একটা ষাঁড়া ফল।
বউটি সারি থেকে উঠে চলে গেল পুরুতঠাকুরের কাছে, যেখানে পুজো হচ্ছে। সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল পাঁচুদাসীর এবং সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকও কেঁপে উঠল। কী জানি ভাগ্যে কী আছে!
আরও দুটি বউ সারি থেকে উঠে চলে গেল—একজনের ফুল আর একজনের ফল পড়েছে। ইতিমধ্যে আর একজন কেঁদে উঠলে ডুকরে। সবাই বললে—কি হল গো, কি হল?
—আমার আঁচলে চুল আর ঢিল পড়েছে গো! পোড়া কপাল গো!
সে কাঁদতে কাঁদতে উঠে চলে গেল সারি থেকে। বুড়ো হাজরা নিষ্ঠুর, দয়া করলেন না তার উপর। কী অপরাধ হল বাবার চরণে। পাঁচুদাসীর বুক কেঁপে ওঠে আবার। বুকের ভেতর যেন টেকির পাড় পড়ছে। একটা বউ ঢিপঢিপ করে মাথা কুটছে মাটিতে ওর সারিতে। ওর আঁচলেও তাহলে চুল আর ছাই পড়েছে।
–দয়া করো বাবা হাজরা, বুড়ো হাজরা দয়া করো!
বেলা ঘুরে গিয়েছে। আরও কতক্ষণ কাটল। হঠাৎ পাঁচুদাসীর বুকের স্পন্দন যেন বন্ধ হবার উপক্রম হল। টপ করে একটা কী পড়ল ওর আঁচলে! ফল? যাঁড়া ফল? চুল বা ছাই পড়বার শব্দ কী অমন? ঢিল?
…বাবা হাজরাঠাকুর!
সবাই মিলে ব্যাং নদীর খেয়া পার হচ্ছে। উদ্ধব দাস স্ত্রীকে বললে—তুই কী পেলি?
পাঁচুদাসী বললে-ফল, একটা ষাঁড়া ফল। হাজরাঠাকুরের দয়া গো
ওর মন ভালো না। ম-ন-জুলা ফিরে গিয়েছে আগের খেয়ায়। ও পেয়েছিল। জট-পাকানো চুলের নুড়ি। পুরুতঠাকুর আর একবার বসতে বলেছিলেন আঁচল পেতে। আবার সেই চুলই পড়েছে তার আঁচলে। পুরুতঠাকুর বলেছেন—মা, আমি কি করব, আমার ওতে হাত নেই। তোমার অদৃষ্টে সন্তান থাকলে ফুল-ফলই পড়ত—বাড়ি ফিরে যাও মা—কী করব বলো—
ম-ন-জু-লার কান্না দেখে ওর নিজের চোখে জল এসেছিল। সত্যি, কত আশা করে এসেছিল। হাজরাঠাকুর কী করবেন? যা অদৃষ্টে আছে তাই তিনি বলে দেবেন মাত্র। বেচারি ম-ন-জুলা! অত টাকা ওদের!
সূর্য অস্ত যাচ্ছে ব্যাং নদীর পশ্চিম গায়ে বনজাম আর হিজল আর বেত
ঝোপের আড়ালে। পাঁচুদাসীর মন আনন্দে ভরে উঠল হঠাৎ। খোকা আসছে, হাতে তার বীজবেগুন, কত খেতে খেতে শক্ত হাতে সে লাঙল দেবে, বেগুনের চারা তুলে পুঁতবে হাপর থেকে, সোনা ফলাবে মাটির বুকে। বুড়ো হাজরা বলবার আগে স্বপ্ন দেখেছে তার আসবার। সে আসছে।
ভণ্ডুলমামার বাড়ি
পাড়াগাঁয়ের মাইনার স্কুল। মাঝে মাঝে ভিজিট করতে আসি, আর কোথাও থাকবার জায়গা নেই, হেডমাস্টার অবিনাশবাবুর ওখানেই উঠতে হয়। অবিনাশবাবুকে লাগেও ভালো, বছর বিয়াল্লিশ বয়স, একহারা চেহারা, বেশ ভাবুক লোক। বেশি গোলমাল ঝঞ্ঝাট পছন্দ করেন না, কাজেই জীবনের পথে বাধা ঠেলে অগ্রসর না-হতে পেরে দেবলহাটি মাইনার স্কুলের প্রধান শিক্ষকরূপে পনেরো বছর কাটিয়ে দিলেন এবং বাকি পনেরোটা বছর যে এখানেই কাটাবেন তার সম্ভাবনা ষোলো আনার ওপর সতেরো আনা।
কার্তিক মাসের শেষে হেমন্ত সন্ধ্যা। স্কুলের বারান্দাতে ক্লাসরুমের দু-খানা চেয়ার টেনে নিয়ে আমরা গল্প করছিলাম। সামনেই একটা ছোটো মাঠ, একপাশে একটা বড়ো হুঁতগাছ, একপাশে একটা মজা পুকুর। সামনের কাঁচা রাস্তাটা গ্রামের বাজারের দিকে গিয়েছে। স্থানটা নির্জন।
চায়ের কোনো ব্যবস্থা এখানে হওয়া সম্ভব নয়, তা জানি। একটি গরিব ছাত্র হেডমাস্টারের বাসায় থেকে পড়ে আর তাঁর হাটবাজার করে। সে এসে দুটো রেকাবিতে ঘি-মাখানো রুটি, আলুচচ্চড়ি ও একটু গুড় রেখে গেল। আমি বললুম —অবিনাশবাবু, বেশ ঠান্ডা পড়েচেবেশ গরম মুড়ি খাবার ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু…
—হ্যাঁ, হ্যাঁ—সার্টেনলিওরে ও কানাই, শোন, শোন, যা দিকি একবার গঙ্গার বউয়ের বাড়ি, আমার নাম করে বল গে, দুটি গরম মুড়ি ভেজে দ্যায়—এক্ষুনি…
আমি বললুম, অভাবে চালভাজা…
তারপর গল্পগুজবে আধঘণ্টা কেটে গেল। অবিনাশবাবু কথা বলতে বলতে কেমন অন্যমনস্কভাবে মাঝে মাঝে বাঁ-ধারের মজা পুকুরটার দিকে চাইছিলেন। হঠাৎ বললেন—মুড়ি আসুক, একটা গল্প বলি ততক্ষণ। শুনুন, ইন্সপেক্টারবাবু। এইরকম শীতের সন্ধ্যাতেই কথাটা মনে পড়ে। আপনাকে পেয়ে মনে এত আনন্দ হয়!…এখানকার লোকজন দেখেছেন তো? সব দোকানদার, লেখাপড়ার কোনো চর্চা নেই, ছেলেপিলেকে লেখাপড়া শেখায় এইজন্যে যে কোনরকমে ধারাপাত আর শুভঙ্করীটা শেষ করাতে পারলেই দাঁড়ি ধরাবে। কারুর সঙ্গে কথা বলে সুখ পাইনে, ঝালমসলার দরের কথা কাঁহাতক আলোচনা করি বলুন। ভদ্রঘরের ছেলে,–হয় এসে পড়েচি পেটের দায়ে এই পাণ্ডববর্জিত দেশে, কিন্তু তা বলে মনটা তো—কলেজের দু-চার ক্লাস চোখে দেখেছিলামও তো—পড়াশুনো না-হয় নাই করেচি…
দেখলাম অবিনাশবাবু কলেজের দিনগুলোর কথা এখনও ভুলতে পারেননি। বেচারির জীবনে জাঁকজমক নেই, আত্মপ্রতিষ্ঠার দুরাশা নেই, সাহসও বোধ করি নেই। তাঁর যা-কিছু অভিজ্ঞতা, যা-কিছু কর্মনৈপুণ্য, সবই এই অনাড়ম্বর সরল জীবনধারাকে আশ্রয় করে। কলেজের দিনগুলোতেই শহরের মুখ দেখেছিলেন, আড়ম্বর বা বিলাসিতা—মনেরই বলুন বা দেহেরই বলুন—ওই কলেজের ক-টা বছরেই তার আরম্ভ ও শেষ। সে দিনগুলো যত দূরে গিয়ে পড়চে, রঙিন স্মৃতির প্রলেপ তাদের ওপর যে তত বিচিত্র ও মোহময় হয়ে পড়বে এটা খুব স্বাভাবিক বটে।
অবিনাশবাবু তামাক ধরিয়ে আমার হাতে দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন।
—হুগলি জেলার কোনো এক গ্রামে ছিল আমার বাড়ি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম,—ছিল কেন? এখন নেই?
