—তোর মা কোথায়?
—বাড়িতে কেউ নেই। মা গাঙ্গুলী-বাড়ি কাজ করতে গিয়েছে, ঠাকুমা নরহরিপুরে হাঁসের ডিম আনতে গিয়েছে—
—পিন্টুর মা কোথায়?
—ওই যে শিউলিতলায় বসে বাসন মাজছে—
—একটু ডেকে দিয়ে যা দিকি মা—
পরে সুর খুবই নীচু করে বললে—মা দু-টো মুড়কি অভিলাষের কাছ থেকে নিয়ে আয় না, আমার নাম যেন করিসনে—
তারা বললে—সে আমি পারব না। অসুখ-গায়ে মুড়কি খাবে কী? তারপর শেষকালে ঠাকুমা টের পেলে আমায় বকে ভূত ঝাড়াবে। চললাম আমিও বউদিদি, শুনে যাও জ্যাঠাইমা ডাকচে—
পুত্রবধূ বিরক্ত মুখে এসে দূরে উঠোনে দাঁড়িয়ে বললে—বলি ডাকের ওপর ডাক কেন অত? আমার সংসারে কাজকর্ম নেই, না তোমার কাছে বসে থাকলে চলবে? কী বলছো বলো—
নিস্তারিণী কাতর সুরে বললে—তা রাগ করিসনে আমার ওপর বউমা, আমায় দুটো ভাত দে—
—দিই! জ্বরে বেহুশ হয়ে পড়ে আছ, ভাত না-খেলে কী চলে!
–তবে আমি কী খাব, খিদে পায় না?
—আমি জানিনে। আদিখ্যেতার কথা শোনো! খিদে পায় তা আমি কী করব? ঠাকুমা এলে বলো, ঠাকুমা না-বললি আমি ভাত দিতি পারব না।
—পিন্টু কোথায়? একটু ডেকে দে আমার কাছে—বড্ড ইচ্ছে করে দেখতি—
পুত্রবধূ ঝংকার দিয়ে বলে উঠল—অত সোহাগে আর কাজ নেই। ছেলের মাথা। খেয়ে বসে আছে, এখন নাতিটি বাকি?
নিস্তারিণী মিনতির সুরে বললে—অমন করে বলতি নেই, বউমা। তা দে ডেকে, কিছু হবে না, দে একবার ডেকে—
পুত্রবধূ হাত-পা নেড়ে বললে–না–না–হবে না। তোমার পাণ্ডুর রোগ হয়েচে, বিশ্রী ছোঁয়াচে রোগ—আমি ছেলে পাঠাতি পারব না তোমার কাছে। গেলি আমারি যাবে তোমার কী?
কথা শেষ করেই মুখ ঘুরিয়ে পুত্রবধূ চলে গেল। নিস্তারিণীর দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ে হেঁড়া, ময়লা, তেলচিটে বালিশটা ভিজিয়ে দিলে। এমন কথাও লোককে লোকে বলে—তাও নিজের পুত্রবধু! সাধনের নাম রেখেচে ওই ধুলোগুঁড়োটুকু—ওই অবোধ শিশু। মা সাতভেয়ে কালী তার মঙ্গল করুন, মঙ্গল করুন।—সে না তার ঠাকুরমা, বউমা বলে কিনা, গেলে তারই যাবে।
সন্ধ্যার কিছু পূর্বে নির্মলা বামুনবাড়ির কাজকর্ম সেরে ফিরে এল। বড়ো জায়ের কাছে গিয়ে বললে—কেমন আছ দিদি? দেখি, গা দেখি—
নিস্তারিণী না-ঘুম না-জ্বরে আচ্ছন্নমতো হয়ে পড়েছিল, কপালে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠে বললে—কে ছোটো বউ? তুই আবার আমায় ছুঁলি কেন? তোর পাছে পাণ্ডুর রোগ হয়—আজ আমায় বউমা বলেছে—হ্যাঁ ছোটো বউ, সাধনের ছেলে আমার কেউ নয়? বলো তুমি—
নিস্তারিণী নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। নির্মলা বললে—চুপ করো চুপ করো দিদি, সবই তোমার কপাল। পিরতিমের মতো বউ ছিলে, সব তো দেখেচি। স্বভাব চরিত্তির সম্বন্ধে কেউ একটা কথা বলতি পারেনি কোনোদিন।
—কেন, দেওরদের কোলেপিঠে করে মানুষ করিনি? আমি যখন ঘর করতি এলাম, তোর সোয়ামি তখন ন বছরের ছেলে। আমার পাত থেকে বেগুনপোড়া ভাত মেখে খেত, আর আজ আমি হইচি নাকি ডাইনি—
—চুপ করো দিদি। এসব কথা আমি সব জানি। এখন কী খাবে তাই বলো— নিস্তারিণী মিনতির সুরে বললে—দুটো ভাত—
—না, আমায় বকিও না। সারাদিন কাজ করে দুঃখধান্দা করে এলাম। দুটো মুড়ি নিয়ে এসেছি—
–শোন ছোটোবউ, অভিলাষ আজ গরম মুড়কি মেখেছে, তারা বলে গেল—
-না, সে-সব হবে না। গুড়ের মুড়কি জ্বর হলে খায় না। দুটো তেলনুন দিয়ে মুড়ি মেখে দিগে, খেয়ে এক ঘটি জল খেয়ে আজ রাত্তিরটুকু পড়ে থাকো। শুনেচ কাণ্ড, বাজারে নাকি চালের পালি দেড় টাকা! ভাত আর খাতি হবে না। বলাই আর কত রোজগার করবে, কী করে এই বিধবার পুরী চালাবে? ধান ফুরিয়ে এসেচে, এবার আমাদের মতো গরিবদের না-খেয়ে মরণ।
নিস্তারিণী স্তব্ধ হয়ে শুনলে। অসুস্থতার দরুন সে বহুদিন অবধি বৈষয়িক ব্যাপারে নিস্পৃহ, তবুও দেড় টাকা এক পালি চাল শুনে সে যেন অত জ্বরের ঘোরের মধ্যেও চমকে গেল। সেকালে যে তাদের গোলার ধান বিক্রি হয়েছে,–আঠারো আনা করে সরু বাঁশসলা কী চামরমণি ধানের মণ। মনে আছে, একবার তার প্রথম পুত্রের অন্নপ্রাশনের জন্য গোলা থেকে পঁচিশ টাকার ধান বিক্রি হয়— পাঁচ সিকা ছিল এক মণ ধানের দাম।
নিজের হাতে সে কত ধান বিলিয়ে দিয়েছে…একবার গাঁয়ে আকাল হয়েছিল, টাকায় সাড়ে তিন সের হয়ে উঠল চালের দাম। বামুনপাড়ার মেজো গিন্নি একদিন তাকে বাড়িতে ডেকে বল্লেন, ”বউ, তোমায় একটা কথা বলি—খাওয়া-দাওয়ার বড্ড কষ্ট, দু-মণ ধান আমাকে ধার দিতে হবে। ঈশ্বরের ইচ্ছেয় তোমার কোনো অভাব নেই। গোলা আরও উথলে উঠুক তোমার।” সে শাশুড়িকে লুকিয়ে দু-মণ ধান বার করে দিয়েছিল গোলা থেকে। শাশুড়ি চিরকালের খাণ্ডার, কাউকে কিছু জিনিস দেওয়া পছন্দ করত না কখনো। কিন্তু তখনকার দিনে এ সংসারে তার প্রতিপত্তি ছিল অন্যরকম। সে যা করবে তাই হবে। তার ওপর কথা বলবার কেউ ছিল না। কোথায় গেল সে-সব দিন!
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। নির্মলা এক বাটি দুধ নিয়ে এসে বললেও দিদি, খেয়ে নাও একটু দুধ।
নিস্তারিণী বললে—আমার এখানে একটু বোস ছোটোবউ-কেউ বসে না।
নির্মলার বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসবার জো নেই। এক্ষুনি সব খেতে চাইবে, শেষরাত্রে উঠে চার কাঠা ধানের চিঁড়ে কুটতে হবে বাঁড়য্যেদের।
তারপর আবার যে একা সেই একা। সারা দিনরাত আজ একটি মাস ধরে একাই শুয়ে থাকতে হচ্ছে। নির্মলা তাকে ধরাধরি করে ঘরের মধ্যে শুইয়ে দিয়ে গেল।
