বৃদ্ধ ডাক্তার রাগতভাবে বলিলেন, সে একটা লোফার, আগেই বলেছি। গেজেটটা দেখেছেন? তার নাম খুঁজে দেখবেন, কোথাও নেই। আর আমার মেয়ে ফাস্ট ক্লাস অনার্স পেয়েছে।
আমরা সত্যই দুঃখিত হইলাম মূলোর জন্য।
এত কথার পর বিকালে যখন মূলো আসিয়া জানাইল মিস সোরাবজি ও আমাদের লইয়া সে পরদিন পিকনিকে যাইবে, তখন একটু আশ্চর্য হইয়া গেলাম। নবীনদা হাঙ্গামায় পড়ার ভয়ে প্রথমটা যাইতে চাহিলেন না—কিন্তু শেষে যখন মূলোর মুখে শুনিলাম, মিস সোরাবজির ভাইও এই সঙ্গে যোগ দিবে তখন আমাদের যাইতে কোনো আপত্তি রহিল না।
গোরেওয়াড়া হ্রদের ধারে পিকনিক ঠিক হইয়াছিল। পরদিন সকালে দল বাঁধিয়া দু-খানা মোটরে হ্রদের ধারে গিয়া পৌঁছিলাম। নাগপুরের পাহাড়ের মধ্যে যতগুলি হ্রদ আছে, এটি সর্বাপেক্ষা বড়ো, দৃশ্যও চমৎকার। আমরা উত্তর পাড় ধরিয়া হ্রদের ওপারে অনুচ্চ পাহাড়ের তলায় বড়ো বড়ো তিন্দুকগাছের ছায়াতে আমাদের বনভোজনের স্থান নির্দেশ করিলাম। মিস সোরাবজির ভাইটির বয়স-চোদ্দো পনেরোর বেশি নয়, বালক মাত্র—তাহার মনে দেখিলাম খুব ফুর্তি, হ্রদের জলে সাঁতার কাটিবার জন্য সে স্নানের পোশাক পর্যন্ত সঙ্গে করিয়া আনিয়াছে।
মিস সোরাবজি মেয়েটিকে ঠিক বোঝা কঠিন। এদিনও দেখিলাম মূলোর প্রতি তাহার যথেষ্ট আকর্ষণ, তাহার এতটুকু সুখ-সুবিধার জন্য মেয়েটির কী উদবেগ! অবশ্য আমাদের দুজনেরও সঙ্গে সে ভালো ভাবেই মিশিল। এতটুকু অহংকার নাই, বাঙালি মেয়ের মতোনই সরলতা, পরের সুখ-সুবিধা দেখার অভ্যাস, নিজের হাতে সেবা করিবার ঝোঁক। সে যে বি এ ক্লাসের ভালো ছাত্রী, তাহার কথাবার্তা হইতে এতটুকু তাহা বুঝিবার উপায় নাই।
আমাকে বলিল—মি. রায়, একটা বাংলা গান করুন না?
আমি গান গাহিতে ভালোই পারিতাম। এখন চর্চার অভাবে গলায় সুর নাই— সে আপত্তি বলা বাহুল্য টিকিল না, পর পর তিনটি রবীন্দ্রনাথের গান গাহিতে হইল। বাঙালিসমাজ নয়, বিশেষত কলিকাতা হইতে বহুদূরে, কাজেই ভুল ধরিবার কেহ নাই—বেপরোয়া হইয়া গাহিলাম। প্রশংসাও অর্জন করিলাম মূলো ও মিস সোরাবজির কাছে।
মুলো বলল—ওয়ান্ডারফুল! এমন গান যে আপনি গাইতে পারেন, তা জানতাম না বাস্তবিক।
মিস সোরাবজি বলিল—টাগোরের কবিতা মুখস্থ আছে?
—দু-একটা–
—আবৃত্তি করুন না! আমাদের কলেজে মি. সেনের মেয়ে একবার করেছিল, বড়ো ভালো লেগেছিল আমার।
‘জীবনদেবতা’ কবিতাটি মুখস্থ ছিল ভালো, আমার মুখে শুনিয়া মিস সোরাবজি উচ্ছ্বসিত সুরে বলিল—ভারি সুন্দর!
তাহার পর সে তাহার শুভ্র গ্রীবাটি দুলাইয়া আবদারের সুরে বলিল—মি. রায়, আর একটা আবৃত্তি করবেন দয়া করে?
—আগে আপনি একটা ইংরেজি আবৃত্তি করুন!
–করবেন তাহলে?
মিস সোরাবজির খড়ের মতো সূক্ষ্ম ও উগ্র নাসিকাকে ক্ষমা করিলাম, মেয়েটি অত্যন্ত চালবিহীন ও অমায়িক, তখনই সে ব্রাউনিঙের ‘বৈয়াকরণের শবযাত্রা’ নামে বিখ্যাত কবিতাটি সুন্দরভাবে আবৃত্তি করিয়া আমাদের মুগ্ধ করিল।
পুনরায় আমাকে একটি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করিতে হইল। এবার হাত-মুখ নাড়িয়া শিশির ভাদুড়ীর অনুকরণে ‘বন্দীবীর’ আবৃত্তি করিয়া ইংরেজিতে ভাবার্থ বুঝাইয়া দিলাম। পূর্বের কবিতাটি অপেক্ষা এইটিই মিস সোরাবজির বেশি ভালো লাগিয়াছে, তাহা তাহার কথার সুরে ও চোখমুখের ভাবে আমার বুঝিতে দেরি হইল না। আমায় বলিল—দেখুন রায়, টাগোরের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়েছি কিন্তু বাংলা ভাষায় ধ্বনি আর ঝংকারের মধ্য দিয়ে যে ওসব কবিতা এমন চমৎকার শোনায়, তা আমি আজ এই প্রথম জানলাম। এর আগে একবার বাংলা আবৃত্তি শুনেছিলাম কলেজে, সে তেমন কিছু নয়। আমার বাংলা শেখার বড়ো ইচ্ছে, কী করে শেখা যায় বলতে পারেন?
মূলো দেখিলাম খুব খুশি হইয়াছে—কবিতা শুনিয়া নয়, কারণ সে সূক্ষ্ম রসবোধ তাহার ছিল না—বাংলা কবিতা ও প্রকারান্তরে বাঙালির প্রশংসা করা হইতেছে, এইজন্য। লোকটা অন্ধ বাঙালিভক্ত।
বলিল—জালু, তুমি মি. রায়ের কাছে কেন বাংলা শেখো না! বেশ ভালো হবে–
মিস সোরাবজি পুনরায় আবদারের ভঙ্গিতে তাহার সুঠাম শুভ্র গ্রীবাটি দুলাইয়া বলিল—শেখাবেন আমাকে মি. রায়? আমি রোজ আপনার বাসায় আসব এক ঘণ্টা করে?
মুলো পরমউৎসাহের সুরে বলিল—হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ, বেশ!
নবীনদা বাংলায় বলিলেন—ওর তাহলে বড়ো সুবিধে হয়, দু-বেলা দেখা হয় কিনা। মূলোর কাণ্ড দেখো–সাধে কী বলে হর্স র্যাডিশ!
মুলো মিস সোরাবজির সঙ্গে কথা কহিতে অন্যমনস্ক ছিল, নবীনদার বাংলা কথা শুনিতে পাইল না—নতুবা বলিত, হোয়াট? কী বললে বাংলাতে?
আমি ভদ্রতা বজায় রাখিয়া বলিলাম—শেখালে তো বেশ হত—কিন্তু আমাদের সময় নেই কিনা! দুজনকে টো টো করে সারাদিন নিজের কাজে বেড়াতে হয়, নইলে এ তো বড়ো আনন্দের কথা।
আমরা গোরেওয়াড়ার জলে নামিয়া সবাই স্নান করিলাম, মিস সোরাবজি পর্যন্ত। দুপুর ঘুরিয়া গিয়া একদিকে ছায়া পড়িয়াছে—এখনও সেদিনকার সেই দিনটি চোখের সামনে যেন ভাসিতেছে—একদিকে অনুচ্চ কালো পাথরের পাহাড়, অন্যদিকে শিউলি ও তিন্দুকগাছের সারি, দু-দশটা বড়ড়া বড়ো শালও আছে। আকাশে খররৌদ্র, দুপুরের রোদ ঝক ঝক-করা চোখ-ঠিকরানো ছোটো ছোটো ঢেউএর সারি হ্রদের বুকে, অথচ এপারে অনেকখানি ছায়াসিক্ত—আঁটসাঁট স্নানের পোশাকে শুভ্রদেহ কৃশাঙ্গী ভেনাসের মতো পারসি তরুণী জালু শৈলবেষ্টিত হ্রদের নীল জল হইতে উঠিতেছে—দূরে ওপারে গোরেওয়াড়ার উঁচু পাড়ের উপর একটা বাংলো ধরনের বাড়ি, বোধ হয় এক ডাকবাংলো।
