যাইবার সময় আমার রান্নাঘরের দিকে চাহিয়া বলিল—এখানে কে থাকে?
—আমিই থাকি।
—সে-কথা নয়, আপনার সঙ্গে থাকে কে? বেঁধেবেড়ে দেয় কে?
—কেউ না, নিজেই।
সেই হইতে মেয়েটি আমায় কেমন একটু কৃপার চক্ষে দেখিল বোধ হয়। যখনই সে হাটতলায় ঘেঁটকোলের ডগা সংগ্রহ করিতে আসিত—আমায় এক আঁটি দিয়া যাইত।
সকালের দিকেও আসিত, আবার বৈকালেও আসিত। একদিন বৈকালে আপনমনে বসিয়া আছি, মেয়েটি আসিয়া দাওয়ার ধারে কোঁচড় হইতে কিছু ডুমুর বাহির করিয়া রাখিয়া বলিল—এ বেলা হরে কলুদের পুকুরপাড় থেকে ডুমুর পেড়েছিলাম, তাই আপনাকে দুটো দিয়ে যাচ্ছি।
মেয়েটি কে তা আমি কখনো জিজ্ঞাসা করি নাই। মেয়েটি দেখিতে ভালো, বেশ বড়ো বড়ো চোখ, বয়েস আঠারো-উনিশ হইবে। গায়ের রং যতটা ফর্সা, এসব পাড়াগাঁয়ে তত সুন্দর গায়ের রং প্রায়ই দেখা যায় না। তবে ব্রাহ্মণ-কায়স্থের ঘরের মেয়ে নয়—দেখিলেই বোঝা যায়। সেদিন তাহার পরিচয় লইয়া জানিলাম সে সেই গ্রামেরই বিধু গোয়ালিনির মেয়ে, তার ভালো নাম সম্ভবত প্রেমলতা বা ওইরকম কিছু, সবাই ‘প্রমো’ বলিয়া ডাকে। অল্প বয়সে বিধবা হইয়াছে, যেমন সাধারণত
আমাদের দেশে গোয়ালার ঘরে হয়।
মেয়েটি কিছুক্ষণ চালের বাতা ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। বলিল—আপনার বিয়ে
হয়নি?
—কেন হবে না?
—তবে বউকে নিয়ে আসেন না কেন? এখানে তো আপনার রান্নাবান্নার খুব কষ্ট!
—হাঁ, তা বটে। এইবার আনব ভাবছি।
—মা বাবা আছেন?
—নাঃ!
—কোথায় আপনার বাড়ি?
—সে তুমি চিনতে পারবে না, সে অনেক দূর।
এইভাবে আলাপের সূত্রপাত। তারপর কতদিন সকালে বিকালে প্রমো আসিত, কোনো দিন ওলের ডাঁটা, কোনো দিন ডুমুর, কোনো দিন-বা একটা চালতা, নিজে যা বনেজঙ্গলে সংগ্রহ করিত, তার কিছু ভাগ আমায় না-দিয়া তার যেন তৃপ্তি হইত। মাঝে মাঝে ওইখানটায় দাঁড়াইয়া চালের বাতা ধরিয়া কত গল্প করিত। সরলা বালিকা কাঠ কুড়াইয়া, শাকপাতা সংগ্রহ করিয়া তার দরিদ্র মায়ের গৃহস্থালীর অভাব দূর করিতে চেষ্টা করিত, তেমনই এই দরিদ্র ডাক্তারের প্রতি গভীর অনুকম্পাবশত তার ভাতের থালার উপকরণও জুটাইয়া দিত। বড়ো ভালো লাগিত তাকে। একটা অদৃশ্য সহানুভূতির সূত্রে সে আমাকে বাঁধিয়াছিল এবং বোধ হয় আমিও তাকে বাঁধিয়াছিলাম। পলাশপুরের হাটতলায় নিঃসঙ্গ জীবনে একটি মমতাময়ী নারীর সঙ্গ বোধ হয় খুব ভালোই লাগিয়াছিল। তাই সে আসিলে মনটা খুশি হইয়া উঠিত। ইদানিং সে আসিতও ঘন ঘন, নানা ছলছুতায়, কারণে অকারণে। আসিয়া খেইহারা কথাবার্তায় থাকিয়া যাইতও অনেকক্ষণ।
একদিন লক্ষ করিলাম, প্রমো তার বেশভূষার দিকে নজর দিয়াছে। প্রথম সেদিন তার যত্ন করিয়া বাঁধা খোঁপাটির দিকে চাহিয়া আমার এ কথা মনে হইল। ফর্সা শাড়িখানা পরিপাটি করিয়া পরিতে শিখিয়াছে। মুখের হাসির মধ্যে একদিন সলজ্জ সংকোচের ভাব দেখিলাম, যে ধরনের হাসি তার মুখে নতুন। আর কতভাবেই সেবা করিতে সে চেষ্টা করিত—শাক তুলিয়া, তরকারি কুটিয়া দিয়া। আগে আগে আসিয়া চালের বাতা ধরিয়া দাঁড়াইয়া থাকিত, ইদানীং দাওয়ার কোণে ওইখানটায় বসিত। তার মুখের ভাব দিন দিন যেন আরও সুশ্রী হইয়া উঠিতেছিল।
পলাশপুরে তো কত লোক আছে, হাটতলায় তো কত লোক যাতায়াত করে, এই দরিদ্র ডাক্তারের নিঃসঙ্গ জীবনের প্রতি কেহই তো অমন দরদ দেখায় নাই
—তাই বলি পুরুষমানুষের মেয়েমানুষের মতো বন্ধু কোথায়!
গত ফাল্গুন মাসে উপরি উপরি কয়েকদিন সে আসিল না। মনটা উদবিগ্ন হইয়া উঠিল। এমন তো কখনো হয় না। দু-তিন দিন পরে কানে গেল বিধু গোয়ালিনির মেয়ের টাইফয়েড হইয়াছে। কেহ ডাকিতে না-আসিলেও দেখিতে গেলাম। দেখিয়া শুনিয়া বুঝিলাম, এ বয়সে টাইফয়েড, শিবের অসাধ্য রোগ। প্রাণপণে চিকিৎসা করিতে লাগিলাম—উহারা সাতদিন পরে আমার উপরে আস্থা হারাইয়া ডাকিল ইন্দু ডাক্তারকে। আমাকে রোগশয্যার পাশে দেখিয়া প্রমোর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল প্রথম দিন। শুনিলাম ইন্দু ডাক্তার যেদিন দেখিতে আসিয়াছিল, সেদিন সে ইন্দু ডাক্তারের ঔষধ খাইতে চায় নাই। মরণের ছয়-সাত দিন পূর্ব হইতে সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল।
আজ কয়েক মাস হইল আমি আবার যে একা সেই একা। কে আর আমার জন্য শাক, ডুমুর, ঘেঁটকোলের ডগা তুলিয়া দিবে? এখন আবার সেই আম-ভাতে ভাত!
বর্ষা নামিয়া গিয়াছে। রাস্তাঘাটে বেজায় কাদা, মশার উৎপাত বাড়িয়াছে। হাটতলার চারিপাশের বাগানের বড়ো বড়ো গাছের মাথায় সারাদিন ধরিয়া মেঘ জমিতেছে, ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়িয়া আকাশ একটুখানি ফরসা হইতেছে…আবার মেঘ উড়িয়া আসিতেছে, আবার বৃষ্টি। জলে ভিজিয়া গাছের গুড়িগুলির রং আবলুসের মতো কালো দেখাইতেছে।
চুপ করিয়া বসিয়া থাকি। মনে হয় কারাগারে আবদ্ধ হইয়া আছি। যখন নিতান্ত অসহ্য হয়, মুজিবরের দোকানে গিয়া বসি। নীচু চালাঘরের দোকান, রেড়ির তেল, কেরোসিন তেল, জিরেমরিচ, খড়িমাটি, কড়া তামাক, আলকাতরা, পচা সর্ষের তেল—সবে মিলিয়া কেমন একটা গন্ধ ঘরটায়। গন্ধটায় মন হু-হু করে, মনে হয় এ কোথায় পাড়াগাঁয়ে পড়িয়া আছি! কবে বেড়াজালের নাগপাশ হইতে মুক্তি পাইব, আদৌ মুক্তি পাইব কিনা তাই বা কে জানে? জীবনটা যেন কেমনধারা হইয়া গেল। তবুও যদি—এত কষ্টেও এই একঘেয়ে অজ পাড়াগাঁয়েও, আমার মনে হয়, সব কষ্ট সহ্য করিতে পারিতাম, যদি সুবাসিনী ও খোকা কাছে থাকিত।
