ওর সব দুঃখ, সব অপমান, অনাদরের দিনের হঠাৎ আজ এমন অপ্রত্যাশিতভাবে অবসান হল কীভাবে? নিস্তারিণী অবাক হয়ে যায়, বুঝতে পারে না কোনটা স্বপ্ন—কোনটা সত্য, সে একগাল হেসে স্বামীর হাত থেকে ইলিশমাছটা নেবার জন্যে হাত বাড়ায়।
নির্মলা চোখ মুছতে মুছতে বললে—সতী নক্ষ্মী সগগে চলে গেল—বউমা পায়ের ধুলো–নে—তারপর সে নিজেও ঝুঁকে পড়ে মাতৃসমা বড়ো জা-এর পায়ে হাত ঠেকায়।
মূলো—র্যাডিশ—হর্স র্যাডিশ
নবীনবাবু ঘুম হইতে উঠিয়া কয়লা চাকরকে ডাকাডাকি করিতেছেন শুনিতে পাইয়াও আবার চাদর মুড়ি দিয়া পাশ ফিরিয়া শুইয়া এবং তার একটু পরে বোধ হয় ঘুমাইয়াও পড়িয়াছি। জানালার ফাঁক দিয়া পাশের আতাগাছের ডাল যখন দেয়ালের গায়ে অনেকখানি রোদের মধ্যে ছায়া সৃষ্টি করিয়াছে, তখন কয়লার ডাকে তন্দ্রা ভাঙিল।
-বাবুজি, চা তৈয়ার!
—চা? এখানে নিয়ে আয়, বিছানায়।
নবীনবাবু বোধ হয় প্রাতভ্রমণ সারিয়া আমার ঘরের পাশের সরু করিডোর দিয়া গটগট করিয়া চলিয়া গেলেন, আমার আলস্যের প্রতি কটাক্ষ করিয়াই বেশ জোরে জোরে পা ফেলিয়া গেলেন। চা-পান বিছানায় বসিয়াই শেষ করিয়া উঠিব-উঠিব ভাবিতেছি, এমন সময় নবীনবাবু তাড়াতাড়ি আসিয়া আমার বিছানার পাশের দিকের জানালায় দাঁড়াইয়া বলিলেন—উঠুন মশাই, যোধপুরী মূলো এসেছে র্যাডিশ।
আমি চটি পায়ে দিতে দিতে বলিলামহর্স র্যাডিশ? একা, না-মিস সোরাবজিকে নিয়ে?
নবীনবাবু রাগ করিয়া বলিলেন—আসুন না, উঠেই আসুন না। মিস সোরাবজির বাবা-মার দায় পড়েছে ওর সঙ্গে মেয়েকে পাঠাতে সকালবেলা। একাই এসেছে।
পরে পিছন ফিরিয়া বলিলেন—আচ্ছা, রোজ রোজ কেন সকালে এসে জোটে বলুন তো? কী কাজ এখানে বাপু তোর? বিরক্ত করলে! আর আপনিও আটটার আগে বিছানা ছেড়ে উঠবেন না একদিনও–
বলিলাম—আপনার উক্তি দুটির মধ্যে পরস্পর-সম্বন্ধটা কী ভালো বুঝলাম না নবীনদা—
—বুঝবেন বুঝবেন—শিগগিরই বুঝবেন। যদি সকালে সকালে বেরিয়ে যাই, তাহলে তো আর এ হাঙ্গামা এসে জোটে না সকালবেলা। এখন চা করোরে, খাওয়ারে, ভ্যাজ ভ্যাজ করে বকেরে—
—নবীনবাবু, শিওরলি ইউ ডোন্ট গ্রাজ ইওর গেস্ট এ কাপ অব টি!
–থাক থাক হয়েছে—গেস্ট! ভারি আমার গেস্টরে!
যাহার অভ্যর্থনার আয়োজন এত হৃদ্যতাপূর্ণ, সে বেচারি নির্বিকার ভাবে হাসিমুখে বাংলোর বারান্দায় দাঁড়াইয়া ছিল। আমায় দেখিয়াই হাত বাড়াইয়া পরমবন্ধুত্বের সুরে বলিল—গুড মর্নিং মিস্টার রায়!
আমি হাত ঝাঁকাইতে ঝাঁকাইতে পরিপূর্ণ অমায়িকতার সঙ্গে বলিলাম—গ্ল্যাড ইউ হ্যাভ কাম মি. শুকরাম—গুড মর্নিং!
নবীনবাবু উদাসীনভাবে অতিথির করমর্দন করিয়া ইংরেজিতে বলিলেন, বসুন মি. শুকরাম। আমি একবার জেনারেল পোস্টাপিস থেকে একটা তার করে আসি, আপনি ততক্ষণ চা খান।
আমার দিকে চাহিয়া বাংলায় বলিলেন—মূলোকে শিগগির ভাগাবার চেষ্টা করুন। আজ এখুনি আমাদের বেরুতে হবে, কাজ আছে অনেক।
মূলো যাহাকে বলা হইয়াছে সে বাংলার একবর্ণও বোঝে না তাই রক্ষা। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা ইংরেজিতেই হয়।
মূলো জাঁকিয়া বসিয়া আমায় বলিল—বাঙালিদের মতো লুচি কবে খাওয়াচ্ছেন মি. রায়? ও আমার বড়ো ভালো লাগে। আমি বাঙালিদের সঙ্গে একষার মিশেছিলাম—লুচি খাইয়েছিল। সে এখনও ভুলিনি।
শুনিয়া মনে মনে বলিলাম—নবীনদার পিত্তি জ্বলে যেত—যদি কথাটা শুনত। ভাগ্যিস নেই এখানে। যে অভ্যর্থনার ঘটা তাঁর! কয়লা চাকরকে ডাকিয়া খানকতক লুচি ভাজিতে বলিতে গিয়া শুনিলাম ঘি ও ময়দা বাজার হইতে না-আনিলে চলিবে, ফুরাইয়া গিয়াছে। বুঝিলাম অতিথির অদৃষ্টে লুচি নাই। নবীনবাবু হয়তো ইতিমধ্যে আসিয়া পড়িতে পারেন। দরকার নাই সেসব হাঙ্গামায়। চা ও টোস্ট খাওয়াইয়া দিলাম মূলোকে। মূলো তাহার স্বভাবসিদ্ধভাবে বকিতে শুরু করিয়া দিল। বকুনি আর থামায় না, বেলা ন-টা বাজিয়া গেল, তবুও তাহার হুশ নাই। ইতিমধ্যে নবীনবাবু আসিয়া পড়িলেন, মূলোকে তখনও বসিয়া থাকিতে দেখিয়া বিরক্তির সহিত অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া আমায় বলিলেন—মূলোটা এখনও যায়নি? হর্স র্যাডিশটা?
—না-গেলে তো তাড়িয়ে দিতে পারিনে! ও বলছে আমাদের সঙ্গে খিনসি লেক দেখতে যাবে।
—মাটি করেছে! সারলে দেখছি।
মূলো আমাদের কথাবার্তা বুঝিতে না-পারিয়া বলিল—মি. রায় খিনসি লেক সম্বন্ধে কী বলছেন?
নবীনবাবু তাহার দিকে ফিরিয়া বলিলেন, অবশ্য ইংরেজিতে—খিনসি লেক সম্বন্ধে একটা পরামর্শ করছি ওর সঙ্গে। আপনি আসবেন নাকি আমাদের সঙ্গে?
—নিশ্চয় মি. বোস, খুব খুশির সঙ্গে।
—বেশ বেশ। বড়ো আনন্দ হল। বড়ো খুশি হলাম। আমি বললাম—মি. শুকরামের মতো সঙ্গী পেলে খিনসি তো খিনসি, উত্তর মেরুতে গিয়েও সুখ আছে।
নবীনবাবু ইংরেজিতে সায়সূচক কথা বলিয়া আমায় বাংলাতে বলিলেন—স্বর্গেও যদি যাও মূলোকে নিয়ে স্বর্গের হাওয়া পর্যন্ত তেতো হয়ে উঠবে, ওকে ভাগাবার চেষ্টা করো।
মূলো বলিল—তাহলে কখন রওনা হব আমরা, মি. বোস?
–রওনা? সে তো এখনও ঠিক হয়নি, দেখি—
—যদি বলেন আমার এক জানাশুনো গাড়ি আছে—পেট্রোলের খরচটা দিলেই রাজি হয়ে যাবে। বলব তাকে?
—বলুন না, বেশ বেশ!
আমরা সবাই বেশ উৎফুল্ল হইয়া উঠিলাম।
পরদিন মূলোর চেষ্টাতে গাড়ি র জোগাড় হইয়া গেল। আহারাদি সারিয়া আমরা তিনজনে শহর হইতে চল্লিশ মাইল দূরবর্তী খিনসি হ্রদ দেখিতে রওনা হইলাম। নাগপুর জব্বলপুর রোডের যে স্থান হইতে খিনসি হ্রদের রাস্তা বাহির হইল, ঠিক সেই জায়গাটিতে পড়ে মানসারের ম্যাঙ্গানিজ খনি।
