—মাকে যেন কোনো কথা বোলো না—
—ঠিক বলে দেব। চালাকি বার করে দেব, দেখো। আর একটু তেঁতুল চলবে? নিয়ে আসব নুন-নেবুপাতা দিয়ে?
ননীবালার দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তাড়াতাড়ি মুছে ফেলে আঁচল দিয়ে, ছেলে পাছে টের পায়। আজ যদি তিনি থাকতেন! মরার বয়েস হয়নি তো। অনায়াসেই থাকতে পারতেন। আজ কী সুখের দিন তা হলে! খোকা এত বড়ো হয়েছে, যে দেখে সেই ভালো বলে। দু-দিন পরে মা মঙ্গলচণ্ডীর কৃপায় রেলে ভালো চাকরি করবে। উনি পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে খান না কেন! আমরা তাঁকে কাজ করতে দিতাম না। আরাম করে খান না ছেলের রোজগার। এই দুপুরে বসে বসে কত গল্প করতাম দুজনে। ছেলের বউ সেবা করত, তেঁতুল জরিয়ে নিয়ে আসত।
পৃথিবীর পথে সে যেন একা।
সঙ্গী চলে গিয়েছে তাকে ফেলে।
দীর্ঘ পথ সামনে দুর থেকে বিস্তৃত। কে জানে কতদিন চলতে হবে এই টানা পথ বেয়ে?
না না, তার খোকা, তার সুরেশ আছে। বেঁচে থাক সে। তার ঘরকন্না গুছিয়ে দিতে হবে না? আজ বাদে কাল সুরেশের বিয়ে দিতে হবে। ছেলেমানুষ ওরা, সংসারের কী জানে? তাকেই গুছিয়ে দিতে হবে সব।
সুরেশ এসে বললে—মা, একটু তেঁতুল জরাও না? নুন দিয়ে, নেবুপাতা দিয়ে?
ননীবালা চমকে উঠে ছেলের তরুণ মুখের দিকে চেয়ে থাকে অবাক হয়ে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে সে চোখের জল রোধ করলে।
ছেলে কী করে জানলে তার বাবা অবিকল এমনি সুরে, এমনি টান দিয়ে কথা বলত?
গ্রামে ফিরে আসা পর্যন্ত ওঁর প্রতি পদক্ষেপ যেন সে শুনতে পায়। কী জানি, কিছুই যেন ভালো লাগে না। সব যেন ফাঁকা, অর্থহীন হয়ে গিয়েছে। কোনো কাজে আর উৎসাহ নেই।
একদিন ওপাড়ার হরিদাস চক্কত্তির বাড়ি সত্যনারাণের পুথি শোনা ও প্রসাদ খাওয়ার নিমন্ত্রণে সে-পাড়ার ঝি-বউদের সঙ্গে গেল। সেকেলে কোঠাবাড়ি, দালানে পুজোর জায়গা হয়েছে, মাদুর পেতে দেওয়া হয়েচে নিমন্ত্রিতা মেয়েদের জন্যে। পুরুষেরা বসেচে বাইরের রোয়াকে। পূর্ণিমার রাত্রে উঠোনের বড়ো নারকোল গাছগুলোর ছায়া পড়েছে রোয়াকে। সদ্য তোলা জুই ফুলের সুগন্ধে ভুরভুর করচে পুজোর বারান্দা।
হরিদাস চক্কত্তির বউ বললেন—এসো এসো ভাই। কতদিন গাঁয়ে আসোনি, সেই একবার এসেছিলে অনন্তচতুর্দশীর ব্রত উদযাপনের সময়, মনে পড়ে?
ননীবালা বললে—খুব মনে পড়ে।
—তখন তোমার নতুন দু-এক বছর বিয়ে হয়েছে।
—দু-বছর হবে।
—চেহারা আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গিয়েছে।
—আর চেহারা দিদি! কী দরকার আমাদের চেহারায় বলুন! সে পাট তো ঘুচে গিয়েছে।
—আহা-হা, সে আর বোলো না ভাই। ঠাকুরপো তো ছেলেমানুষ। আমাদের ওঁদের চেয়ে কত ছোটো। তার কী এখন যাবার বয়েস হয়েছিল? সবই অদেষ্ট! কী বলব বলো।
ননীবালার দু-চোখ ততক্ষণে জলে ভরে গিয়েছে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল, নয়তো জল গড়িয়ে পড়বে গাল বেয়ে। সে একটা লজ্জার কথা এদের সামনে। তার মনে যে কি অভাব, সে-কথা এরা কেউ বুঝবে না। সে মধুর অনুভূতির স্মৃতি এদের জীবনে পুঁজি নেই, স্কুল জীবনযাত্রা চালিয়ে যায় রান্নাবাড়া করে, খাইয়ে, ঘরকন্না গেরস্থালি করে। তার মনের সে অনুভূতির ধারণাই নেই এদের। চোখের জল দেখে ভাববে ঢং করে কাঁদছে লোক দেখানোর জন্যে।
পাশের বাড়ির কানাই গাঙ্গুলীর পুত্রবধূ এসে বসল ওর পাশে। ওর সঙ্গে আলাপ করে ফেললে। অল্পদিন বিয়ে হয়েছে, একটি মাত্র মেয়ে, ন-মাস বয়েস। বাপেরবাড়ি শান্তিপুরের কাছে হবিবপুর। বেশ শহুরে টান কথাবার্তায়। ওকে বললে
—কাকিমা, আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাব ভাবচি আজ ক-দিনই।
—আমার কথা কে বললে তোমায়?
—সবাই বলে। আমার পিসশাশুড়ি বলছিলেন, বড়ো ভালো বউ ছিল এ গাঁয়ের। গিয়ে দেখা করে এসো বউমা। আপনার নাম কী কাকিমা?
—ননীবালা। তোমার?
—প্রীতিলতা।
—বেশ নামটি। খুকির নাম কী?
—এখনো কিছু রাখিনি। ডাকনাম টুলু। আপনার কাছে যাব এখন, একটা নাম ঠিক করে দেবেন এখন আপনার নাতনির!
—দেব না কেন বউমা, কালই যেয়ো। গান করো নাকি?
—গাই। সে তেমন কিছু না। আপনার মুখে শুনব। এইমাত্র ওরা বলছিল আপনি ভালো গান জানেন।
—আমি? আমার গানের পাট তো চুকে গিয়েচে মা। আবার—
নাঃ, যখন-তখন চোখে জল এসে বড়ো অপ্রতিভ করে দেয়, এইসব ছেলেমানুষ ঝি-বউয়ের সামনে। তার কি এখন চোখ পানসে করে কাঁদবার বয়েস? সে না গিন্নিবান্নি? ছেলের মা?
প্রীতিলতা মেয়েটি বেশ দেখতে, কত আর বয়েস হবে—আঠারোর বেশি নয়। ননীবালা সামলে নিয়ে বললে—যেয়ো বউমা। তোমাদেরই মুখের দিকে চেয়ে তো আবার এ গাঁয়ের মাটিতে পা দিলাম। যাবে বই কী।
সব বেশ ভালোভাবেই চলছিল, এমন সময় আর একটি ওর সমবয়সি মেয়ের সঙ্গে দেখা হল, তার নাম কনক, এপাড়ার কোনো এক বাড়ির মেয়ে, বোধহয় উপেন ভটচাজের মেয়ে। কনক ছুটে এসে ওর হাত দু-খানা চেপে ধরে বললে— মনে পড়ে বউদি? মনে পড়ে?
একে খুবই মনে পড়ে। স্বামীর ঘরে প্রথম প্রথম যাবার সময় এই মেয়েটি আর রায়চৌধুরী পাড়ার সুবাসিনী এই দুজনে কী অসাধারণ ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের সঙ্গেই তাদের রুদ্ধ দুয়ারের বাইরে আড়ি পেতে বসে থাকত রাতদুপুর পর্যন্ত।
একদিন—না, সেসব কথা এখন মনেই চাপা থাক।
জুইফুলের গন্ধে ভরা দীর্ঘবিলসিত তাদের পুরোনো বাতাস কোন দিগন্তে বিলীন হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এসব পাড়াগাঁয়ের মেয়েদের জ্ঞানকাণ্ড বোধহয় একটু কম। নইলে সে যেটা প্রাণপণে চাপা দিতে চাইছে, ওরা সেটা খুঁচিয়ে তুলতে চাইবে কেন? একটা সাধারণ বুদ্ধিও তো আছে! কনক সামনে এলেই মনে পড়ে সেসব মাধবী-রাত্রির টাটকা জুই-চাঁপার গন্ধ। কেন এরা সামনে আসে? ননীবালা মুখে অতিকষ্টে হাসি টেনে বললে—হ্যাঁ ভাই, কনক ঠাকুরঝি। ভালো?
