মূলো বলিল—যাক মি. বোস, একটু চা খাওয়ার জোগাড় হয় না? চা না-খেলে আর তো চলে না!
মন্দির হইতে নামিয়া রামটেকের বাজারে চায়ের দোকানে চা-পান করিয়া নাগপুরে ফিরিলাম। এত ভালো ভালো জিনিস যে সারাদিন ধরিয়া দেখিলাম, মূলো সেসব সম্বন্ধে একটি কথাও বলিল না। তাহার যতসব বাজে গল্প আর অনবরত বকুনির জন্য আমরা নিজেদের মধ্যেও কিছু আলোচনা করিবার অবকাশ পাইলাম না।
পরদিন সকালবেলা মূলো আসিয়া হাসিমুখে বলিল—আপনাদের ওবেলা আমার সঙ্গে যেতে হবে।
জিজ্ঞাসা করিলাম—কোথায়?
—মিস সোরাবজির বাড়িতে চায়ের নিমন্ত্রণ।
—আমরা কেন?
—আপনাদের নিয়ে যাবার জন্যে আমাকে অনুরোধ করেছেন ওঁর বাবা।
আমরা বিকালে সাজগোজ করিয়া বসিয়া আছি, মূলো আর কিছুতেই আসে না। নবীনবাবু বলিলেন,—ওহে, মূলোটার মতলব শুনে আমাদের হাইল্যান্ড ড্রাইভে বেড়াতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল দেখছি, ও এল না!
এমন সময় মূলো আসিয়া হাজির হইল—সে নিখুঁত সাজপোশাক করিয়া কোটের বোতামে গোলাপ ফুল খুঁজিয়া রুমালে এসেন্স ঢালিয়া আসিয়াছে এবং বোঝা গেল যে সে কিছু পূর্বে নাপিতের দোকান হইতে চুলও কাটিয়া আসিয়াছে।
মিস সোরাবজির পিতা এখানকার ডাক্তার। পূর্ব হইতেই তাঁহার সহিত আমাদের পরিচয় ছিল—বৃদ্ধ অতিঅমায়িক লোক। দেখিলাম তিনি শুধু আমাদের তিনজনকে চা-পার্টিতে নিমন্ত্রণ করিয়াছেন তাহা নহে, শহরের আরও আট-দশটি ভদ্রলোককে বলিয়াছেন—তাঁহার পুত্রের জন্মতিথি উৎসব চা-পার্টির আসল কারণ।
মিস সোরাবজি আঠারো-উনিশ বছরের একহারা মেয়ে, আমরা তাহাকে অনেকবার দেখিয়াছি। খাঁড়ার মতো উঁচু ছুঁচালো নাকের জন্য কোনোদিনই মিস সোরাবজিকে বিশেষ সুন্দরী বলিয়া আমার মনে হয় নাই—যদিও রং বেশ ফরসা ও গলার সুর কষ্টকৃত মেমসাহেবিয়ানার দোষমুক্ত না-হইলেও মন্দ নয়। মেয়েটি নাকি লেখাপড়াতে ভালো।
একটা জিনিস লক্ষ করিলাম আমরা দুজনেই। মিস সোরাবজি মূলোর প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট—অন্তত হাবভাবে আমাদের তাহাই মনে হইল। বাহিরের বারান্দায় দুজনে নির্জনে মাঝে মাঝে যাইয়া দাঁড়াইতে লাগিল। মূলোর এতটুকু ইচ্ছাও যেন মিস সোরাবজি তখনই পূর্ণ করিতে ব্যর্থ। অতিথির প্রতি যতটুকু কর্তব্য করা উচিত শেষ করিয়া মেয়েটি মূলোকে লইয়া সবসময় ব্যস্ত রহিল।
চা-পার্টি হইতে ফিরিবার পথে মূলো কি আমাদের ছাড়ে—সঙ্গে সঙ্গে আসিল। কিন্তু তাহার যা স্বভাব,—মিস সোরাবজি সম্বন্ধে একবারও একটি কথাও বলিল। চা-পার্টির কথাই যেন তাহার মন হইতে মুছিয়া গিয়াছে এটুকু সময়ের মধ্যে।
নবীনদা বাংলায় বলিলেন—বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা! কলেজের বেশ ভালো মেয়ে বলে শুনেছি—র্যাডিশটার মধ্যে কী পেলে খুঁজে!
দু-দিন মূলো কী জানি কেন আমাদের বাংলোতে আসিল না। তৃতীয় দিন সকালবেলা একখানা মোটরগাড়ি বাসার সামনে দাঁড়াইতেই আমি আগাইয়া গেলাম —নবীনদা তখন বাসায় নাই। মোটর হইতে নামিলেন ড. সোরাবজি। আমাকে ডাকিয়া বলিলেন—শুকরাম কি এখানে এসেছিল? একটা জরুরি কথা আছে, আপনারা ওকে কতদিন জানেন?
-খুব বেশি দিন নয়। কেন বলুন তো?
—ও আমার কাছে কিছু বলে না। কিন্তু আমার মেয়ের কাছে বিবাহের প্রস্তাব করেছে। আমি ওকে বাড়ি ঢুকতে দেব না। ওকে আপনারা বারণ করে দেবেন।
মূলোর হইয়া ওকালতি করিবার ইচ্ছা হইল। বলিলাম—ওকে কি উপযুক্ত পাত্র বলে বিবেচনা করেন না?
ডাক্তার সোরাবজি রাগের সঙ্গে বলিলেন, ও একটা লোফার—ওর সঙ্গে আমাদের মেয়ের বিয়ে হবে কেন? ওরা হল ডোগরা—আমি আর্মিতে ছিলাম, ওরা সেখানে সাধারণ সেপাই-এর কাজ করে। সুবাদার হতে কাউকে দেখিনি। কেন জানেন?
বলিলাম—কী?
-খুব সাহস আছে, যা বলবেন তাই করবে—কিন্তু—
বলিয়া ডাক্তার সোরাবজি আঙুল দিয়া নিজের মাথায় দু-তিনবার টোকা দিয়া ঘাড় নাড়িলেন।
—তাহলে বলে দেবেন দয়া করে।
–আজ্ঞে ওটা বলা আমাদের পক্ষে একটু শক্ত, বুঝতেই পারেন।
—আমি বললে একটু রূঢ় হয়ে যাবে।
—কিন্তু একটা কথা বলি যদি কিছু মনে না-করেন—মিস সোরাবজির মনোভাব কেমন মিঃ শুকরামের ওপর, সেটা একবার
–সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। ওর মতো একটা বাজে অপদার্থ লোকের হাতে মেয়ে দেব? ও কোনওকালে বিএ পাস করতে পারবে? কোনোদিন নয়। আমার মেয়ে অনার্স ক্লাসের ছাত্রী, সকলের চেয়ে ভালো ছাত্রী—ওর সঙ্গে তার বিয়ে! হাসির কথা!
পরদিন সকালে মূলো আমার কাছে আসিয়া গোপনে বলিল, মি. রায়, সব ঠিক হয়ে গেল।
—কী ঠিক হয়ে গেল মি, শুকরাম?
—জালুর সঙ্গে বিয়ের। অবিশ্যি ওর সঙ্গেই কথা হল—ওর বাবা এখনও জানেন না।
-খুব খুশি হলাম শুনে। তবে ডাক্তার সোরাবজিকে একবার বলুন।
—সে হয়ে যাবে। তা—বললেও হয়। নবীনদা শুনিয়া বলিলেন—বাঁদরের গলায় মুক্তোর হার—মূলোর সঙ্গে অমন একটি চমৎকার মেয়ের বিয়ে!
ইতিমধ্যে মূলোর পরীক্ষা পড়িল—সে বি এ পরীক্ষা দিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশে গেল। আমাদের বার বার অনুরোধ করিয়া গেল, আমরা যেন তাহাকে না ভুলি—চিঠি দিলে যেন উত্তর দিই।
দুই মাস কাটিয়া গেল।
হঠাৎ একদিন আমাদের অত্যন্ত আশ্চর্য করিয়া দিয়া ডাক্তার সোরাবজি তাঁহার কন্যার বিবাহে আমাদের নিমন্ত্রণ করিয়া গেলেন। শুনিলাম পাত্র পুনার মেডিকেল অফিসার, আই এম এস পদবীর লোক। মোটা বেতন পান।
আমরা বন্ধুর প্রতি কর্তব্য স্মরণ করিয়া বলিলাম,—ও, আমরা জানতাম মি. শুকরাম—
