একদিন দু-দিন করে কতদিন যে কাটল, নিস্তারিণীর কোনো খেয়াল নেই। কেবল আবছা আবছা দিনগুলো আসে, সে-সব দিনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন নিঃসঙ্গ, কেবল ছোট্ট খোকা পিন্টুকে দেখতে ইচ্ছে করে…কিন্তু তার মা তাকে পাঠায় না, একটুও বসতে দেয় না কাছে। পুত্রবধূ হয়ে শাশুড়িকে দেখতে পারে না…তার নাকি ছোঁয়াচে রোগ হয়েছে বলে। আর কেবল সবাই বকে, সবাই বকে।
একদিন সে শুয়ে শুয়ে লক্ষ করলে আর আকাশে বৃষ্টি হয় না। হলদে রঙের রোদ বাঁশঝাড়ে, আমগাছের মাথায়। তেলাকুচো লতায় সাদা সাদা ফুল ধরেছে, বলাইয়ের হাতে পোঁতা উঠানের রাঙা ডাঁটা শাক ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। বর্ষাকাল তা হলে চলে গিয়েছে!
পুত্রবধূ আমতলায় কাঠ কাটছে, জিগ্যেস করলেও বউমা, এটা কী মাস?
—সে খোঁজে কী দরকার তোমার?
–বলো না বউমা?
—শেষ ভাদ্দর। তোমার কী হুশ-পোড়েন আছে? সেদিন চাপড়া ষষ্ঠী গেল, খোকাকে তোমার আশীর্বাদ করা দরকার, তোমার কাছে গিয়ে ডাকলে, তা যদি একটা কথা বললে–
বিকেলে ও-পাড়ার বুধো গোয়ালার মা দেখা করতে এসে বললে—ওমা, এ কী চেহারা হয়ে গিয়েছে! আহা, কতদিন হয়েছে আসিনি—বলি শুনচি বড্ড অসুখ, একবার দেখে আসি। উদুরী হয়েছে বুঝি, পেট যে ফুলেচে বড্ড। সোনার পিরতিমে চেহারা ছিল বউমার। আমি তো আজকের লোক নই, যখন হরি প্রথম বিয়ে করে এল—ওই আমতলায় দুধে আলতার পিঁড়িতে দাঁড়াল, বেশ মনে আছে, রূপে একেবারে ঝলকা দিয়ে গেল যেন। সে চেহারার আর কিছু নেই। এমন নক্ষি বউ—আহা, তার এত কষ্টও ছেল অদেষ্টে।
নিস্তারিণী যেন সব বিষয়ে নিস্পৃহ, উদাসী হয়ে পড়েছে। এসব কথা শুনে যায় বটে, কিন্তু কার বিষয়ে কে যেন কথা বলছে! সেকালের সে বড়োবউ তো কোনকালে মরেহেজে গিয়েছে! সে রূপসী, লক্ষ্মীর মতো সংসারজোড়া বড়োবউ কোথায় আজ?…কেবল খেতে ইচ্ছে হয়। পান্তাভাত কতকাল খায়নি। কেউ দেয়
—দেখাই করে না এসে। সন্ধ্যার পরে নির্মলা এসে একটু কাছে বসে, বলে— ও দিদি, তোমার জন্যি একটা জিনিস এনেছি মনিববাড়ি থেকে। নিস্তারিণী ব্যগ্রভাবে বলে—কী কী?
-চুপ করো। দুটো তালের বড়া। গিন্নি ভাজছে, তা আমাকে খেতে দেলে—
—কতকাল খাইনি! দে—
নির্মলা বেশিক্ষণ বসতে পারে না, রান্নাঘরে খই ভেজে দিতে হবে জামাই অভিলাষকে। তারা বলে দিয়েছে—কাল মুড়কি মাখবে সকালবেলা। সে মুড়কির ব্যাবসা করে, কিন্তু খই ভাজা কাজটা মেয়েমানুষের, পুরুষের নয়—ওটা শাশুড়ির বিনা সাহায্যে সম্পূর্ণ হয় না।
রান্নাঘরে যেতে সাধনের বউ বললে—কাকিমার বুড়ির কাছে রোজ বসা চাই ই। অমন ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে—পাপের দেহ তাই কষ্ট পাচ্ছে—নইলে মরে যেত কোনকালে!
নির্মলা ধমক দিয়ে বললে—অমন বলিসনে বউমা, মুখে পোকা পড়বে। সতী নক্ষ্মী মেয়ের নামে কিছু বোলো না। তোর আপন শাশুড়ি না? তুই ওসব কথা মুখে বের করিস কী করে? আজই না-হয় ও অমন হয়ে গিয়েচেও যে কী ছিল, আমি সব দেখেচি। এই সংসারের যা কিছু ঝক্কি চিরকাল ও পুইয়েছে। দেওরদের মানুষ করা, বিয়ে-থাওয়া দেওয়া—ও না-থাকলে সংসার টিকত না। আজ না-হয় ওর
সাধনের বউ ঠোঁট উলটে বললে—হোক গে যাক বাপু, ও নিজের ছেলে খেয়েছে—ওর ওপর আমার এতটুকু ছেদ্দা নেই, যতই বলো।
—ও খেয়েছে, কী বলিস বউমা! ও ছেলে খেয়েছে! যাবার অদেষ্টে যায় চলে। কার দোষ দেব! তাহলে তো তোকেও বলতে পারি—তুই সোয়ামি খেয়েছিস।
এই কথার উত্তরে খুড়শাশুড়ি ও বউয়ে তুমুল ঝগড়া বেধে উঠল।
আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি। পুজো প্রায় এসে পড়েছে। নিস্তারিণী একেবারে উত্থানশক্তিহীন হয়ে পড়েছে। দিনের অর্ধেক সময় তার জ্ঞান থাকে না। এক একবার চেতনা সজাগ হয়ে ওঠে, তখন কেবল এদিক-ওদিক চেয়ে নাতিকে খোঁজে। নির্মলাকে খোঁজে। ওর মলিন বিছানা ও সারা দেহে কেমন একটা দুর্গন্ধ বলে আজকাল কেউই কাছে আসতে চায় না। কেবল খাওয়ার সময় কোনোদিন নির্মলা, কোনোদিন বা সাধনের বউ দুটি ভাত দিয়ে যায়। সেদিন ও চোখ মেলে ভাত খাবার চেষ্টা করলে—কিন্তু পারলে না। অনেকক্ষণ পরে পুত্রবধূ বললে— ভাত খাওনি যে, খাইয়ে দেব?
নিস্তারিণী অবাক হয়ে গেল অসুখের ঘোরের মধ্যেও। বললে—তাই দে বউমা।
সাধানের বউ ভাত দুটি খাইয়ে এঁটো থালা নিয়ে চলে গেল। একটু পরে নির্মলা বাড়ি এল। রোগীকে দেখতে গিয়ে ওর মনে হল অবস্থা ভালো নয়। আপনমনে বললে—ঠাকুর, ওকে মুক্তি দাও, বড় কষ্ট পাচ্ছে—
প্রতিদিন সন্ধ্যায় যেমন নিস্তারিণীর জ্ঞান হয়, আজও তেমনি হল। জা-কে অবোধ বালিকার মতো আবদারের সুরে বললে—দুটো পান্তভাত আর ইলিশমাছ। ভাজা খাব—
নির্মলা দু-তিন দিন চেষ্টার পরে অতিকষ্টে এই যুদ্ধের বাজারে ইলিশমাছ জুটিয়ে এনেছিল, কিন্তু জা-কে খেতে দিতে পারেনি।
নিস্তারিণীর অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে ঝুঁকল পরদিন দুপুর থেকে।
সে অসুখের ঘঘারে কোন বিস্মৃত পথ বেয়ে ফিরে গেল তার যৌবনদিনের দেশে। বাঁড়ুজ্যেদের ন-গিন্নি যেন এসে হেসে হেসে বলচেন, “আমায় আজ দু কাঠা চাল ধার দিতে হবে বউ। বউমা তাড়িয়ে দিয়েছে বাড়ি থেকে—তুমি না দিলে দাঁড়াব কোথায়?”…যেসব লোক কতকাল আগে চলে গিয়েছে, তারা যেন এসে দিনরাত ওর বিছানার চারিপাশে ওকে ঘিরে ভিড় করচে। বহুদিন শরৎ অপরাহ্রে মতো হাট থেকে ফিরে ওর স্বামী যেন হাসিমুখে বলচেও বড়োবউ, কলা বিক্রির দরুন টাকাগুলো এই নাও, তুলে রেখে দাও—আর এই ইলিশমাছটা—ভারি সস্তা আজ হাটে–
