একবার যখন কলিকাতায় থাকিতাম, ভবানীপুর দিয়া আসিতেছি, দেখি একটা বড়ো বাড়ি হইতে দলে দলে মেয়েরা বই হাতে করিয়া বাহির হইতেছে। নানা বয়সের মেয়ে আছে তার মধ্যে।
ভাবিলাম—এ কী, এত মেয়ে আসে কোথা হইতে? ব্যাপার কী একবার দেখিতে হইতেছে তো।
তারপর জানিলাম—সেটা একটা মেয়েদের কলেজ।
কী চমৎকার সব মেয়ে ছিল তার মধ্যে! কেমন সব পরনে, কেমন চশমা, কী রূপ! আর একবার দেবেন্দ্র ঘোষ স্ট্রিট দিয়া যাইতেছিলাম, একটি বড়োলোকের বাড়ির দোতলায় কোনো এক মেয়ে গান গাহিতেছিল, দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া শুনিলাম। অমন সুন্দর গান তারপর আর কখনো শুনি নাই। কোথায়ই বা শুনিব? গানের কয়েকটি লাইন এখনও মনে আছে।
প্রিয় তুমি আস নাই আজ ভোরে
মধুমালতীর নয়নে শিশির দোলে।
সে-সব গান আমাদের মতো মাটির মানুষের জন্য নয়।
সারাদিন ঝমঝম বৃষ্টির পরে সন্ধ্যার সময়টা একটু বাদল থামিয়াছে। গাছপালার অন্ধকারের সঙ্গে আকাশের অন্ধকার মিলিয়া হাটতলা যেমন নির্জন, তেমনি অন্ধকার। ডোবার জলে মনের আনন্দে ব্যাঙ ডাকিতেছে, প্রমো যেখানে ঘেঁটকোলের ডগা তুলিয়া বেড়াইত, সেইসব বনে ঝিঝি পোকার দল একঘেয়ে ডাক জুড়িয়া দিয়াছে। জামগাছের উঁচু ডালটা হইতে দমকা হাওয়ায় ঝড়াঝড়া করিয়া পাকা জাম বনের মধ্যে অন্ধকার জলেভেজা শ্যাওড়াবনের মাথায় পড়িতেছে।
নির্জন সন্ধ্যায় একা বসিয়া ভাবি…
মুক্তি
ওর ভালো নাম বোধ হয় ছিল নিস্তারিণী। ওর যৌবন বয়সে গ্রামের মধ্যে অমন সুন্দরী বউ ব্রাহ্মণপাড়ার মধ্যেও ছিল না। ওরা জাতে যুগী, হরিনাথ ছিল স্বামীর নাম। ভদ্রলোকের পাড়ায় ডাকনাম ছিল ‘হরে যুগী’।
নিস্তারিণীর স্বামী হরি যুগীর গ্রামের উত্তর মাঠে কলাবাগান ছিল বড়ো। কাঁচকলা ও পাকাকলা হাটে বিক্রি করে কিছু জমিয়ে নিয়ে ছোটো একটা মনিহারি জিনিসের ব্যাবসা করে। রেশমি চুড়ি ছ-গাছা এক পয়সা, দু-হাত কার এক পয়সা—ইত্যাদি। প্রসঙ্গক্রমে মনে হল, ‘কার’ মানে ফিতে বটে, কিন্তু ‘কার’ কী ভাষা? ইংরেজিতে এমন কোনো শব্দ নেই, হিন্দি বা উর্দুতে নেই, অথচ ‘কার’ কথাটা ইংরেজি শব্দ বলে আমরা সকলেই ধরে নিয়ে থাকি! যাক সে। হরি যুগীর বাড়িতে দু-খানা বড়ো বড়ো মেটে ঘর, একখানা রান্নাঘর, মাটির পাঁচিল-ঘেরা বাড়ি। অনেক পুষ্যি বাড়িতে, দু-বেলা পনেরো-ষোলোখানা পাত পড়ে। হরি যুগীর মা, হরি যুগীর দুটি ছোটো ভাই, এক বিধবা ভাগনি, তার দুই ছেলে-মেয়ে। সংসার ভালোই চলে, মোটা ভাত, কলাইয়ের ডাল ও ঝিঙে ও লাল ডাঁটাচচ্চড়ির কোনোদিন অভাব হয়নি, গোরুর দুধও ছিল চার-পাঁচ সের। অবিশ্যি দুধের অর্ধেকটা ব্রাহ্মণপাড়ায় জোগান দিয়ে তার বদলে টাকা আসত।
গ্রামের মধ্যে সুন্দরী বউ-ঝির কথা উঠলে সকলেই বলত—’হরে যুগীর বউয়ের মতো প্রায় দেখতে’। গ্রামের নারী-সৌন্দর্যের মাপকাঠি ছিল নিস্তারিণী। গেরস্তঘরের বউ, স্নান করে ভিজে কাপড়ে ঘড়া কাঁকে নিয়ে যখন সে গাঙের ঘাট থেকে ফিরত, তখন তার উদ্দাম যৌবনের সৌন্দর্য অনেক প্রবীণের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিত।
এ গ্রামে একটা প্রবাদ আছে অনেকদিনের।
তুলসী দারোগা নদীর ঘাটের পথ ধরে নীলকুঠির ওদিকে থেকে ঘোড়া করে ফিরবার সময়ে উঁতবটের ছায়ায় প্রস্ফুট উঁত ফুলের মাদকতাময় সুবাসের মধ্যে এই সিক্তবসনা গৌরাঙ্গী বধূকে ঘড়া কাঁকে যেতে দেখল। বসন্তের শেষ, ঈষৎ গরম পড়েছে—নতুবা উঁত ফুলের সুবাস ছড়াবে কেন?
তুলসী দারোগা ছিল অত্যন্ত দুর্ধর্ষ জাঁহাবাজ দারোগা—’হয়’কে ‘নয়’ করবার অমন ওস্তাদ আর ছিল না। চরিত্র হিসেবেও নিষ্কলঙ্ক ছিল, এমন মনে করবার কোনো কারণ নেই। তুলসী দারোগার নামে এ অঞ্চলে বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খেত। তার সুনজরে একবার যিনি পড়বেন, তাঁর হঠাৎ উদ্ধারের উপায় ছিল না এ হেন তুলসী দারোগা হঠাৎ উন্মনা হয়ে পড়ল সুন্দরী গ্রাম্যবধূকে নির্জন নদীতীরের পথে দেখে। বধূটিকে সন্ধান করবার লোকও লাগালে। হরি যুগীকে দু তিনবার থানায় যেতে হল দারোগার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। কিন্তু নিস্তারিণী ছিল অন্য চরিত্রের মেয়ে, শোনা যায় তুলসী দারোগার পাঠানো বৃন্দাবনী শাড়ি সে পা দিয়ে ছুড়ে ফেলে বলেছিল, তাদের কলাবাগানের কল্যাণে অমন শাড়ি সে অনেক পরতে পারবে; জাতমান খুইয়ে বৃন্দাবনী কেন, বেনারসি পরবার শখও তার নেই।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে তুলসী দারোগা এখান থেকে বদলি হয়ে চলে যায়।
আর একজন লোক কিন্তু কথঞ্চিৎ সাফল্যলাভ করেছিল অন্যভাবে। গ্রামের প্রান্তে গোসাঁইপাড়া, গ্রামের মধ্যে তারা খুব অবস্থাপন্ন গৃহস্থ—প্রায় জমিদার। বড়ো গোসাঁইয়ের ছেলে রতিকান্ত নদীর ধারে বন্দুক নিয়ে শিকার করতে গিয়েছিল সন্ধ্যার প্রাক্কালে—শীতকাল। হঠাৎ সে দেখলে কাদের একটি বউ ঘড়াসুদ্ধ পা পিছলে পড়ে গেল—খুব সম্ভব তাকে দেখে। রতিকান্ত কলকাতায় থাকত, দেশের ঝি-বউ সে চেনে না। সে ছুটে গিয়ে ঘড়াটা আগে হাঁটুর ওপর থেকে সরিয়ে নিলে, কিন্তু অপরিচিতা বধূর অঙ্গ স্পর্শ করলে না। একটু পরেই সে দেখলে বধূটি মাটি থেকে উঠতে পারছে না, বোধহয় হাঁটু মচকে গিয়ে থাকবে। নির্জন বনপথ, কেউ কোনোদিকে নেই, সে একটু বিব্রত হয় পড়ল। কাছে দাঁড়িয়ে বললে—মা, উঠতে পারবে না হাত ধরে তুলব?
তারপর সে অপরিচিতার অনুমতির অপেক্ষা না-করেই তার কোমল হাতখানি ধরে বললে—ওঠো মা আমার ওপর ভর দিয়ে, কোনো লজ্জা নেই—উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করো তো—
