পাঁচুদাসীর বড়ো আমোদ লাগছিল। কত লোকের সঙ্গে দেখা, কত দেশ বিদেশ! কলকাতার বউটিকে ওর বড়ো ভালো লেগেছে—হোক না কটোমটো নাম, কী ভালো মেয়ে, কী মিষ্টি কথা, অমায়িক ব্যবহার!
আর একটি বউ এসেছে। ওর নাম তারা, জাতে সদগোপ। বাড়ি বনগাঁর কাছে হরিদাসপুর। তার ছেলে হয়ে মরে যাচ্ছে—গত পৌঁষ মাসেও একটি ছেলে হয়ে মারা গিয়েছে ওর—সেই ছেলের কথা বলে আর কাঁদে।
ম-ন-জুলা বোঝাচ্ছে—কেঁদো না ভাই। সবই ভগবানের ইচ্ছে। আবার কোলজোড়া খোকা পাবে বই-কী—এখন তুমি ছেলেমানুষ—তাঁর নাম করে চলো, কাজ হবে ঠিক। কী বলো ভাই?
ও পাঁচুদাসীর দিকে চেয়ে শেষের প্রশ্নটা করলে। কিন্তু পাঁচুদাসীর মন তখন অনেক দূরে চলে গিয়েছে সেই কলুদিঘির ধারে বড়ো তুততলায়—হাতে পাকা বীজবেগুন, চাঁদমুখখানা ওর দিকে উঁচু করা, কত বিঘের খেতের বীজ!—দু-হাতে ছড়ানো…ও ধন সোনামণি, তুমি আসবা, আসবা আমার কুঁড়েঘরে আমার কোলজোড়া হয়ে! আসবা আঁধার পক্ষের শেষ রাতের অন্ধকারে, পাখিপক্ষী যখন ডেকে উঠবে আমবনে, বাঁশবনে, কুল্লো পাখি ডাকবে শিমুলগাছের মগডালে, বিলবাঁওড়ে মাছ ভেসে উঠবে কেউটে পানার দামের মধ্যি! বুড়ো হাজরার দোহাই, পেঁচোপাঁচীর দোহাই…এসো খোকা, এসো…
একজন কে বলছে—আঁচল পাততে হয় হাজরাতলায়—নদীতে নেয়ে আঁচল পেতে ঠাকুরতলায় বসে থাকতে হয়—
পাঁচুদাসী বললে—কেন?
—আঁচলে ফল পড়ে, ফুল পড়ে—যার যা হবে তাই পড়ে।
কথা চাপা পড়ে গেল। সবাই বলচে ওই হাজরাতলা দেখা যাচ্ছে—
ওরা পৌঁছে গেল।
নদীর ধারে মাঠের মধ্যে চারিধারে বহু প্রাচীন ষাঁড় গাছের সারি। নিবিড় ঝোপ তৈরি করেচে ওরা জড়াজড়ি করে। বেড়ার মতো আড়াল করেছে…ওর ওদিকে কিছু চোখে পড়ে না। সেই যাঁড়া ঝোপের বেড়ার ধারে একটা বড়ো বাঁড়াগাছই হচ্ছে হাজরাতলা, বৃদ্ধ হাজরা ঠাকুরের স্থান।…
সেই গাছতলায় পুজোর জোগাড় হয়েছে…পুরুতঠাকুর বসে আছে। চাল, কলা, ছোলাভিজে, পেঁপে…ফুলের রাশ। লোকে লোকারণ্য হাজরাতলায়। দশ পনেরোখানা গোরুরগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে—এপার থেকে যারা এসেছে তাদের গাড়ি।
ষাঁড়া ঝোপ ঘেরা মাঠের বাইরে দোকান বসেচে…মুড়িমুড়কি, ফুলুরি, কাটিভাজা, ছোলাভাজা। পি-পি বাঁশি বাজচে ছোটো ছেলে-মেয়েদের মুখে…খেলনা বিক্রি হচ্ছে। মাটির ছোবা, পুতুল, রাধাকেষ্ট, শিবঠাকুর, ঘোড়ামণিহারি দোকানে ফিতে, কাচের চুড়ি, চিরুনি বিক্রি হচ্ছে…দু-তিনখানা দোকানে পাঁপর ভাজা হচ্ছে। তেমনি খদ্দেরের ভিড়—বেশিরভাগ ছোটো ছেলে-মেয়ে আর গোরুরগাড়ির গাড়োয়ানেরা। আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেক ঝি-বউ বিনা কারণেই পুজো দেখতে এসেচে হাজরাতলায়।
বেলা দুপুর ঘুরে গিয়েছে। পুজোর বাজনা বেজে উঠল।
পুরুতঠাকুর বললেন—যাও মাঠাকরুনরা, স্নান করে এসে ভিজে কাপড়ে সব হাজরাতলায় আঁচল বিছিয়ে বসো
কলকাতার বউটি আর পাঁচুদাসী একসঙ্গে নেয়ে উঠল নদী থেকে। একনিশ্বাসে ডুব দিতে হবে, উত্তরমুখ হয়ে হাজরা ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করতে হবে।
ম-ন-জুলা চুপি চুপি বললে—ভাই, আমার বুক কাঁপচে।
–কেন দিদি?
—আমার বড়ো সাধ—তোমাকে বলচি ভাই, বুকখানা হু-হু করে মাঝে মাঝে। আমার সঙ্গে আমার সমবয়সি যাদের বিয়ে হয়েছিল, সবার একটি-দুটি সন্তান হয়ে গিয়েছে—ওঁর মনে বড়ো কষ্ট—
—বাবার দয়া দিদি। হয়ে যাবে, চলো শিগগির করে যাই—
পাঁচুদাসীর বড়ো মায়া হয় বউটির ওপর। কী চমৎকার মানিয়েছে ওকে নীল রং-এর ফুল-তোলা ভিজে শাড়ি পরে…দু-দণ্ড চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। অনেকেই চেয়ে চেয়ে দেখছিলও ওকে…সুন্দরী বটে…পাড়াগাঁয়ের হাটে-মাঠে অমন সুন্দরী মেয়ে চোখে পড়ে কখনো? আহা, মোমের গড়ন হাত দুটি কখনো কি গোবরের ঝুড়ি ধরতে পারবে? গড়ে ধান ভেনে দিতে পারবে—আঙুল ঘেঁচে যাবে তা হলে। ও-হাত ধান ভেনে দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি।
অন্তত পঁচিশ-ত্রিশ জন বউ, সবাই তরুণী, ভিজে কাপড়ে সারি বেঁধে হাজরাতলায় দাঁড়িয়ে। পুরুতঠাকুর সকলের মাথায় কুশিতে করে জলের ছিটে দিয়ে বললেন—যাও সব মায়েরা, এইবার আঁচল পেতে বসে গে—
একজন বললে—কতক্ষণ বসে থাকব বাবাঠাকুর?
—চোখ বুজে বসবে সবাই। যতক্ষণ না-আঁচলে কিছু পড়ে ততক্ষণ বসবে মা তোমরা। চোখ চেও না কেউ, আসন ছেড়ে উঠে পোড়ো না যেন অধৈর্য হয়ে।
চৈত্র মাসের খররোদে মাঠ তেতে উঠেচে-বাতাস যেন আগুনের হলকা, তবুও হাজরাতলায় বেশ ছায়া আছে তাই রক্ষে—পাঁচুদাসীর জলতেষ্টা পেয়েচে, জল খাওয়ার কথা এখন ভাবতে নেই। বুড়ো হাজরা দয়া করুন। ঢোল বাজচে কাঁসি বাজচে। ট্যাং ট্যাং ট্যাংকাঁইনানা, কাঁইনানা…না, ওসব ভাবতে নেই…হাজরাঠাকুর অপরাধ যেন না-নেন। পাঁচুদাসী আবার মনকে স্থির করবার চেষ্টা করল।
কতক্ষণ কেটে গেল।
পাঁচুদাসী এর মধ্যে বারতিনেক চোখ চেয়ে দেখেচে। আশপাশে হাজরাঠাকুরের কোনো মন্দির বা মূর্তি নেই। একটা মস্তবড়ো ষাঁড়াগাছ অনেকদ্দূর জুড়ে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তলায় ছড়িয়ে পড়া শুকনো পাতার উপর তরুণী বউ-এর দল চোখ বুজে আঁচল বিছিয়ে বসে…কোনো লোক নেই এদিকে…পুরুতঠাকুর রয়েছেন দূরে ও গাছের তলায় পুজোর জায়গায়। ও ভালো করে চেয়ে দেখলে গাছতলায় একখানা সিঁদুরমাখানো ইট পর্যন্ত নেই।
পাঁচুদাসী আবার চোখ বুজল।
হঠাৎ ওঁদের সারিতে একটি বউ অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল—আমার আঁচলে একটা কী পড়ল! পাশের একজন উপদেশ দিল—চোখ চেয়ে দেখো না কী?
