলি এখানে নেই, তাহলে আর কী কথা ছিল? আচ্ছা দাঁড়ান, দেখি ছোটোবাবুর বাসায়
ছোটোবাবুর বাসায় খোকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বললুম দিন ওকে আমার কাছে। ছোটোবাবুর বাসায় তাঁরা রাখবেন বলেছেন।
ভদ্রলোক বললেন—যাও খোকন বাবা, বাবুর কাছে যাও। তোমার মাসিমার বাড়ি নিয়ে যাবেন, যাও বাবা–
তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল। আমায় বললেন অনেকক্ষণ কিছু খায়নি, রানাঘাটে ওর মা গজা কিনে দিয়েছিল—একটু গরম দুধ যদি—
খোকা বেশ সপ্রতিভ। বেশ শান্তভাবেই আমার কাছে এল, হাসি-হাসি মুখে। তাকে কোলে নিয়ে মনে হল খোকার যত বয়স ভেবেছিলুম তার চেয়ে ছোটো এখনও তেমন কথা বলতে পারে না। ছোটোবাবুর বাসায় ঝি তাকে কোলে করে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেল। ওকে কোলে তুলে নিয়ে কঁদো-কাঁদো সুরে বললে— আহা, এ যে একেবারে দুধের বাছা! এসো এসো সোনামণি আহা! মাণিক আমার–
খোকা ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারেনি, বরং এত লোক তাকে কোলে নিয়ে নাচানাচি করাতে সে খুব খুশি।
একটু পরে আমরা কজনে মৃতদেহ বহন করে শ্মশানের দিকে রওনা হলুম। আমি, পাউরুটির ভেন্ডার, টিকিটবাবু ও পাউরুটির ভেন্ডারের একজন বন্ধু। টিকিটবাবুর এক ভাইপো আমাদের সম্মিলিত গরম কোট ও আলোয়ানের পুঁটুলি হাতে ঝুলিয়ে পিছনে পিছনে আসছিল। সকলের পিছনে ভদ্রলোকটি; তাঁকে আমরা অবশ্য শব বহন করতে দিইনি। ভদ্রলোকের জিনিসপত্র মৃতদেহের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়েছে, কারুর বাসায় জায়গা দেবে না, সেগুলি স্টেশনে ক্লোকরুমে জমা দেওয়া হল। নৈহাটির বাজার যেখানে প্রায় শেষ হয়েছে, সেখানটায় এসে ভদ্রলোক বললেন—একটা ভুল হয়ে গিয়েছে, দাঁড়ান আমি সিঁদুর কিনে আনি, ওর কপালে দিয়ে দিতে হবে।
