আমরা রান্না করিয়া রাখিয়া স্নান করিতে গিয়াছিলাম, মিস সোরাবজির নিজের হাতের রান্না ভাত ও ডাল, কিছু মাংস, দু-একটা ভাজা। পারসি ধরনের নুন দিয়া রান্না ভাত ও মশলাবিহীন সাদা রঙের মাংসের স্টু ও বেসনে টমাটো ভাজা— সবগুলিই আমার মুখে সমান অখাদ্য। ভাগ্যে বুদ্ধি করিয়া নবীনদা কিছু আচার আনিয়াছিলেন—তাই দিয়া গ্রাস-কয়েক ভাত খাওয়া গেল! মূলো পোষা কুকুরটির মতো মিস সোরাবজির পিছনে পিছনে ঘুরিতে লাগিল এবং তাহার রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া উঠিল।
একটা জিনিস লক্ষ করিবার মতো বটে—দেখিলাম তাহার বাঙালি-প্রীতি তাহার প্রণয়িনীর প্রতি ভালোবাসা অপেক্ষা কম নয়। বাঙালির সব কিছুর সে আজ ভক্ত, আমাদের কত-কী ব্যাপারের প্রশংসা সে শতমুখে যদি বলিতে পারিত তাহার প্রণয়িনীর নিকট—তবে যেন তাহার তৃপ্তি হইত। বলিল, জানো জালু, ওঁরা বাংলাতে মূলো কথার বড্ড ব্যবহার করেন, প্রায়ই ওঁরা বলেন র্যাডিশ—আমি শিখে নিয়েছি, একটা বাংলা ইডিয়ম, মানে ‘খুব ভালো’!
নবীনদা অনুচ্চ স্বরে বলিলেন, মরেছে হতভাগা!
মিস সোরাবজি আমাদের দিকে চাহিয়া কৌতূহলের সুরে বলিল—ও হাউ ইন্টারেস্টিং! সত্যি মি. রায়—আপনারা বুঝি—ইত্যাদি।
মেয়েটিকে যা-তা বুঝাইয়া ও অন্য কথা পাড়িয়া চাপা দিলাম জিনিসটা।
বেলা তিনটার সময় আমাদের মোটর নাগপুর হইতে ফিরিয়া গোরেওয়াড়ার ওপারে আসিয়া ভেঁপু দিল। সকালে পৌঁছাইয়া দিয়া গাড়ি দু-খানা চলিয়া গিয়াছিল। আমরা যাওয়ার উদ্যোগ করিতে মিস সোরাবজি বলিল—সূর্যাস্তটা দেখে যাবেন না?
—ওদিকে দেরি হয়ে যাবে ফিরতে—আপনার বাবা কি ব্যস্ত হয়ে উঠবেন না?
—কিছু না মি. রায়, ভাববেন না। আমি বলে এসেছি—আমি ওই পাথরের ওপার থেকে দেখব সূর্যাস্তটা। তুমি এসো না শুকরাম!
—যেমন ইচ্ছে আপনার। শিগগির আসবেন।
অদ্ভুত সূর্যাস্ত। এখানে আসিয়া অবধি হাইল্যান্ড ড্রাইভ হইতে সাতপুরা শৈলমালার দিকে প্রায়ই দেখিতেছি। সন্ধ্যার ছায়া নামে, আমি সামান্য শৈত্যের জন্য গরম আলোয়ান ভালো করিয়া গায়ে টানিয়া দিই, হাইল্যান্ড ড্রাইভে সাহেব মেমদের মোটরের ভিড় বাড়ে, আম্বাসিরি লেকে পার্কে দলে দলে সুসজ্জিত নরনারী বেড়াইতে আসিতে আরম্ভ করে, আমি বড়ো একটা শালগাছের তলায় নির্জনে প্রস্তরখণ্ডে বসিয়া দেখি ধীরে ধীরে সাতপুরা শৈলশ্রেণির আড়ালে লাল সূর্যটা নামিয়া পড়িতেছে। আজও দেখিলাম। গোরেওড়ারা হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি যেন আবীর-গোলা টকটকে লাল। যেমন সূর্য অস্ত গেল, অমনি চারিধারে ঘনছায়া নামিল, মোটর দু-খানা অধীরভাবে ভেঁপু বাজাইতে লাগিল, বাদুড়ের দল পাহাড়ের দিকে ফিরিতে লাগিল, ক্রমে ছায়া ঘন হইয়া অন্ধকার নামিল।
নবীনদা বলিলেন,–কই, মিস সোরাবজি কোথায়?
—এই তো ছিল, সূর্যাস্ত ভালো দেখা যাবে বলে পাথরটার ওপারে গিয়েছে বোধ হয়।
এমন সময় মূলোর সঙ্গে মিস সোরাবজি পাথরের ওপাশের ঘাট থেকে উঠিয়া আসিল। উভয়েই স্নান করিয়া আসিল এই অবেলায়, দেখিয়া আশ্চর্য হইলাম।
মূলো কৈফিয়তের সুরে বলিল—বড়ো গরম, তাই জালু বললে, বেশ স্নান করা গেল।
নবীনদা বাংলায় বললেন—তার পর তোমার জালুর নিউমোনিয়া হলে তার বাবা দেখে নেবে তোমাকে—মূলোগিরি খাটবে না তখন—
মুলো বললে—কী?
আমি উত্তর দিলাম, জালু নামটা বড়ো চমৎকার! মি. বোসের মতে। অবশ্য আমারও সেই মত।
মিস সোরাবজি সলজ্জ হাসিয়া মেমসাহেবি সুরে বলিল—ও, ইউ হরিড ক্রিচারস!
আমরা গাড়ি তে উঠিয়া চলিলাম।
সাউথ টাইগার গ্যাস রোডের কিছু পূর্বে পাহাড়ি ঢালুতে অনেক বনশিউলি ফুল ফুটিয়া আছে দেখিয়া মেয়েটি বলিল—ও মি. রায়, কী চমৎকার ফুল ফুটেছে। শেফালি—না?
মোটর থামাইয়া মূলো গোটাকয়েক ডাল ভাঙিয়া আনিল। তখন সন্ধ্যা হইয়াছে, জ্যোৎস্নার ক্ষীণ লেশ মাটির বুকে। সাউথ টাইগার গ্যাস রোডের এদিকটা নির্জন, এ সময় খুব বেশি লোকজন নাই। হঠাৎ মেয়েটি বলিল—চলুন, আম্বাসিরি লেক দেখে আসি। এ জ্যোৎস্নায় বেশ লাগবে।
আমরা সকলেই হতবুদ্ধি। আম্বাসিরির দিকে যাইতে হইলে আবার পাহাড়ে উঠিতে হইবে। বিপদে ফেলিল দেখিতেছি খেয়ালি পারসি মেয়েটা। কী করা যায়, সুন্দরী তরুণীর আবদার উপেক্ষা করিবার সাধ্য নাই আমাদের—মোটর ঘুরাইয়া আবার সবাই পাহাড়ে উঠিয়া আম্বাসিরির দিকে ছুটিলাম। সেখানে লেকের ধারে পার্কে বিভিন্ন বেঞ্চিতে তখনও কেহ কেহ বসিয়া আছে। ক্রমে সুন্দর জ্যোৎস্না উঠিয়া হ্রদের জলে পড়িয়া সেদিনকার খিনসি লেকের স্মৃতি মনের মধ্যে আনিয়া দিল। পাহাড়ের উপর হু-হু ঠাণ্ডা বাতাসে সমস্ত শরীরে কাঁপুনি ধরিল। জনবিরল হ্রদ-তীরের পার্কটিতে দূরে দূরে দু-একটি নরনারী বেড়াইতেছে। ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে সবাই নামিয়া চলিয়া গিয়াছে বলিয়াই আরও চমক্কার লাগিতেছিল, নতুবা সাধারণত আম্বাসিরিতে বিকালের দিকে বড়ো ভিড় থাকে।
মিস সোরাবজিকে বলিলাম—কেমন লাগছে?
সে মেমসাহেবি সুরে সরু মিষ্টি গলায় টানিয়া বলিল—ও, ইট’জ ফা-ই-ন!
‘ফা’ হইতে ‘ন’ পর্যন্ত টানিয়া সুরে নামা-ওঠা করিয়া উচ্চারণ করিতে প্রায় পাঁচ সেকেন্ড সময় লইয়া মধুর ধরনে গ্রীবা বাঁকাইয়া মৃদু হাসির সঙ্গে কথাটা বলিল। এই তো কলেজের ছাত্রী, কতই বা বয়স, কুড়ি-একুশের বেশি নয়—এসব শিখিল কোথা হইতে কে জানে! নবীনদা অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বাংলায় বলিল— মেয়েটার আবার ভাবন দেখছ?
