আমিও বাংলায় বলিলাম—আমেরিকান ফিলম থেকে হলিউডের অ্যাকট্রেসদের সুর নকল করেছে কষ্ট করে। গলা মিষ্টি বলে মানিয়েছে।
মূলোর মনে কোনও কবিত্ব নাই। সে দেখিলাম মেয়েটির সহিত সুতা ও চরকা কাটা সম্পর্কে কী কথা বলিতেছে। মিস সোরাবজি আমার কাছে আসিয়া বলিল, —একটা কবিতা বলতে হবে—বলুন! এমন জায়গায় টাগোরের কবিতা একটি শুনব!
আবৃত্তি করিলাম—কী আর করি! মেয়েটির প্রাণে দেখিলাম সত্যই কবিত্ব আছে। সে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল প্রশংসায়। কিছু না-বুঝিলেও ভাষার ধ্বনিতে ও ঝংকারে তাহার মন মাতিয়া উঠিয়াছে। সে আমাদের অনুরোধের অপেক্ষা না করিয়া সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় শেলির একটি কবিতা আবৃত্তি করিল।
বলিলাম—গান করুন না একটা! মিস সোরাবজি হাসিয়া বলিল—ইংরেজি গান জানি, আপনাদের পছন্দ হবে না।
—ভারতীয় মেয়ে, দিশি গান শেখেননি কেন?
—আমাদের কমিউনিটির সাহেবিয়ানা এজন্যে দায়ী মি. রায়। বাবা গভর্নেস রেখে ছেলেবেলায় পড়িয়েছেন, গান শিখিয়েছেন—তাঁরা যে পথে নিয়ে গিয়েছে, সেই পথে যেতে হয়েছে আমায়। এখন জ্ঞান হয়ে সব বুঝতে পারি। এখন আমি গান্ধীবাদী, তা জানেন? খদ্দর পরি অনেক সময়, মা পরতে দেন না—এই হল কথা। ইচ্ছে হয় আমি শিখি ভারতীয় গান—খুব ভালো লাগে আমার।
নবীনদা হাসিয়া মনের আনন্দে একটা ভাটিয়ালি গান বেসুরে গাহিয়া ফেলিলেন। মিস সোরাবজিকে ইংরেজিতে তাহার অর্থও বুঝাইয়া দেওয়া হইল। গানে, গল্পে, কবিতা-আবৃত্তিতে হাসিখুশিতে সারাদিনটা কাটাইয়া রাত্রে যখন বাড়ি আসিয়া শুইয়া পড়িলাম—তখন যেন মাথার মধ্যে উগ্র মদের নেশা। নবীনদারও তাই, কারণ—তিনি আসিয়া পর্যন্ত গুন গুন করিয়া গান করিতেছিলেন।
মিস সোরাবজির বিবাহের অল্পদিন পরেই আমরা দুই বন্ধু নাগপুর হইতে চলিয়া গেলাম। বছরখানেক পরে আবার একবার বিশেষ কাজে নাগপুরে আসি।
সংবাদ লইয়া শুনিলাম বৃদ্ধ ডাক্তার সোরাবজি ইতিমধ্যে মারা গিয়াছেন। তাঁহার পরিবারবর্গ কেহই এখানে নাই—বৃদ্ধের মৃত্যুর পরে তাহারা বোম্বাই চলিয়া গিয়াছে।
মূলোর খবর জানিবার বিশেষ ইচ্ছা সত্বেও আমরা কাহাকে তার কথা জিজ্ঞাসা করব বুঝিতে পারিলাম না। ডাক্তার সোরাবজি শহরের বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে সকলের নিকটই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু মূলো জনৈক বিদেশি তরুণ ছাত্র—অমন ছাত্র নাগপুরে বহু আছে—কে কাহার খবর রাখে! আমরা ছাড়া আর সে কাহার সঙ্গে মিশিত জানি না, সুতরাং মূলোর খোঁজ লইবার ইচ্ছা থাকা সত্বেও উপায় হইল না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সপ্তাহখানেকের মধ্যে একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে হ্রদে। বেড়াইতে গিয়া মূলোর দেখা পাইলাম। নবীনদা তাহাকে প্রথম দেখেন। একখানা পাথরে ঠেস দিয়া কে একজন নির্জনে বসিয়া আছে দেখিয়া নবীনদাই বলিলেন— ওখানে কে দেখো তো হে!
গোরেওয়াড়া শহর হইতে বহুদূরে, এত দূরে কেহ বেড়াইতে আসে না। সাধারণত—স্থানটাও নির্জন পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে। আমি একটু কাছে গিয়া দেখি —মূলো! নিখুঁত সাহেবি পোশাক পরা সেই রকমই, তবে দাড়ি কামায় নাই, মাথার চুল ছোটো করিয়া ছাঁটা।
ভালো করিয়া লক্ষ করিয়া দেখিলাম—মূলো একখানা খাতাতে কী লিখিতেছে। এত নিবিষ্টমনে লিখিতেছে যে, আমার পদশব্দ সে শুনিতে পাইল না। কবি হইয়া গেল নাকি ছোকরা?
তাহার পর আমাদের সঙ্গে সে নাগপুরে ফিরিল। শুনিলাম সে এবারও পরীক্ষায় পাস করিতে পারে নাই। আমাদের পাইয়া মূলো ছেলেমানুষের মতো খুশি। চাপেবার দুগ্ধমন্দিরে লইয়া গিয়া আমাদের মিষ্টান্ন শরবত খাওয়াইয়া দিল। শুনিলাম দেশে তাহার মা মারা গিয়াছেন এই বৎসরেই।
বলিল—বড্ড একলা একলা বোধ করি এখানে। মিশব কার সঙ্গে? এখানে মেশবার লোক নেই। বাঙালিদের সঙ্গে মিশে আরাম। গোরেওয়াড়া লেকে মাঝে মাঝে গিয়ে বসে থাকি। বেশ লাগে। একদিন ওখানে বেশ কেটেছিল। মনে আছে। সেই আমাদের পিকনিক? ওরা কোথায় যে তা তো জানিনে!
দেখিলাম মূলোর চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল একটা ছবি—কয়েক শত বৎসর পূর্বের রাজপুতানায় বিশাল মরুভূমির মধ্যে উটের পিঠে চড়িয়া ইহার সেই বীর পূর্বপুরুষ চলিয়াছে জয়সিংহের সৈন্যদলের সহিত দেওধার যুদ্ধে, সেলিমগড়ের যুদ্ধে—চওড়া গালপাট্টাওয়ালা রুক্ষদর্শন মুখাবয়ব, দীর্ঘদেহ, পাশে খোলা দীর্ঘ দু-ধার তলোয়ার, হাতে সাত হাত লম্বা বন্দুক—মৃদুতা নাই, ভয় নাই—কবাটের মতো বিশাল বক্ষে জ্বলন্ত দুঃসাহস—কাহার সাধ্য ছিল তাহার মনোনীত কন্যাকে স্পর্শ করে। সে ছিনাইয়া আনিত তাহার প্রণয়িনীকে যেকোনো লোকের হাত হইতে! লড়িত, খুন করিত।
আধুনিক যুগের আবহাওয়ায় জয়সিংহের সৈন্যদলের সেই বীর নায়কের বংশধর এই সাহেবি পোশাক পরা, নিখুঁত টাই বাঁধা, ঘাড় চাঁচা, ক্লিন শেভড, হাতে রিস্টওয়াচ বাঁধা ছোকরা নিতান্ত নিরুপায়। কবিতা লেখা বা চোখের জল ফেলা ছাড়া সে হারানো প্রণয়িনীর জন্য কী করতে পারে? বিশেষত যখন দুইবার ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি না-পাইয়া সে আরও দমিয়া গিয়াছে।
ছোকরার জন্য এই সর্বপ্রথম দুঃখ হইল।
মেঘ-মল্লার
দশপারমিতার মন্দিরে সেদিন যখন সাপুড়ের খেলা দেখবার জন্য অনেক মেয়েপুরুষ মন্দিরপ্রাঙ্গণে একত্র হয়েছিল, তারই মধ্যে প্রদ্যুম্ন প্রথমে লোকটিকে দেখে।
সেদিন ছিল জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তি। চারিপাশের গ্রাম থেকে মেয়েরা এসেছিল দশপারমিতার পূজা দিতে। সেই উপলক্ষ্যে অনেক সাপুড়ে গায়ক বাজিকর মন্দিরে একত্র হয়েছিল; অনেক মালাকার নানা রকমের সুন্দর সুন্দর ফুলের গহনা গড়ে মেয়েদের কাছে বেচবার জন্য এনেছিল। একজন শ্রেষ্ঠী মগধ থেকে দামি রেশমি শাড়ি এনেছিল বেচবার জন্য। তারই দোকানে ছিল সেদিন মেয়েদের খুব ভিড়। প্রদ্যুম্ন শুনেছিল, জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তির উৎসব উপলক্ষ্যে পারমিতার মন্দিরে একজন বিখ্যাত গায়ক ও বীণ-বাজিয়ে আসবেন। সে মন্দিরে গিয়েছিল তাঁরই সন্ধানে। সমস্ত দিন ধরে খুঁজেও কিন্তু প্রদ্যুম্ন তাঁকে ভিড়ের মধ্যে থেকে বার করতে পারেনি।
