অভয়ের বউকে দেখে ননীবালা যেমন আশ্চর্য হয়ে গেল তেমনি মনে মনে কেমন এক ধরনের দুঃখও হল। অভয়ের বউ তার চেয়ে অন্তত কুড়ি-পঁচিশ বছরের বড়ো, তার মার বয়সি, চুল অর্ধেক পেকে গিয়েছে—শুধু ধাত ভালো আছে বলে অত বয়েস বোঝা যায় না—কিন্তু অভয়ের বউ এখনো সধবা। পাকা চুলে সিঁদুর পরচে। অভয় নাপিত এখনো বেঁচে থাকবে সেটা ভেবে দেখলে এমন কিছু আশ্চর্যের কথা নয়, বড়ো জোর সত্তর-বাহাত্তর না-হয় তার বয়েস হয়েছে— কিন্তু–
এ ‘কিন্তুর’ কোনো সান্ত্বনা ননীবালা মনের মধ্যে খুঁজে পেলে না। ওঁর কি মরবার বয়েস হয়েছিল? পরদিন সে দেখলে, শুধু অভয় নাপিতের বউ নয় তার চেয়ে অনেক বড়ো বয়সে বউ এখনো দিব্যি সিঁদুর পরছে পাকা আধপাকা চুলে। কেন চলে গেলেন অল্পবয়সে ওদের বিদেশে ভাসিয়ে? গ্রামের মেয়েরা যখন দেখা করতে আসে, তখন বার বার ওই কথাটাই মনে হয় ওর।
ননীবালার শ্বশুরবাড়ি বিনোদ কাকাদের বাড়ির দক্ষিণ গায়ে। কুড়ি-একুশ বছর ধরে সে বাড়িতে কেউ না-থাকায় উঠোনে একগলা নোনা, ভাঁট, সেঁউতি লতার জঙ্গল, জংলি ডুমুরের বড়ো গাছে ডুমুর ফলচে পাঁচিলের মাথায়, জানলায় কাঁটালতা উঠে জানালার কবাট ঢেকে ফেলেছে।
সুরেশ কেবলই বলছিল, মা, আমাদের নিজের বাড়িতে চলে গিয়ে। গ্রামে এসে পরের বাড়িতে থাকব কেন? আজ তিন-চার দিনে জঙ্গল কাটিয়ে উঠোন পরিষ্কার করে তবে ননীবালা নিজেদের ভিটেতে ঢুকল।
মাত্র তিনখানি ঘর, দুটো বারান্দা দু-দিকে, ভাঁড়ার-রান্নাঘর আলাদা। কতকাল পরে আবার এ ভিটের মাটিতে সে পা দিল? দীর্ঘ একুশ বছর। এও তার জীবনে ঘটবার ছিল।
সুরেশ বলে—কই মা, আমার তো কিছু মনে নেই এ বাড়িতে থাকবার কথা?
ননীবালা বলে—দূর, তোর বয়েস যখন ন-মাস তখন এ বাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাই যে।
—এখন এখানে কিছুদিন থাকো মা। আমার বড় ভালো লাগছে।
—থাকতেই তো এলাম। এখন মা মঙ্গলচণ্ডী যা করেন।
ননীবালা সারাদিন ঘর ঝাড়ে পোঁছে সাজায়। আজ একুশ বছরের ধুলোর স্তর পড়েচে ঘরখানার ওপর। কেবলই ওর মনে পড়ছে আজকাল ওদের বিবাহিত জীবনের সেই মধুমাখা দিনগুলি—নববধূর নতুন স্বপ্ন মাখানো অপূর্ব রাত্রি ও দিনগুলি। উনি তখন একেবারে তরুণ, সে চোদ্দো বছরের কিশোরী।
ওই তো সেই কুলুঙ্গিটা। ওটাতে উনি একদিন রসগোল্লা এনে লুকিয়ে রেখে মজা করেছিলেন। একটা বিলিতি ওষুধের কাগজের বাক্সের মধ্যে রসগোল্লা ছিল লুকোনো। উনি বলেছিলেন—কি বলো তো ওতে?
প্রগলভা নববধূ বলেছিল—তোমার জিনিস তুমিই জানো। ও তো একটা বিলিতি ওষুধ।
–বাজি ফেলবে?
—অতশত আমি বুঝিনে। কী ওতে?
–রসগোল্লা।
—হাতি।
—গা ছুঁয়ে বলচি। এই দ্যাখো–ক-টা খাবে বলো।
তারপর দুজনে কাড়াকাড়ি করে সেই রসগোল্লা খেয়েছিল—ত্রিশ বছর আগের কথা। মনে হচ্ছে কাল ঘটেছে। এখানে বসে বড্ড বেশি করে স্বামীর কথা মনে পড়চে ননীবালার। সব ঘরে, সব বারান্দায়, প্রতি কোণে, ওই রান্নাঘরের খেতে বসবার বড়ো কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িখানায় ওর নববধূ-জীবনের স্মৃতি মাখানো। তরুণ স্বামী সেখানে ঘুরচেন এঘরে-ওঘরে, ও নিজে সেখানে ব্রীড়ান কুণ্ঠিতা কিশোরী বধূ, নতুন প্রেমের স্পর্শে দুরুদুরু বুক নিয়ে আলতাপরা পায়ে এঘরে ওঘরে গৃহকাজ করে বেড়াচ্চে নবীন উৎসাহ নিয়ে!
ননীবালার মনে হচ্চে যেন ওঘরে গেলেই দেখবে তিনি বসে আছেন তক্তপোশে, আবার ওঘরে থাকলে মনে হয় বুঝি এঘরে এলেই দেখা পাবে। আগেকার দিনের মতো লুকোচুরি খেলা এখনো কি চলচে?
একবার উনি নতুন ধানের শিষ নিয়ে এসে ঘরে ঢুকলেন। বললেন—লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে রেখে দাও। নতুন জমির নতুন ধান। শাঁখ বাজাও, তুমি ঘরের লক্ষ্মী, শাঁখ বাজিয়ে অভ্যর্থনা করা নিয়ম তোমার।
ঠিক দুপুরের গমগম রোদে অলস নিমফুলের গন্ধের মধ্যে কতকাল আগের তাঁর কথাই মনে পড়ে। ননীবালা একদৃষ্টে চেয়ে থাকে বাঁশঝাড়ের ঘন ডালের দিকে, কিন্তু মন তখন অতীত দিনের কোনো আবেশাতুর মুহূর্তটিতে স্থিরনিবদ্ধ। হয়তো সে-সময় ছেলে সুরেশ বলে ওঠে—মা, একটু খাবারজল দাও না। ননীবালা চমকে ওঠে ধ্যান ভেঙে, লজ্জা পায় পাছে ছেলে কিছু বা বুঝে ফেলে। ছেলেকে জল দিয়ে হয়তো কাঁথা সেলাই করতে বসে গেল, কিংবা নতুন পাড়া তেঁতুলের রাশ বঁটি পেতে কাটতে আরম্ভ করে দিলে।
অমনি মনে পড়ে যায় সেইসব দিনে এমন চৈত্রের দুপুরে—
বাড়ির পেছনের গাছের তেঁতুলের রাশ এমনি কাটতে বসেছিল একদিন।
উনি পেছন থেকে এসে চুপিচুপি বললেন—তেঁতুল কাটা রাখো। নুন দিয়ে নেবুপাতা দিয়ে তেঁতুল জরাও দিকি বেশ করে।
—চুপ। মা টের পাবেন। পালাও তুমি। তেঁতুল খেলে জ্বর হয়।
—ইস! উনি যেন আর খাবেন না, একলা আমি খাব কিনা। মা ঘুমুচ্চে। তুমি তাড়াতাড়ি ওঠো তো লক্ষ্মীটি। জিভে জল আসচে না তেঁতুলের নামে? সত্যি কথা বলো।
ননীবালাকে উঠে যেতে হয় কাটা তেঁতুল নিয়ে রান্নাঘরের দিকে। উনি বলেন —দাঁড়াও, আমি নেবুপাতা নিয়ে আসছি। তেঁতুলগুলো একটু ধুয়ে নিও, বড্ড বালি কিচকিচ করবে নইলে—
ননীবালা ধমকের সুরে বলে—হ্যাঁ গো হ্যাঁ। সর্দারি করতে হবে না। তেঁতুল ধুয়ে কেউ জরায় না। জিগ্যেস করো গিয়ে। পানসে হয়ে যায়।
দুজনে কাড়াকাড়ি করে সেই একতাল জরানো তেঁতুল খেয়ে ফেলে। পরদিনই ওঁর সর্দি আর গলাব্যথা, ননীবালা আঙুল তুলে কৌতুকের সুরে বলে—কেমন? বলেছিলাম না? কথা শোনা হল? আমার কথা শোনা হবে কেন—আমি কী আর কেউ?
