কুণ্ঠিতা সংকুচিতা বধূ ছিল না নিস্তারিণী। সে ছিল যুগীপাড়ার বউ—তাকে একা ঘাট থেকে জল আনতে হয়, ধান ভানতে হয়, ক্ষার কাচতে হয়—সংসারের কাজকর্মে সে অনলস, অক্লান্ত। যেমনি পরিশ্রম করতে পারে, তেমনি মুখরা, আর তেমনি সাহসিকাও বটে। স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের গৌরবে তখন তার নবীন বয়সের নবীন চোখ দুটি জগৎকে অন্য দৃষ্টিতে দেখে।
সে উঠে দাঁড়াল, রতিকান্তের সঙ্গে কিন্তু কোনো কথা বললে না। বুঝতে পারলে গোঁসাইপাড়ার বাবুদের ছেলে তার সাহায্যকারী। বাড়ি গিয়ে দু-তিন দিন পরে সে স্বামীকে দিয়ে একছড়া সুপক্ক চাঁপাকলা ও নিজের হাতের তৈরি বাঁশশলা ধানের খইয়ের মুড়কি পাঠিয়ে দিলে গোঁসাইপাড়া। বললে—আমার ছেলেকে দিয়ে এসো গে—
নিস্তারিণী সেই থেকে সেই একদিনের দেখা সুদর্শন যুবকটিকে কত কী উপহার পাঠিয়ে দিত। রতিকান্তের সঙ্গে আর কিন্তু কোনোদিন তার সাক্ষাৎ হয়নি, গোঁসাইবাড়ির ছেলে যুগী-বাড়িতে কোনো প্রয়োজনে কোনোদিন আসেনি।
রতিকান্ত কলকাতাতেই মারা গিয়েছিল অনেকদিন পরে। নিস্তারিণীর দু-তিন দিন ধরে চোখের জল থামেনি, এ সংবাদ যখন সে প্রথম শুনলে।
গ্রামের অবস্থা তখন ছিল অন্যরকম। সকলের বাড়িতে গোলাভরা ধান, গোয়ালে দু-তিনটি গোরু থাকত। সবজিনিস ছিল সস্তা। নিস্তারিণীদের বাড়ির পশ্চিম উঠানে ছোটো একটা ধানের গোলা। কোনো কিছুর অভাব ছিল না ঘরে। বরং ব্রাহ্মণপাড়ার অনেককে সে সাহায্য করেছে।
একবার বড্ড বর্ষার দিনে সে বাড়ির পিছনের আমতলায় ওল তুলচে—এমন সময় বাঁড় য্যেবাড়ির মেয়ে ক্ষান্তমণি এসে বললে—ও যুগী-বউ!
নিস্তারিণী অবাক হয়ে মুখ তুলে চাইলে। বাঁড় য্যেবাড়ির মেয়েরা কখনো তাদের বাড়ির বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলে না। সে বললে—কী দিদিমণি?
—একটা কথা বলব?
—কী, বলো দিদিমণি—
—আমাদের আজ একদম চাল নেই ঘরে। বাদলায় শুকুচ্চে না, কাল ধান ভেজে দুটো চিড়ে হয়েছিল। তোমাদের ঘরে চাল আছে, কাঠাখানেক দেবে?
নিস্তারিণী এদিক-ওদিক চেয়ে দেখলে, তার খাণ্ডার শাশুড়ি কোনোদিকে আছে কিনা। পরে বললে—দাঁড়াও দিদিমণি—দেবানি, চাল ঘরে আছে। শাশুড়িকে লুকিয়ে দিতি হবে— দেখতি পেলে বড্ড বকবে আমারে। তা বকুক গে, তা বলে বামুনের মেয়েকে বাড়ি থেকে ফিরিয়ে দেব?
আর একবার বাঁড়য্যেবাড়ির বউ তার বৃদ্ধা শাশুড়িকে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল; সে বউ ছিল গ্রামের মধ্যে নামডাকওয়ালা খাণ্ডার বউ শাশুড়ির সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া বাধাত, কেরোসিনের টেমি ধরিয়ে শাশুড়ির মুখ পুড়িয়ে দিয়েছিল। পাড়ার কেউ ভয়ে বৃদ্ধাকে স্থান দিতে পারেনি, যে আশ্রয় দেবে তাকেই বড়ো বউ-এর গালাগালি খেতে হবে। যুগী-বউ দেখলে বাঁড়য্যেবাড়ির বেড়ার কাছে বড়ো সেগুনতলার ছায়ায় ন-ঠাকরুন চুপ করে দাঁড়িয়ে হাপুসনয়নে কাঁদছেন। ওগিয়ে বললেন-ঠাকরুন, আসুন আমাদের বাড়ির দাওয়াতে বসবেন–বড়ো বউ বকেছে বুঝি?
ন-ঠাকরুন শুচিবেয়ে মানুষ, তা ছাড়া বাঁড় য্যেবাড়ির গিন্নি হয়ে যুগী-বাড়ি আশ্রয় নিলে মান থাকে না। সুতরাং প্রথমে তিনি বললেন—না বউ, তুমি যাও, আমার কপালে এ যখন চিরদিনের, তখন তুমি একদিন বাড়িতে ঠাঁই দিয়ে আমার কী করবে! নগের বউ যেদিন চটকতলায় চিতেয় শোবে, সেদিনটি ছাড়া আমার শান্তি হবে না মা। ওই ‘কালনাগিনী’ যেদিন আমার নগের ঘাড়ে চেপেচে–
নিস্তারিণী ভয়ে ভয়ে বললে—চুপ করুন ন-গিন্নি, বউ শুনতি পেলি আমার ইস্তক রক্ষে রাখবে না। আসুন আপনি আমার বাড়িতে, এইখানে দাঁড়িয়ে কষ্ট পাবেন কেন মিথ্যে—
ন-গিন্নিকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে সে নিজের হাতে তাঁর পা ধুয়ে দিয়ে সিঁড়ি পেতে দাওয়ায় বসালে। কিছু খেতে দেওয়ার খুব ইচ্ছে থাকলেও সে বুঝলে, বড়ো ঘরের গিন্নি ন-ঠাকরুন এ বাড়িতে কোনো কিছু খাবে না, খেতে বলাও ঠিক হবে না, সে ভাগ্য সে করেনি।
অনেক রাত্রে গিন্নির বড়ো ছেলে নগেন খুঁজতে খুঁজতে এসে যখন মায়ের হাত ধরে নিয়ে গেল, তখন নিস্তারিণী অনেক অনুনয়-বিনয় করে বড়ো একছড়া মর্তমান কলা তাঁকে দিয়ে বল্লে—নিয়ে যান দয়া করে। আর তো কিছুই নেই, কলাবাগান আছে, কলা ছাড়া মানুষকে হাতে করে আর কিছু দিতে পারিনে—
তার স্বামী সে-বার রামসাগরের চড়কের মেলায় মনিহারি জিনিস বিক্রি করতে গেল। যাবার সময় নিস্তারিণী বললে—ওগো, আমার জন্যি কী আনবা?
—কী নেবা বলো? ফুলন শাড়ি আনব?
-না, শোনো, ওসব না। একরকম আলতা উঠেচে আজ মজুমদার-বাড়ি দেখে এলাম। কলকেতা থেকে এনেচে মজুমদারমশায়ের ছেলে—শিশিনিতে থাকে। কী একটা নাম বললে, ভুলে গিইচি।
—শিশিনিতে থাকে?
—হ্যাঁ গো। সে বড়ো মজা, কাটির আগায় তুলে দেওয়া, তাতে করে মাখাতে হয়। ভালো কথা, তরল আলতা—তরল আলতা—
—কত দাম?
—দশ পয়সা। হ্যাঁগা, আনবে এক শিশিনি আমার জন্যি?
—দ্যাখব এখন। গোটা পাঁচেক টাকা যদি খেয়েদেয়ে মুনাফা রাখতি পারি, তবে এক শিশিনি ওই যে কী আলতা—তোর জন্যি ঠিক এনে দেব।
এইভাবে গ্রামের ব্রাহ্মণপাড়ার সাথে টেক্কা দিয়ে নিস্তারিণী প্রসাধনদ্রব্য ক্রয় করেছে। তাদের পাড়ার মধ্যে সে-ই তরল আলতা পায়ে দেয়। শূদ্রপাড়ার মধ্যে ও জিনিস একেবারে নতুন—কখনো কেউ দেখেনি। আলতা পরবার সময়ে যে দেখত সে-ই অবাক হয়ে থাকত। হাজরি বুড়ি মাছ বেচতে এসেচে একদিন—সে অবাক হয়ে বললে—হ্যাঁ বড়োবউ, ও শিশিনিতে কী? কী মাখাচ্চ পায়ে?
