ম্যানেজার আমাদের চা-পান করিতে বলিলে আমরা অস্বীকার করিয়া আবার নীচে নামিয়া আসিয়া মোটরে উঠিলাম। ম্যানেজারকে যথেষ্ট ধন্যবাদ দিলাম, কষ্ট করিয়া আমাদের সব দেখাইবার জন্য। গাড়ি পুনরায় চলিল।
নবীনদা কহিলেন—মূলো বড্ড গণ্ডগোল করে! আমাদের নিয়ে এমন করছিল…!
মূলো জিজ্ঞাসা করিল—কী, মি. বোস?
তাহার আবার সকল কথারই মানে জানা চাই।
নবীনদা বলিলেন,—চমৎকার খনিটা, তাই বলছিলাম।
—ও, তা র্যাডিশের কথা কী বলছিলেন? এখানে তো র্যাডিশ পাওয়া যায় না! আমরা দুজনে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলাম। নবীনদা বলিলেন,—ওটা একটা বাংলা ইডিয়ম মি. শুকরাম। ভালো জিনিসকে বাংলায় আমরা মূলো বলি।
-তাই নাকি? হাউ ইন্টারেস্টিং!
আমি বাংলায় বলিলাম, তোমার মুণ্ডু—বোকারাম কোথাকার!
নবীনদা বলিলেন,—মূলো আর সাধে বলে! একেবারে হর্স র্যাডিশ!
রামটেকের পাহাড় বাঁ-দিকে রাখিয়া কিছু দূর গিয়া রিজার্ভ ফরেস্টের নিবিড় ছায়াভরা বীথি-পথে চড়াই-উৎরাই ভাঙিয়া মোটর অপেক্ষাকৃত ধীরে চলিতেছে। শরৎ-অপরাহের অপূর্ব শোভা বনতলে। কোথায় যেন পাকা আতার গন্ধ, দু-একটা বনফুলের সুবাসের সঙ্গে যেন শেফালীর পরিচিত সুবাস ভাসিয়া আসিতেছে। বাতাসের ঝাপটায়। এমন শোভার মধ্যে বসিয়া আমরা কিছুক্ষণের জন্য ইনসিওরেন্সের দালালি বিস্মৃত হইয়া গেলাম।
খিনসি হ্রদে উঠিবার সময় পাহাড়ের পাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া পথ। অনেক দূর উঠিয়া গেলে শৈলবেষ্টিত হ্রদের শান্ত জলরাশি দৃষ্টিগোচর হয়। চতুর্দিকের শৈলসানু ঘন বনে সমাকীর্ণ, স্থানটা নিতান্ত নির্জন। একদিকে অপরাহের ছায়া, অপর পারের পাহাড়ের গায়ে হলুদ রঙের রোদ। হ্রদের এপারের ডাকবাংলোয় গিয়া আমরা চৌকিদারকে ডাকিয়া চেয়ার বাহির করাইয়া বসিলাম। চৌকিদার আমাদের নির্দেশমতো চায়ের জল চড়াইতে ছুটিল।
নবীনদা ও আমি হ্রদের জলে স্নান করিবার জন্য নামিলাম। বনের মধ্যকার সরু পথ ধরিয়া কতদূর নামিয়া গেলাম দুজনে। মূলো এসব ভালোবাসে না, সে ডাকবাংলোর বারান্দাতে বসিয়াই রহিল। জলের উপরে বুনো শিউলি ফুলের রাশি সকালের রোদে ঝরিয়া পড়িয়াছে—দু-তিন দিনের জমানো ফুলের রাশ। আমরা জলের ঢেউ একপাশে সরাইয়া দিয়া স্নান করিলাম।
নবীনদা বলিলেন,—বাঘ নেই তো? বড্ড জঙ্গল চারিধারে—
—আশ্চর্য নয় কিছু!
—মূলোটাকে বাঘে না-নিয়ে যায়। একা বসে আছে—
—কেন, ড্রাইভার?
—ও চৌকিদারের সঙ্গে গিয়েছে। বলে গেল ফিরতে আধঘণ্টা দেরি হবে, দুধ আনতে গেল। ভয়ে ভয়ে উপরে উঠিয়া দেখি মূলো নির্বিকারচিত্তে খবরের কাগজ পড়িতেছে। নাগপুর হইতে আনা বম্বে ক্রনিকল, আগের তারিখের। আমাদের দেখিয়া বলিল—আমেদাবাদের দুটো মিলে স্ট্রাইক হয়েছে বড়ো জোর—
নবীনদা আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন,—মূলোর কাণ্ড শোনি—এমন একটা জায়গায় এসে ওর এখন আমেদাবাদের মিলের কথা বড় দরকারি হল!
কিছুক্ষণ থাকিতে ইচ্ছা ছিল কিন্তু ড্রাইভার তাড়াতাড়ি করিতে বলিল। পাহাড়ের পথ, তাহার গাড়ি র আলোটা ভালো নাই—আমরা দেরি করিলে শেষে মুশকিলে পড়িতে হইবে।
মূলো বলিল—চলুন মি. বোস। আজ যাওয়া যাক, আর কী দেখবেন, দেখা তো হয়ে গেল—
নবীনদা বলিলেন—তোর মুণ্ডু হল—হতভাগা হর্স র্যাডিশ!
মূলো বলিল—কী?
—মানে আমাদের এখন যাওয়াই দরকার, তাই বলছি।
—হোয়াট হ্যাজ হর্স র্যাডিশ টু ডু উইথ ইট?
–বাংলা ইডিয়ম—ওর মানে মূলো খেতে যেমন ঝাল, অথচ দেখতে রাঙা তেমনি, এ জায়গা যতই ভালো হোক—মানে—এই গিয়ে–
আমি নবীনদার সাহায্যে অগ্রসর হইয়া বলিলাম—ঠাণ্ডা লাগতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত—বাংলা ইডিয়ম। মূলো হাসিতে লাগিল। বলিল—ফানি, দ্যাট র্যাডিশ ইজ অলওয়েজ মিক্সড উইথ ইওর বেঙ্গলি ইডিয়মস!
খিনসি হ্রদের পাহাড় হইতে নামিয়া রিজার্ভ ফরেস্টের কুসুমাস্তীর্ণ পথে আমরা রামটেক পাহাড়ের তলদেশে পৌঁছিলাম। নবীনদার আদেশে ড্রাইভার নাগপুরের রাস্তা ছাড়িয়া বন্য আতাবৃক্ষ শোভিত রামটেক পাহাড়ের ঘোরানো পথ ধরিল। মূলোর এ জিনিসটা মনঃপূত হইল না। সে দু-একবার মৃদু প্রতিবাদও করিল, বিশেষ কোনও ফল হইল না। আসল কথাটা আমরা জানিতাম। মিস সোরাবজি নামে একটি পারসি তরুণীর সঙ্গে মূলো ভাব জমাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছে আজ মাস ছ-সাত ধরিয়া। মেয়েটির বাবা নাগপুরের ডাক্তার, তাহাদের বাড়ি সন্ধ্যাবেলাটা কাটানো মূলোর অনেকদিনের অভ্যাস, যদিও মেয়ের বাপ-মা তাহা যে খুব পছন্দ করে তাহা নয়। মূলোর মুখে শুনিয়াই বুঝিয়াছি, তাঁহারা মূলোকে এমন ইঙ্গিতও করিয়াছেন যে, এত ঘন ঘন সে যেন তাঁহাদের বাড়ি না-আসে। কিন্তু মূলোর বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তির স্কুল আবরণ তাঁহারা ভেদ করিতে সমর্থ হন নাই।
পাহাড়ের নীচে গাড়ি রাখিয়া আমরা সিঁড়ি বাহিয়া উপরিস্থিত রাম-সীতার মন্দিরে উঠিতেছি। মূলো বলিল,—মি. রায়, একদিন মিস সোরাবজি বলেছিল রামটেকের মন্দির দেখবে, বড়ো ভালো হত যদি আজ আনতাম।
নবীনদা আমার গা টিপিলেন। আমার হাসি পাইতেছিল, অতিকষ্টে চাপিলাম।
পাথরে বাঁধানো অনেকগুলি সিঁড়ি ভাঙিয়া উপরে উঠিলাম। সিঁড়ির দু-ধারে অসংখ্য বন্য আতা, পড়াসি ও তিন্দুকগাছের নিবিড় বন। ডান দিকে অনাবৃত পর্বতগাত্র হেলিয়া থাকিয়া দৈত্যপুরীর মাইলস্টোনের মতো দেখাইতেছে। সন্ধ্যার ধূসর ছায়ামাখা নিস্তব্ধতার মধ্যে পেশোয়াদের নির্মিত এই শৈলমন্দির দুর্গটি ভারতের অতীত গৌরবের বার্তা বহন করিয়া আনিয়া দিতেছিল আমাদের কানে কানে। শুধু সে গাম্ভীর্যময় নিস্তব্ধতার তপোভঙ্গ হইতেছিল মূলোর অসম্ভব বকুনি দ্বারা। উপরে উঠিয়া আমরা বিগ্রহ দর্শন করিলাম। সামান্য কিছু প্রসাদ ও চরণামৃত পাইলাম। উঁচু পাহাড়ের উপর মন্দির, অনেক নীচে একদিকে রামটেকের বাজার।
