—ভালো। তুমি?
—দেখতেই পাচ্চ।
—তা তো দেখচি। আহা, মনে পড়লে বুক ফেটে যায়। সেদিনের কথা। সেই রাত্রে দাদা আমার মুখে খুড়িগোলা মাখিয়ে দিলে আড়ি পাতবার জন্যে, মনে পড়ে?
না, এদের যেন আর কোনো কথা নেই আজকার দিনে। ননীবালা চুপ করে রইল দেখে কনক বোধহয় কিছু অপ্রতিভ হল। সেও চুপ করে গেল।
খুব লোকজনের ভিড়। দালানের মধ্যে মেয়েদের প্রসাদ খাবার পাতা সাজিয়ে দেওয়া হল। ননীবালা এবং অন্যান্য মেয়েরা সেখানেই বসল। সত্যনারাণের পুথি পড়া আরম্ভ হল।
খানিক পরে সেখানে একজন বৃদ্ধ লাঠি হাতে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধের বাঁ-হাতে একটা বাটি। বৃদ্ধ এসে বলল—পুজো হয়নি?
হরিদাস চক্কত্তির ছেলে বললে—না। আসুন জ্যাঠামশায়। বসুন—
—মেয়েদের মধ্যে আর বসব না। যাই বাইরে। কত দেরি হবে?
—বেশি দেরি হবে না জ্যাঠামশায়।
—আবার বাড়ি গিয়ে রুটি করতে হবে, তবে খাব। বেশি রাত্তির না-হয়।
ননীবালা পাশের কাউকে জিগ্যেস করলে—উনি কে ভাই?
সে বলল—চাটুয্যে বুড়ো। ছেলেরা মস্ত রোজগেরে, কলকাতায় থাকে। বুড়ো বাবা এখানে পড়ে আছে, খোঁজও নেয় না।
–বউ বেঁচে নেই বোধ হয়?
–খুব আছে। ছেলেদের কাছে কলকাতায় থাকে।
—ইনি যান না কেন ছেলেদের কাছে?
—তা কী জানি দিদি। তা বলতে পারিনে। এখানে থাকে, তাই তো দেখি। আর তুমিও যেমন! নিজের খবরই রাখতে পারিনে, তার আবার পরের খবর নিতে যাচ্চি।
রাত অনেক হয়ে গেল পুজো ও পুথি-পড়া শেষ হতে। ননীবালা যখন ছেলের সঙ্গে বাড়ি যায়, তখন দেখতে পেলে সেই বৃদ্ধ ওদের আগে আগে চলেচেন লাঠি ঠকঠক করতে করতে। ওদের দেখে বললেন—কে যায়? তোমাদের তো বাবা চিনতে পারলাম না?
সুরেশের পরিচয় পেয়ে বড়ো খুশি হলেন। তাকে কত আশীর্বাদ করলেন, ননীবালাকে বললেন—তোমার বিয়ের পর একবার বউমা তোমায় দেখেছিলাম— বিয়ের বউভাতের দিন। যেয়ো আমাদের বাড়ি, কেমন? কালই যেয়ো।
পরদিন বিকেলে ননীবালা চাটুয্যে বুড়োর বাড়ি গেল। সামনে বারান্দাওয়ালা সেকেলে কোঠাবাড়ি, একদিকে ডুমুরগাছ অন্যদিকে একটা বাতাবিনেবুর গাছ— উঠোনের পুবদিকে একটা পেঁপেগাছে অনেকগুলো পেঁপে ধরেছে।
বুড়ো বললে—কী দেখচ বউমা, ও সব আমার নিজের হাতে করা। সবাইপুরের বিশ্বেসদের বাড়ি থেকে বিজ আনিয়েছিলাম আজ ন-বছর আগে। সেই গাছ। তখন ওরা সব এখানে ছিল।
ননীবালা বললে—ওরা কারা জ্যাঠামশায়?
—তোমার জেঠিমা।
—আপনাকে এখানে বেঁধে দেয় কে?
—নিজেই। খুব ভালো রাঁধতে পারি। এই এখন বসে পরোটা করব।
—জেঠিমা থাকেন না এখানে?
–না না। ওরা বড়ো ছেলের কাছে থাকে কলকাতায়।
—ক-ছেলে আপনার?
—তিনটি। তা নিজের মুখে বলতে নেই, তিন ছেলে ভালো চাকুরিই করে। শ্যামবাজারে তেতলা বাসা। ইলেকট্রিক লাইট, ফ্যান। বড়ো ছেলের মোটরগাড়ি।
দশে মানে, দশে চেনে। চাটুয্যে সায়েব বললে সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টের একডাকে সকলে চেনে। চেহারাও একেবারে সায়েবি—নিজের ছেলে বলে বলচি তা ভেব না—
বৃদ্ধের মুখে-চোখে গর্বের ভাব অতিস্পষ্ট হয়ে উঠল। নিজের মনে আপনা আপনি হেসে উঠে বললেন—জন্মাবার পরে এতটুকু ছিল। ওর মা ফুলে-নবলার পাঁচু ঠাকুরের দোর ধরে তবে ওই ছেলে বাঁচায়! ছ-বছর বয়সে কাঁকড়াবিছের কামড়ে ছেলে নীলবর্ণ হয়ে মরে যাবার জোগাড় হয়েছিল। কাঁটানটের শেকড় বেটে খাইয়ে জলপড়া দিয়ে তেলপড়া দিয়ে সে-যাত্রা অতিকষ্টে রক্ষা হয়। তবে আজ আমাদের নৃপেন—তা এসো, বোসো বউমা। এই পরোটা ক-খানা ভাজি আর তোমার সঙ্গে গল্প করি।
একটা ক্ষুদ্র ভাঁড়, চেঁচে-মুছে ঘি বেরুল আধ ছটাক খানেক।
বৃদ্ধ ভাঁড় দেখিয়ে বললেন—দালদা। ভালো দালদা। আর তা ছাড়া পাচ্চি কোথায়? শ্রীঘি আট টাকা সের।
—কেন আপনার ছেলে টাকা পাঠায় না?
বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন—নৃপেন? তার অনেক খরচ। রোজগারও যেমনি, খরচও তেমনি। আমি আর তাকে বিরক্ত করিনে। আমার বিঘে তিনেক ধানের জমি আছে, আর ধরো লাউ করি, কুমড়ো করি, তেঁড়স, ডাঁটা—সব তৈরি করি নিজের হাতে। বেশ চলে যাচ্চে। নৃপেন পুজোর সময় একখানা ভালো থান কাপড় পাঠিয়ে দিয়েছে—ফাইন থান—তা বউমা সে আমি তুলে রেখে দিয়েছি। বার বার দেখি, বলি বড়ো খোকা আমায় দিয়েছে। ছোটো ছেলের বাসা আগে ছিল কলকাতায়— এখন মণিপুরে। সে একজোড়া চুটিজুতো পাঠিয়ে দিয়েছিল পুজোর সময়।
ননীবালা ইতিমধ্যে পরোটা ক-খানা বেলে দিয়ে বললে—আপনি ভেজে নেবেন, না, আমি দেব?
–না মা, আমিই নিচ্চি।
—কেন কষ্ট করবেন? সরুন—আমি করে দিচ্চি।
ননীবালা খাবার তৈরি করে জ্বাল দিয়ে সিঁড়ি পেতে বৃদ্ধকে যত্ন করে খেতে বসিয়ে দিলে। চাটুয্যে বুড়োর মুখের ভাব দেখে মনে হল অনেকদিন তাকে এমন যত্ন করে কেউ খাবার করে খাওয়ায়নি।
বুড়ো বললে—কী সুন্দর পরোটা হয়েছে! মেয়েমানুষ না-হলে কী খেয়ে তৃপ্তি? মেয়েদের হাতের রান্নাই আলাদা। বেঁচে থাকো বউমা, বেঁচে থাকো। মুখ বদলালাম অনেক দিন পরে।
—আপনার ছেলেদের বউ কেউ এখানে থাকেন না কেন?
-না না, পাগল! তাদের কি এই অজ পাঁড়াগাঁয়ে থাকতে বলতে পারি? তুমি জানো না, এসব অশিক্ষিত স্থানে তাদের আমি আসতে বলতে পারি না। তাদের মন টেকে এখানে? গরিব ছিলাম নিজে বটে কিন্তু ছেলেদের মানুষ করে দিয়েছি কষ্ট-দুঃখ করে। বিয়েও দিয়েছি তেমনি ঘরে। বড়ো বউমার বাবা মতিহারিতে সিভিল সার্জন। মেজো বউমার বাবা নেই, মামারা খিদিরপুরে বড়ো কনট্রাকটর, রায়চৌধুরী কোম্পানির নাম শুনেছ? সেই রায়চৌধুরী কোম্পানি। ছোটো বউমার বাবা এখন বাঁকড়োর সদর এস ডি ও। বড়ো বউমা ম্যাট্রিক পাস। ছোটো বউমা বি. এ. পর্যন্ত পড়েছিলেন, পরীক্ষা দেননি। ইংরিজি বলেন কি! আড়াল থেকে শুনেচি—যেন মেমসাহেব! হুঁ হুঁ বউমা—এসব গল্পকথা এখান থেকে শোনাবে। নিজের চোখে না-দেখলে—
