নিস্তারিণী সুন্দর রাঙা পা দু-খানি ছড়িয়ে আলতা পরতে বসেছিল, একগাল হেসে বললে—এ আলতা দিদিমা। এরে বলে তরল আলতা।
—ওমা, পাতা আলতাই তো দেখে এসেচি চিরকাল। শিশিনিতে আলতা থাকে, কখনো শুনিনি। কালে কালে কতই দ্যাখলাম। কিন্তু বড়ো চমৎকার মানিয়েছে তোমার পায়ে বউ—এমনি টুকটুকে রং, যেন জগদ্ধাত্রী পিরতিমের মতো দেখাচ্চে–
এসব ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার কথা।
শীতের সকালবেলা। ওদের বড়ো ঘরের দাওয়ায় হেঁড়া মাদুরে হেঁড়া কাঁথা গায়ে নিস্তারিণী শুয়ে আছে। সংসারের সাবেক অবস্থা আর নেই, হরি যুগী বহুদিন মারা গিয়েছে—হরি যুগীর একমাত্র ছেলে সাধনও আজ তিন-চার বছর একদিনের জ্বরে হঠাৎ মারা গিয়েছে। সুতরাং নিস্তারিণী এখন স্বামীপুত্রহীনা বিধবা। তার শাশুড়ি এখনও বেঁচে আছে, আর আছে এক বিধবা জা, জায়ের এক মেয়ে, এক ছেলে।
পঁয়ত্রিশ বছর আগের সে উচ্ছলযৌবনা সুন্দরী গ্রাম্য বধূটিকে আজ আর রোগগ্রস্তা, শীর্ণকায়া, মলিনবসনা প্রৌঢ়ার মধ্যে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। হরি যুগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের সে গোয়ালভরা গোরু ও গোলাভরা ধান অন্তর্হিত হয়েছে —ঘরের চালে খড় নেই, তিন-চার জায়গায় খুঁচি দেওয়া খসে-পড়া চালে বর্ষার জল আটকায় না। গত বর্ষায় চালের ওপর উচ্ছেলতা গজিয়ে একদিকে ঢেকে রেখেচে, মাটির দাওয়ার খানিকটা ভেঙে পড়েছে, পয়সার অভাবে সারানো হয়নি। কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে। সংসারের কর্তা, যার আয়ে সংসারের শ্রী, সে চলে যাওয়ায় নিস্তরিণীর আদর এ বাড়িতে আর নেই। আগে ছিল সে-ই সংসারের কী, এখন তাকে পরের হাত-তোলা খেয়ে থাকতে হয়—তার ছেলে সাধন বাপের মনিহারি দোকান আর কলাবাগান কোনোরকমে বজায় রেখেছিল।
তিন বছর আগের এক ভাদ্র মাসে খুব বৃষ্টির পরে সাধন নদীর ধারে কলাবাগানে কাজ করতে গিয়ে সেখানে মারা যায়। কেন মারা যায় তার কারণ কিছু জানা যায়নি। সন্ধ্যা পর্যন্ত সাধন ফিরল না দেখে তার ঠাকুরমা নাতিকে খুঁজতে বার হচ্ছে, এমন সময় বেলেডাঙার দুজন মুসলমান পথিক এসে খবর দিলে— সাধন মুখ খুঁজড়ে কলাবাগানের ধারের পথে কাদার ওপরে পড়ে আছে—দেহে বোধ হয় প্রাণ নেই।
সকলে ছুটতে ছুটতে গেল। গ্রামের লোক ভেঙে পড়ল। সকলে গিয়ে দেখলে সাধন সত্যিই উপুড় হয়ে কাদার ওপর পড়ে, সর্বাঙ্গে কাদা মাখা, তার ওপর দিয়ে এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গিয়েছে। যেখানে শুয়ে আছে সেখানটা রক্ত পড়ে অনেকখানি জায়গা রাঙা, খানিকটা বৃষ্টির জলে ধুয়েও গিয়েছে। রক্তটা পড়েছে সাধনের মুখ থেকে।
গরিবের ঘরের ব্যাপার, দু-দিনেই মিটে গেল। সংসারের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ল; ক্রমে বাড়িতে উপার্জনক্ষম পুরুষমানুষের মধ্যে বাকি কেবল হরি যুগীর ভাই যুগলের ছেলে বলাই। যুগলও বহুদিন পরলোকগত দাদার মৃত্যুর পর বৎসরেই সে বিধবা স্ত্রী ও দু-বছরের শিশুপুত্রকে রেখে মারা যায়। বলাই এখন ষোলো বছরের, বেশ কর্মঠ, স্বাস্থ্যবান বালক।
নিস্তারিণীকে এখন আদর করে ‘নিস্তার’ বা ‘বড়োবউ’ বলে কেউ ডাকে না—যে ডাকত সে নেই। এখন তার নাম ‘সাধনের মা’। কেউ ডাকে পিন্টুর ঠাকুমা। পিন্টু সাধনের শিশুপুত্র—এখন তার তিন বছর বয়েস। সাধনের বিধবা বউ-এর বয়স এই সবে সতেরো।
নিস্তারিণী ডাক দিল ও পিন্টু, পিন্টু—
পিন্টু উঠানের আমতলায় খেলা করছিল, কাছে এসে বললে—কী ঠাকুমা?
—তোর মাকে একবার ডেকে দে—
পিন্টুর ডাকে তার মা এসে দাওয়ার ধারে দাঁড়িয়ে বললে—কী হয়েছে, ডাকচ কেন?
—আমি আজ দুটো ভাত খাব, বল তোর ঠাকুরমাকে—
পুত্রবধূ ঝংকার দিয়ে বললে—ভাত বললিই অমনি ভাত! খাবা কোথা থেকে? সে আমি বলতে পারব না ঠাকুরমাকে।
—তবে একগাল খই কী চিড়েভাজা যা হয় দে এখন—খিদেয় মলাম—
—হ্যাঁ, আমি তোমার জন্যি বামুনপাড়ায় বেরুই লোকের দোরদোর। অসুখ হয়েচে চুপ করে শুয়ে থাকো বাপু।
ওরা ওইরকম। সাধনের বউ মুখঝংকার দেয়, তাকে একেবারেই মানে না। সেকালের আর একালের মেয়েতে কী তফাত, তাই সে ভাবে এক-এক সময়ে। তারও একদিন সতেরো বছর বয়স ছিল, কখনো শাশুড়ির একটা কথার অবাধ্য হতে সাহস হত তার? আশ্চর্যি!
একটু পরে নিস্তারিণীর শাশুড়ি এসে দূরে দাঁড়িয়ে বললে—বলি হ্যাঁ বউ, তোমার আক্কেলখানা কী? আজ নাকি ভাত খেতে চেয়েচ? জ্বর রয়েচে চব্বিশ পহরের জন্যি, ভাত খেলেই হল অমনি?…বলি সোয়ামি খেয়েচ পুঙুর খেয়েচ, দেওর খেয়েচ—এখনো খাওয়ার সাধ মেটেনি তোমার?
নিস্তারিণী বড়ো দুর্বল হয়ে পড়েছে অসুখে—তবু সে বললে, সোয়ামি পুত্তুর তো তুমিও খেয়েছিলে, তবুও তিন পাথর করে ভাত মারো তো তিনটি বেলা! লজ্জা করে না বলতি!
নিস্তারিণীর শাশুড়ি একথার উত্তরে চীৎকার করে গালাগালি দিয়ে এক কাণ্ডই বাধালে। সাধনের বউকে ডেকে বলে দিলে—ওকে কিছু খেতে দিবিনে আজ বলে দিচ্চি। এ সংসারে যে খাটবে সে খাবে। আমরা সবাই মায়ে-ঝিয়ে খাটি, ও শুধু শুয়ে থাকে। রোগ নিয়ে শুয়ে থাকলি এ সংসারে চলে না। তার ওপর আবার যে সে রোগ নয় ওকে বলে পাণ্ডুর রোগ। মুখ হলদে, চোখ হলদে, হাত-পা ফুলেচে, ও কী সহজ রোগ! ও আর উঠবেও না, খাটবেও না, কেবল শুয়ে শুয়ে পাথর পাথর খাবে!
নিস্তারিণী বললে—খাব—খাব, বেশ করব। আমার খোকা কলাবাগান সামলে রাখত, তারই আয়ে বাড়িসুদ্ধ খাওনি? সেই কলাবাগান তদবির করতে গিয়েই বাছা আমার চলে গেল। তোমরা ওদের বাপ-ছেলের রক্ত-জল-করা কলাবাগান, মনিহারি ব্যাবসা ঘোচালে, এখন আমায় বসিয়ে খেতে দেবে না তো কী করবে? নিশ্চয়ই দিতে হবে।
