মূলোর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা হইত, যদি সে এখানে আসিয়া মিস সোরাবজি সম্বন্ধে কিছু বলিত—আমরা ভাবিতাম লোকটার প্রাণে তবুও কবিত্ব আছে। কিন্তু মন্দির-দুর্গের চওড়া প্রাচীরের উপর বসিয়া আমরা যখন দূরের জ্যোৎস্নালোকিত খিনসি হ্রদের দিকে চাহিয়া আছি, মন্দিরে প্রাচীন মারাঠি পুরোহিত রাম-সীতার আরতি করিতেছেন, পেশোয়াদের আমলের প্রথানুযায়ী আরতির সময় গম্ভীর নির্ঘোষে রণবাদ্য দামামা ও ডগর বাজিতেছে, ওইদিকে বহুদূরে কামটি ক্যান্টনমেন্টের ক্ষীণ সারি, তখন যদি সে তাহার প্রণয়িনীর কথা তুলিত—আমরা ভাবিতাম এই রামগিরি আশ্রমে জনক-তনয়ার স্নানহেতু পুণ্যোদকের স্পর্শে হর্স র্যাডিশ বুঝি কালিদাসের বিরহী যক্ষের দশা পাইয়া বসিল। কিন্তু তাহা হইবার নয়, সে মহাড়ম্বরে গল্প জুড়িয়া দিল—দেশের এক মিউনিসিপ্যাল কমিশনারকে সে কী করিয়া ভোট জোগাড় করিয়া দিয়াছিল। তাহা হইতে নামিল তাহাদের দেশে কি করিয়া ‘ফুটেরি’ তৈরি করে। আমরা কহিলাম—ফুটেরি কী?
মূলো হাত দিয়া গোলাকার জিনিস দেখাইবার ভঙ্গিতে বলিল—এই এত বড়ো বড়ো, আটার তৈরি, ভেতরে ছাতু, ঘুটের আগুনে সেঁকে ঘি দিয়ে খায়, আলুর চোখা আর বেগুনের ভর্তার সঙ্গে।
নবীনদা বলিলেন—মূলোর সঙ্গে নয়?
—নো, র্যাডিশ ইজ নট ইটন—
—আশ্চর্য!
—হোয়াই আশ্চর্য? র্যাডিশ ইজ মাচ রেলিশড ইন বেঙ্গল ইট সিমস—বাট নট সো ইন আওয়ার কান্ট্রি!
-বুঝলাম।
—আচ্ছা, এই দুর্গের পাঁচিলটা এত চওড়া কেন? মূলোর স্থূলবুদ্ধিতে আর কতটুকু বোঝা সম্ভব? তাহাকে বুঝাইয়া দিলাম, পেশোয়াদের সময়ে এই মন্দিরটি দুর্গের মতো করিয়াই তৈরি হয়—আসিবার পথে অতগুলি ফটক দেখিয়া তাহা সে নিশ্চয়ই কিছু আন্দাজ করিয়াছে। পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথ এই মন্দির-দুর্গ নির্মাণ করিয়া এখানে একটি গুপ্ত ধনাগার স্থাপন করেন। আকস্মিক রাষ্ট্রবিপ্লবের দিনে নাগপুর হইতে বিশ-বাইশ ক্রোশ দূরবর্তী এই অরণ্যাবৃত পাহাড়ের চূড়ায় রাম-সীতার মন্দিরে তাঁহার ধনভাণ্ডার অনেকটা নিরাপদ থাকিবার ভরসাতেই এটি নির্মিত হয়। বিশেষত তখনকার যুগে না-ছিল রেল, না-ছিল এখানকার দিনের মতো চওড়া মোটর-রোড। রামটেকের পাহাড় ছিল দুর্গম অরণ্যভূমির অন্তরালে—শত্রু সন্দেহ করিবে না যে জঙ্গলের মধ্যে কোথায় কোন পাহাড়ে রাম-সীতার মন্দির—সেখানে আবার ধনভাণ্ডার থাকিতে পারে। তবুও সাবধানের মার নাই ভাবিয়া বালাজি বিশ্বনাথ মন্দিরটিকে দুর্গের মতো করিয়াই নির্মাণ করেন—মন্দিরকে মন্দির, দুর্গকে দুর্গ। আবশ্যক হইলে কিছুকাল ধরিয়া এখানে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করাও চলিতে পারিত। জলের অভাব দূর করিবার জন্য পাহাড়ের নীচে একটি পুষ্করিণী খনন করা হয়—আসিবার সময় যে পুকুরটা ডান দিকে পড়িয়াছিল। মূলো আমার মুখে রামটেকের মন্দিরের ইতিহাস শুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। পরে বলিল—আপনি এসব নিয়ে খুব নাড়াচাড়া করেছেন দেখছি, বহুত পড়াশোনা করেছেন। এইজন্যেই তো বাঙালিদের আমি বড়ো ভালোবাসি—বাঙালির সঙ্গে আলাপ করলে আমার মন বড়ো খুশি হয়।
মন্দিরের আরতি থামিয়াছিল। আমি বলিলাম—এখানে একটা অস্ত্রাগার আছে বইয়ে পড়েছি—চলুন সেটা দেখে আসি সবাই, এখনও আছে বলে জানি।
মন্দিরের পুরোহিত বৃদ্ধ রংড়ে ব্রাহ্মণ, পূর্বেই পরিচয় পাইয়াছিলাম। তিনি প্রথমে মৃদু আপত্তি তুলিলেন, রাত্রে অস্ত্রাগার দেখানোর নিয়ম নাই—অবশেষে আমাদের নিতান্ত নাছোড়বান্দা দেখিয়া, বিগ্রহ যেখানে থাকেন তাহার পাশের একটা কুঠুরি খুলিয়া দিলেন। আমরা টর্চের আলোয় সেখানে মারাঠি যোদ্ধাদের প্রকাণ্ড চওড়া দু-ধার তলোয়ার, সাতহাত লম্বা বন্দুক, বিশাল ঢাল, লোহার জালের টুপি ও বর্ম, নানা রকমের তির, আরও কত-কী অস্ত্রশস্ত্র দেখিলাম। যোদ্ধৃজাতির যুদ্ধের উপকরণ পাঁচরকম থাকিবে—ইহার মধ্যে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই। প্রশংসার ভাব মনে জাগিত হয়তো, যদি বর্গির হাঙ্গামার কথা মনে না-উঠিত।
মূলো বলিল—এ আর কী, যোধপুর ওল্ড ফোর্টে একটা মিউজিয়াম আছে, সে এর চেয়ে অনেক বড়ো।
কোনো কিছু দেখিয়া আশ্চর্য হইবার ক্ষমতা একটা বড়ো ক্ষমতা—এ ক্ষমতা সকলের থাকে না, মূলোর মধ্যে তাহা থাকিবার আশা করি নাইঃ; সুতরাং বিস্মিত হইলাম না।
নবীনদা বলিলেন—আপনাদের দেশে যোধপুরে একবার নিয়ে যাবেন আমাদের? অস্ত্রাগার দেখে আসব।
—নিশ্চয়ই! ইন ফ্যাক্ট, আমাদের নিজ বাড়িতেই একটি অস্ত্রাগার আছে, আমার পূর্বপুরুষের আমলের।
-বলেন কী মি. শুকরাম!
—হাঁ। আমার অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ ছিলেন আওরঙজেবের আমলের লোক। তাঁর নাম—আচ্ছা নোটবুক দেখে বলব। আমরা হলাম ডোগরা রাজপুত— ওয়ারিয়ার ক্ল্যান ডোগরা রাজপুত জানেন তো? আমাদের সেই পূর্বপুরুষ, তিনি লড়েছিলেন জয়সিংহের সৈন্যদলে। এখনও অস্ত্রাগারের পুজো হয় আমাদের বাড়ি। ধূপধুনো জ্বালাতে হয়, সিঁদুর মাখাতে হয়।
নবীনদা বাংলায় বলিলেন—সাবাস মূলো! ডোগরা রাজপুত হয়ে মরতে এসেছ কেন ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি নিতে? ও কী তোমার হবে?
আমিও বাংলায় জবাব দিলাম—বিষ হারিয়ে ঢোঁড়া, মূলোর দু-কূলই গিয়েছে! অস্ত্র ধরবার ক্ষমতা নেই, লেখাপড়ারও বুদ্ধি নেই—একে বলে হর্স র্যাডিশ!
মূলো বলিল—কী?
নবীনদা বলিলেন—কীরকম বড়ো বংশে জন্ম আপনার তাই বলছি—ডোগরা রাজপুত যোদ্ধা জাত কিনা!
