মূলো আমাদের সঙ্গে আসিতে পাইয়া বড়োই খুশি হইয়া উঠিয়াছে এবং ভীষণ বকুনি শুরু করিয়াছে। নবীনবাবু বাংলায় বলিলেন—মূলোটা তো বড় জ্বালাচ্ছে হে! ওকে এই ম্যাঙ্গানিজের মাইনে রেখে গেলে কেমন হয়?
মুলো জিজ্ঞাসা করিল—কী, মি. বোস?
তাহার সব বাংলা কথার মানে জানা চাই।
নবীনবাবু উত্তর দিলেন—এই ম্যাঙ্গানিজ খনিটা ইন্ডিয়ার মধ্যে একটা বড়ো খনি তাই বলছি।
নাগপুরে আমরা দুজনে আসিয়াছি বেড়াইতেও বটে, কিছু ইনসিওরের আসামি জোগাড় করিতেও বটে। সিভিল লাইনে কোতোয়াল সাহেবের বাংলো ভাড়া লইয়া যে-দিনটা বারান্দায় ক্যানভাসের আরামকেদারা পাতিয়া বসিয়া একটি সিগারেট ধরাইয়াছি—সেদিন এবং সেই মুহূর্তে এই লোকটি আসিয়া আমাদের সঙ্গে গায়ে পড়িয়া আলাপ করিয়াছে। একটি তরুণ যুবককে বাড়ির হাতায় ঢুকিতে দেখিয়া আমি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া আগাইয়া গেলাম এবং ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করিলাম
—কাকে চান?
যুবকটির চেহারা একহারা, দাঁত উঁচু, শ্যামবর্ণ, মুখে দুই-একটা বসন্তের দাগ, ছোটো ছোটো চোখ, পরনে নিখুঁত সাহেবি পোশাক। সে একগাল হাসিয়া বলিল—আপনারা এই বাসা ভাড়া নিয়েছেন? বাঙালি? সে আমি দেখেই বুঝেছি। সেইজন্যেই এলাম—বাঙালির সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে আমার অনেক দিন থেকে আছে।
বলিলাম—আসুন বসুন। এইখানেই বাড়ি বুঝি?
যুবক পাশের চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া বলিল—দেশ আমার যোধপুর। এখানে কলেজে পড়ি—ফোর্থ ইয়ারে।
—বেশ বেশ। একটু চা খান—
সেই হইতে ইহার যাতায়াত শুরু। এমন একটি দিন যায় নাই, যেদিন ছোকরা দু-বেলা আসে নাই এবং নানাপ্রকার আলোচনার অবতারণা করে নাই। দিন কয়েক পরেই নবীনবাবু এবং আমি আবিষ্কার করলাম যে ছোকরা কিছু স্থূলবুদ্ধি, ঠিক সকালে ও বিকেলে চা-পানের আগে আসিয়া জুটিবে এবং দুপুর পর্যন্ত বসিয়া বসিয়া শুধু বকিবে—উঠিবার নামটি করিবে না। বাধ্য হইয়া প্রায়ই দুপুরে বা রাত্রে —কোনো কোনো দিন দু-বেলাই তাহাকে খাইতে বলিতে হইয়াছে। সে খাইয়াছেও। এড়াইয়া চলিবার চেষ্টা করিলেও সে বুঝিতে পারে না।
হয়তো নবীনবাবু বলিলেন—মি, শুকরাম (তাহার নাম রত্নাকর শুকরাম জৈন), ওবেলা আমরা একটু হাইল্যান্ড ড্রাইভে বেড়াতে যাব, বিকেলটাতে থাকব না।
—বেশ বেশ, আমি সন্ধের পর আসব।
–ও, তা বেশ। তবে বোধ হয় ফিরতে একটু দেরিই হবে।
-না-হয় আমি একটু রাত করেই আসব এখন। আপনারা অনেক উঁচু বিষয়ে কথাবার্তা বলেন—আমার শুনতে বড়ো ভালো লাগে। এই জন্যেই আমি বাঙালিদের সঙ্গে মিশতে বড়ো ভালোবাসি। তা এখানে বাঙালি বেশি নেই—যাঁরা আছেন, তাঁরা বড়ো মেশেন না।
এই ধরনের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেওয়ার দরুন আমরা তাহাকে মূলো’ আখ্যা দিলাম এবং তাহার সাক্ষাতে পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে বাংলায় তাহাকে ‘মূলো’ বলিয়া উল্লেখ করিতাম। কখনও কখনও মূলো’-র ইংরেজি অনুবাদ করিয়া তাহার সামনেই তাহাকে ‘র্যাডিশ’, কখনও ‘হর্স র্যাডিশ’ বলিতাম। বেচারা আমাদের। বাংলা কথার অর্থ একবর্ণও বুঝিত না। ‘মূলো’ কথার ইডিয়মগত অর্থই বা বুঝিবে কীরূপে? মাঝে মাঝে আমাদের মুখে ‘র্যাডিশ’, ‘হর্স র্যাডিশ’ শুনিয়াও কিছু না বুঝিয়া হয়তো ভাবিত—ইহারা এ তিনটা কথা এত ব্যবহার করে কেন?
আমরা আর একটা জিনিস লক্ষ করিলাম। ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র বটে, কিন্তু মূলো’-র বিদ্যাবুদ্ধির দৌড় বিশেষ নয়, একজন ভালো বাঙালি ম্যাট্রিক ছাত্র তাহার অপেক্ষা অনেক কিছু জানে। বলা বাহুল্য অবাঙালি ছাত্রদের সম্বন্ধে আমাদের ধারণা স্বভাবত খুব উচ্চশ্রেণির নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়? রামো:, এখানে মানুষ আছে কে?
আমাদের এই মনোভাবের পটভূমিকায় আসিয়া উপস্থিত হইলে মূলোর ন্যায় একজন স্থূলবুদ্ধি ছাত্রের যে দুর্দশা এরূপ দাঁড়াইবে আমাদের বিচারে মাপকাঠিতে ইহা আর বেশি কথা কী!
মজার ব্যাপার এই, যাহাকে লইয়া এই ব্যাপার সে কিছুই বুঝিত না। বরং ভাবিত, আমাদের মতো অমায়িক বাঙালি ভদ্রলোকেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ হইয়া সে লাভবান হইয়াছে। এজন্য সে মাঝে মাঝে গর্বও করিত।
মূলোর মুখে শুনিয়াছিলাম ম্যাঙ্গানিজ খনির ম্যানেজারের সঙ্গে তার আলাপ আছে। গাড়ি জব্বলপুর রোডের উপর খনির সামনে দাঁড়াইতেই সে দোর খুলিয়া ছুটিয়া গেল ম্যানেজারকে খবর দিতে। যেন আমরা লাটসাহেব আসিয়াছি মানসারের ম্যাঙ্গানিজ খনি দর্শন করিতে—এমনভাবে সে হন্তদন্ত অবস্থায় আমাদের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিল। ইনি মি. বোস, ইনি মি. রায়—বাঙালি, খুব পণ্ডিত লোক এঁরা দুজনে। আমার বিশেষ বন্ধু।
—কী মুশকিল! পাণ্ডিত্যের মধ্যে তো আমরা করি ইনসিওরেন্সের দালালি! অবশ্য আমাদের প্রাচীন কীর্তি ও পুরাতত্বের ওপর কিছু ঝোঁক আছে। কিন্তু সে ফটোগ্রাফির দিক হইতে, বিদ্যা বা পাণ্ডিত্যের দিক হইতে নয়।
মূলোর কাণ্ড দেখিয়া আমরা মনে মনে কৌতুক অনুভব করিলাম।
ম্যানেজার নাগপুরের লোক, ছিন্দওয়ারা জেলার অধিবাসী, বেশ ইংরেজি বলে। জব্বলপুর রোডে গাড়ি দাঁড় করাইয়া আমরা প্রায় দুশো ফুট চড়াই ভাঙিয়া খনির মুখে গিয়া পৌঁছিলাম। একটা ক্ষুদ্র ডনকি ইঞ্জিনে খাদের জল তুলিয়া লম্বা রবার ও তারের নল দিয়া পাহাড়ের পাশ দিয়া ফেলিয়া দেওয়াতে ছোটোখাটো একটা জলপ্রপাতের সৃষ্টি হইয়াছে—সেটা দেখিয়া আমরা সকলে খুশি হইলাম।
