—বাসি আখার ছাই খেতে দেব। ডাইনি রাক্ষুসি—আমার সংসার তোর দিষ্টিতে জ্বলে পুড়ে গেল! নইলে কী না ছেল, গোলাভরা ধান ছেল না? হাঁড়ি ভর্তি ডালডুল, গোয়াল–ভর্তি গোরুছাগল—ছেল না কী?
উভয় পক্ষের চেঁচামেচি শুনে ওর জা নির্মলা সেখানে এসে পড়ল। এটি হরি যুগীর ছোটো ভাই যুগলের বিধবা স্ত্রী। এর একমাত্র পুত্র বলাই এই সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষমানুষ। বলাইয়ের বয়েস এই উনিশ বছর।
বলাই বাঁশ কিনে গাড়ি বোঝাই দিয়ে রেলস্টেশনে নিয়ে যায়, সেখান থেকে মালগাড়িতে উঠিয়ে কলকাতায় পাঠায়। গত বছরখানেক এ ব্যাবসা করে সে গোটা পঞ্চাশ টাকা হাতে জমিয়েছে—মা-র হাতেই এনে দিয়েছে সে টাকা। নির্মলা আবার সে টাকাটা থেকে কুড়িটা টাকা শাশুড়িকে দিয়েছে। বুড়ি সেই টাকায় পাশের গ্রাম থেকে দুধ কিনে এ গ্রামের ব্রাহ্মণপাড়ায় জোগান দেয়, তাতেও সামান্য কিছু লাভ থাকে। বুড়ির বয়স সত্তর ছাড়িয়ে গেলেও সে এখনও দুপুররোদে সারা পাড়া সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়—দূর-দূরান্তরের চাষাগাঁয়ে হাঁসের ডিম, মুরগির ডিম সংগ্রহ করতে যায় ব্রাহ্মণপাড়ায় বিক্রির জন্যে।
নির্মলা নিজেও বসে থাকে না, তিনু গাঙ্গুলীর বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে মাসে দু টাকা মাইনে পায়।
সুতরাং এ সংসারে এখন নির্মলার প্রতিপত্তিই বেশি। নিস্তারিণীর দিন সকল রকমেই চলে গিয়েছে। এখন নির্মলার ছেলে বলাই পয়সা আনে, নির্মলা নিজে পয়সা আনে, বলাইয়ের পয়সায় ওর ঠাকুরমা দুধের জোগান দিয়ে কিছু আয় করে। নিস্তারিণী শীর্ণ পাণ্ডুর দেহে উত্থানশক্তিরহিত শয্যাগত অবস্থায় শুধু ‘খাই খাই’ করে রোগের দুষ্টক্ষুধায় অবোধ বালিকার মতো। হরি যুগী বেঁচে থাকলে তার সে অন্যায় আবদার খাটত, সাধন বেঁচে থাকলেও খাটত—আজ তার আবদার কান পেতে শোনবার লোক কে আছে এ সংসারে?
নির্মলার বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ—বেশ ধপধপে ফর্সা, মুখচোখ ভালোই, মাথায় এখনও একঢাল চুল, একটি চুলেও পাক ধরেনি। যুগীদের মেয়েরা সাধারণত সুন্দরী হয়ে থাকে। নির্মলার মেয়ে তারাও বেশ সুন্দরী। তারা বলাইয়ের ছোটো, এই মাত্র চোদ্দো বছর বয়েস। আজ বছর দুই হল এই গ্রামেই তার বিয়ে হয়েছে।
নির্মলা এসে বললে—দিদি, চেঁচিও না। ঝগড়া করে মরচ কেন?
নিস্তারিণী কাঁদতে কাঁদতে বললে—দ্যাক দিকি ছোটো বউ, আমায় কিনা রাক্ষুসি, ডাইনি বলে! আমি নাকি এসে ওনার সংসারে আগুন লাগিয়ে দিইচি! আমার সোয়ামি পুতুরের অন্ন উনি কোনো দিন বুঝি দাঁতে কাটেননি—
নির্মলা বললে—সে তো তুমিও ওনাকে বলেচ। যাক, এখন চুপটি করে শুয়ে থাকো।
—ও ছোটো বউ, আমি দু-টো ভাত–
—না, আজ না। তোমার গা ফুলেচে, মুখ ফুলেচে”তুমি ভাত খাবে কী বলে আজ?
—তা হোক, তোর পায়ে পড়ি—
—আচ্ছা এখন চুপ করো, বেলা হোক। ভাত রান্না হোক, আমি বলব তখন। নিস্তারিণীর হাত, পা মুখ ফুলেচে একথা ঠিকই। কী বিশ্রী চেহারা হয়ে গিয়েছে তার, ওর দিকে যেন আর তাকানো যায় না—এমন খারাপ দেখতে হয়েছে ও। যত্ন করবার কেউ-না থাকাতে আরও দিন দিন ওর অবস্থা খারাপতর হয়ে উঠেছে। খেতে ইচ্ছে করে কিন্তু আগ্রহ করে খেতে দেবার কেউ নেই। রোগীর পথ্য তো দূরের কথা, দুটি ভাত তাই কেউ দেয় না।
ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না-পেরে বেলা দশটা আন্দাজ সময়ে সে নাতিকে ডেকে চুপি চুপি বললে—পিন্টু, দুটো পেয়ারা আনতে পারিস?
পিন্টুর মা ছেলেকে বলে—খবরদার, যাবি না বুড়ির কাছে! ওর পাণ্ডুর রোগ হয়েচে, ছোঁয়াচে রোগ। ছেলে খেয়ে বসে আছে ডাইনি, আবার নাতিকে খাবার জোগাড় করচে–ঠ্যাঙ ভেঙে দেব যদি ওর কাছে যাবি–
বেলা দুপুরের পরে সে ভীষণ জ্বরে বিকেল পর্যন্ত অঘোরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল— কখন যে এ বাড়ির লোক খাওয়া-দাওয়া করেছে তা সে কিছুই জানে না। যখন তার খানিকটা জ্ঞান হল, তখন ভাদ্র মাসের রোদ প্রায় রাঙা হয়ে উঠানের আমগাছটা, বাঁশঝাড়গুলোর আগায় উঠে গিয়েচে। মুখের কাঁথাটা খুলে দিয়েই ও চি-চি করে প্রথমেই ডাকলেও পিন্টু, পিন্টু—
পিন্টু কোথা থেকে ছুটে এসে বললে—কী ঠামা?
—আমার জন্যি সেই পেয়ারা আনলি?
—না, ঠামা।
—আনিসনি? ছেলেমানুষ ভুলে গিয়েচিস? বোস এখানে।
কিন্তু পিন্টু বসতে ভরসা পায় না, মা দেখতে পেলে মার খেতে হবে। সে আনমনে খেলা করতে করতে অন্যদিকে চলে গেল। একটু পরে নিস্তারিণী আবার ডাকলেও ছোটো বউ-ছোটো বউ–
কেউ উত্তর দিল না, কারণ এ সময়ে বাড়িতে কেউ থাকে না।
আরও দু-বার ডাক দিয়ে নিস্তারিণী অবসন্ন হয়ে পড়ল, তার বেশি চেঁচামেচি করবার ক্ষমতা নেই।
বেশ খানিকক্ষণ পরে নির্মলার মেয়ে তারা এসে বললে—হ্যাঁ জ্যাঠাইমা, ডাকছিলে?
নিস্তারিণী চি-চিঁ করতে করতে বললে—কাতরে কাতরে মরে গেলাম, তা যদি তোমাদের একজনও উত্তর দেবে! একজন এমন রুগি বাড়িতে রয়েছে—বোস এখানে একটু–
তারা ওর মায়ের মতো ছিপছিপে গড়নের সুন্দরী বালিকা। নতুন বিয়ের কনে, পাশেই শ্বশুরবাড়ি। নবীন যুগীর ছেলে অভিলাষ তার স্বামী। এইমাত্র শ্বশুরবাড়ি থেকেই আসছে। আসবার কারণ অন্য কিছু নয়, অভিলাষ এখুনি গরম মুড়কি মেখেচে, বালিকা স্ত্রীকে আদর করে বলেছে, তোদের বাড়ি থেকে ধামি নিয়ে আয়, মুড়কি খেতে দেব। এইজন্যেই তার আগমন। রোগগ্রস্ত জ্যাঠাইমা বুড়ির বকুনি শোনবার জন্যে সে এখন এখানে বসতে আসেনি। সুতরাং সে বিব্রত মুখে বললে–ও জ্যাঠাইমা, আমি এখন বসতে পারব না, তোমার জামাই মুড়কি মেখেচে, নিয়ে বেলেডাঙায় ফিরি করতে বেরুবে—
