গেল মিটিয়া। আশ্বিন মাস পর্যন্ত খাই কী যে পানখোলা ইউ. পি. পাঠশালার দ্বিতীয় পণ্ডিতের পদের জন্য বসিয়া থাকিব! বেতন শুনিলাম পাঁচ টাকা। হেডপণ্ডিত পান নয় টাকা।
সারাদিন হাঁটিয়া আবার ফিরিলাম পলাশপুরে। সন্ধ্যা হইয়া গেল ফিরিতে। শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত, পা টনটন করিতেছে। মুজিবর জিজ্ঞসা করিল—কী হল ডাক্তারবাবু? তাহাকে সব বলিলাম, তারপর নিজের অন্ধকার খড়ের ঘরে ঢুকিয়া ভাঙা লণ্ঠনটা জ্বালিলাম। নদীর ঘাট হইতে হাত-মুখ ধুইয়া আসিয়া মাদুরটা বিছাইয়া শুইয়া পড়িলাম। ক্ষুধা খুবই পাইয়াছিল, কিন্তু উঠিয়া রাঁধিবার উৎসাহ মোটেই ছিল না। গোটাকতক আম খাইয়া রাত্রি কাটিল।
অন্ধকারে শুইয়া শুইয়া কত কথা ভাবি। একা একা কাটাইতে হয়, কথা বলিবার মানুষ পাই না, এই হইয়াছে সকলের চেয়ে কষ্ট। ইচ্ছা হয় স্ত্রীকে আনিয়া কাছে রাখিতে। কত কাল তাহাকে দেখি নাই, তাহার একটু সেবা পাইতে সাধ হয়। এই সারাদিন খাটিয়া-খুটিয়া আসিলাম, ইচ্ছা হয় কাছে বসিয়া একটু গল্প করুক, দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও সুখে থাকিব। কিন্তু আনি কোথা হইতে? খাওয়াই কী?
হাটতলায় কী ভীষণ অন্ধকার। মাত্র দু-খানি দোকান, তাও দোকানিরা বন্ধ করিয়া চলিয়া গিয়াছে। চারিদিকে বড়ো বড়ো গাছপালার অন্ধকারে জোনাকি জ্বলিতেছে, বিলাতি আমড়া গাছটায় বাদুড়ে ডানা ঝটপট করিতেছে।
গভীর রাত্রি হইয়াছে, কিন্তু গরমে ঘুম আসে না চোখে। কি বিশ্রী গুমোট! সারারাত্রি ঢুবঢ়াব শব্দে পাকা আম পড়িতেছে চারিদিকের আমবাগানে, শুইয়া শুইয়া শুনিতেছি।
উঃ, কী একঘেয়েই হইয়া উঠিয়াছে এখানকার জীবন! সকালে উঠিয়া নদীর ধারে একটু বেড়াইয়া আসিয়া সেই হাটতলায় ফিরিয়া আসি, বেশিদূর কোথাও যাইতে পারি না, কী জানি রোগী আসিয়া যদি ফিরিয়া যায়! সারাদিন ডিসপেন্সারি আগলাইয়া থাকিতে হয় আশায় আশায়।
মুদি পোড়া আঁখি বসি রসালের তলে
ভ্রান্তিমদে মাতি ভাবি পাইব
পাদপদ্মে। কাঁপে হিয়া দুরু দুরু করি—
আর তা ছাড়া যাই বা কোথায়? চাষা গাঁ, কোনো ভদ্রলোকের বাড়ি নাই যে বসিয়া গল্পগুজব করি। ঘুরিয়া-ফিরিয়া সেই আমার ফুটা খড়ের ঘরের ডিসপেন্সারি আর মুজিবরের দোকান, দোকান আর ডিসপেন্সারি। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার দিকে পিপিলিপাড়ার বিলের ধারে বেড়াইতে গিয়া দেখি বাগদিরা কী করিয়া ডোঙায় উঠিয়া কোঁচ ছুড়িয়া কইমাছ মারিতেছে। অন্ধকার দেখিয়া দুটো হয়তো শাক তুলিয়াও আনি কোনো কোনো দিন। একঘেয়ে আম-ভাতে ভাত অখণ্ড প্রতাপে রাজ্য চালাইতেছে তো বৈশাখ মাস হইতেই—কতদিন আর ভালো লাগে?
আমার নামের কপাল নয়! কাল ওপাড়ার বিষ্ণু কলুর বড়ো ছেলেকে সন্ধ্যার পরে ঘানি-ঘরের দরজায় সাপে কামড়াইল, আমি শুনিয়াই ছুটিয়া গেলাম, আমায় কেহ ডাকিতে আসে নাই বটে, কিন্তু কানে শুনিয়া চুপ করিয়া থাকিতে পারি কী করিয়া? গিয়াই শক্ত করিয়া গোটাকতক বাঁধন দিলাম, দষ্টস্থান চিরিয়া পটাস পারম্যাঙ্গানেট টিপিয়া দিলাম—এমন সময় পাড়ার লোকে ওঝা ডাকিয়া আনিল। ওঝা আসিয়াই আমার বাঁধন খুলিয়া ফেলিতে হুকুম দিল। আমার নিষেধ কেহই গ্রাহ্য করিল না। বাঁধন খুলিয়া ঝাড়ফুঁক করিতে করিতে রোগী সারিয়া উঠিল। ঝাড়ফুক সব বাজে, আমার বাঁধনে আর পটাস পারম্যাঙ্গানেটে কাজ হইয়াছিল— নাম হইল সেই ওঝার। যাক, সেজন্য আমি দুঃখিত নই, একজনের জীবন বাঁচিয়া গেল, এই আমার যথেষ্ট পুরস্কার।
না-খাওয়ার কষ্টও সহ্য করিতে পারি, একঘেয়ে জীবনের কষ্টে একেবারে মারা যাইতে বসিয়াছি। তবুও বসিয়া বসিয়া দিবাস্বপ্নে কাটাইয়া মনের কষ্ট মন হইতে তাড়াই।
টাকাপয়সা হাতে হইলে কী করিব বসিয়া তাহাও ভাবি।
সুবাসিনীকে লইয়া আসিব, খোকাকে লইয়া আসিব। নদীর ধারে মুজিবর জমি দিতে চাহিয়াছে, সেখানে দু-খানা খড়ের ঘর তুলিব আপাতত। বাড়ির চারিধারে ছোটো একখানা ফুলবাগান করিব, সন্ধ্যাবেলা আধফুটন্ত বেলকুঁড়ি এই গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় রেকাবি করিয়া তুলিয়া আনিয়া কিছু ঘরে কিছু সুবাসিনীর খোঁপায় পরাইয়া দিব। এখানকার তহশিলদারকে বলিয়া কিছু ধানের জমি লইয়া চাষবাস করিব, ঘরে ধান হইলে সচ্ছলতা আপনিই দেখা দিবে।
ভাদ্র মাসে একদিন ডিসপেন্সারি ঘরে বসিয়া আছি, দেখি যে একটি মেয়ে হাটতলার বনের মধ্যে জামতলায় কী খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। আমায় দেখিয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিল।
বলিলাম—কী খুঁজছ ওখানে খুকি?
মেয়েটি লাজুক সুরে বলিল—ঘেঁটকোলের ডগা—
—কী হবে ঘেঁটকোলের ডগায়?
—ঘেঁটকোলের ডগা তো খায়—
কথাটা জানিতাম না। ঘেঁটকোলের ডগা যদি খাওয়া যায়, তবে তো আমার তরকারি কিনিবার সমস্যা ঘুচিয়া যায়। হাটতলার চারিদিকের বন-জঙ্গলেই দেখিতেছে বহু ঘেঁটকোল আছে। কিন্তু গাছটি চিনিতাম না, নাম শুনিয়া আসিয়াছি বটে।
বলিলাম—কই, কীরকম গাছ দেখি?
মেয়েটি বললি—এই দেখুন, কচুগাছের মতো দেখতে। কিন্তু একটা পাতা তিনটে ভাঁজ করা।
—কী করে খায়?
—যেমন ইচ্ছে, হেঁচকি করে খায়, চচ্চড়ি করেও খায়। খাবেন, দেব তুলে?
মেয়েটির কাছে একটু চাল দেখাইলাম। ডাক্তারবাবু হইয়া বুনো ঘেঁটকোলের ডগা কী করিয়া খাইব! তবে যদি নিতান্তই খাইতে হয়, সে এই অবজ্ঞাত বন্য উদ্ভিদের প্রতি নিতান্ত কৃপা করিয়াই খাইব,—এই ভাবটা দেখাইবার চেষ্টা করিলাম।
বলিলাম—ওসব কচু-ঘেঁচুর ডগা কে রাঁধবে? কী করে রাঁধতে হয়?
মেয়েটি শিখাইয়া দিল, ঘেঁটকোলের ডগার হেঁচকি রাঁধিবার প্রণালী, এক আঁটি ডগা তুলিয়া দিয়াও গেল।
