—সে-কথা পরে বলচি। না, এখন নেই ধরে নিতে পারেন। কেন যে নেই, তার সঙ্গে এই গল্পের একটা সম্বন্ধ আছে, গল্পটা শুনলেই বুঝবেন।
হুগলি জেলার কোনো এক গ্রামে আমার মামারবাড়ি ছিল। ছেলেবেলায় যখন সর্বপ্রথম মায়ের সঙ্গে সেখানে যাই, তখন আমার বয়স বছরপাঁচেক। আমাদের মামারবাড়ির পাড়ায় আট-নয় ঘর ব্রাহ্মণের বাস, ঘেঁষাঘেঁষি বসতি, একচালে আগুন লাগলে পাড়াসুদ্ধ পুড়ে যায়, এমন অবস্থা। কোঠাবাড়ি ছিল কেবল আমার মামাদের, আর সব খড়ের ছাউনি, ছোটো-বড়ো আটচালা ঘর, এপাড়া থেকে ওপাড়া যাবার পথে একটা বড়ো আম-কাঁঠালের বাগান, বনজঙ্গল, সজনে গাছ ও দু-একটা ডোবা। বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকদ্দূর গেলে তবে ওপাড়ার প্রথম বাড়িটা। সেই বনজঙ্গলের মধ্যে কাদের একটা কোঠাবাড়ি খানিকটা গাঁথা হচ্চে।
সেবার কিছুদিন থেকে চলে আসবার পর আবার যখন মামারবাড়ি গেলুম, তখন আমার বয়স আট বছর। গ্রামটা অনেক দিন পরে দেখতে বেরিয়ে চোখে পড়ল, এপাড়া-ওপাড়ার মধ্যে বাঁ-দিকে ডোবার ধারের একটা জায়গা। একটু অবাক হয়ে গেলাম। ডোবার পাড়ের জঙ্গল অনেকটা কাটানো, কাদের একটা কোঠাবাড়ি খানিকটা গাঁথা অবস্থায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু মনে হল অনেক দিন গাঁথুনির কাজ বন্ধ আছে, যে-জন্যই হোক, কারণ ভিতের গায়ে ও ঘরের মেঝেতে ছোটো-বড়ো ভাঁটশাওড়ার গাছ গজিয়েচে, চুন-সুরকি মাখার ছোটো খানাতে পর্যন্ত বনমুলোর চারা। মনে পড়ল, সেবার এসে বাড়িটা গাঁথা হচ্চে দেখেছিলুম। এখনও গাঁথা শেষ হয়নি তো? কারা বাড়ি তুলচে?
ছুটে গিয়ে দিদিমাকে জিজ্ঞেস করলুম।
—কারা ওখানে বাড়ি করচে দিদিমা, সেবার এসে দেখে গিইচি, এখনও শেষ হয়নি?
—তোর এত কথাও মনে আছে!…ও তোর ভণ্ডুলমামা বাড়ি করছে, এখানে তো থাকে না, তাই দেখাশোনার অভাবে গাঁথুনি এগুচ্চে না।
আমার ভারি কৌতূহল হল, সাগ্রহে বললুম, ভণ্ডুলমামা কোথায় থাকে দিদিমা? ভণ্ডুলমামা কে?…
—ভণ্ডুল রেলে চাকরি করে, লালমণিরহাটে না কোথায়। আমাদের গাঁয়েই ছেলেবেলায় থাকত, বাড়িঘর তো ছিল না। ওপাড়ার মুখুয্যেবাড়ির ভাগনে, চাকরিবাকরি করছে, ছেলেপুলে হয়েছে, একটা আস্তানা তো চাই? তাই টাকা পাঠিয়ে দ্যায়, মুখুয্যেরা মিস্ত্রি লাগিয়ে ঘরদোর শুরু করে দিয়েছে, নিজে ছুটিতে এসে মাঝে মাঝে দেখাশোনা করে—
আমি ছাড়বার পাত্র নই, বললুম,—তবে বাড়ি গাঁথা হচ্ছে না কেন? মুখুয্যেরা তো দেখলেই পারে?
—তা নয়, সবসময় তো টাকা পাঠাতে পারে না? যখন পাঠায়, তখন মিস্ত্রি লাগানো হয়।
কী জানি কেন সেই থেকে এই ভণ্ডুলমামা ও তাঁর আধ-গাঁথা বাড়িটা আমার মনে একটা অদ্ভুত স্থান অধিকার করে রইল। রূপকথার রাজপুত্রের মতোই এই ভণ্ডুলমামা হয়ে রইলেন অবাস্তব, স্পর্শের অতীত, দর্শনের অতীত, এক
মানসরাজ্যের অধিবাসী, তাঁর চাকরির স্থান লালমণিরহাট, মায় তাঁর ছেলে মেয়েসুদ্ধ। তাঁর টাকা পাঠাবার ক্ষমতা বা অক্ষমতাও যেন কোথায় আমার ব্যক্তিগত সহানুভূতির বিষয়ীভূত হয়ে দাঁড়াল, অথচ কেন এসব হল তার কোনো ন্যায়সংগত কারণ আজও মনের মধ্যে খুঁজে পাই না।
কতবার দিদিমাদের চিলেকোঠার ছাদে শুয়ে দিদিমার মুখে রূপকথা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক মনে ভেবেচি—লালমণিরহাট থেকে ভণ্ডুলমামা আবার কবে। টাকা পাঠাবে বাড়ি গাঁথার জন্যে?…না, এবার বোধ হয় নিজে আসবে। মুখুয্যেরা বোধ হয় ভণ্ডুলমামার টাকা চুরি করে, তাই ওদের হাতে আর টাকা দেবে না। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির গল্পের ফাঁকে দিদিমাকে কখনো বা জিজ্ঞেস করি—লালমণিরহাট কোথায় দিদিমা? দিদিমা অবাক হয়ে বলেন—লালমণিরহাট! কেন, তাতে তোর হঠাৎ কী দরকার পড়ল?…তা, কী জানি বাপু কোথায় লালমণিরহাট? নে নে, ঘুমুস তো আমায় রেহাই দে,রাত্তিরে এখন গিয়ে আমায় দুটো মোচা কুটে রাখতে হবে, ঠাকুরঘরের বাসন বের করতে হবে, ছিষ্টির কাজ পড়ে রয়েছে—তোমায় নিয়ে সারারাত গল্প করলে তো চলবে না আমার।
আমি অপ্রতিভের সুরে বলতুম—না দিদিমা, গল্প বললো, যেও না, আচ্ছা মন দিয়ে শুনছি।
এর পরে আবার মামারবাড়ি গেলুম বছর দুই পরে। এই দু-বছরের মধ্যে আমি কিন্তু ভণ্ডুলমামার বাড়ির কথা ভুলে যাইনি। শীতের সন্ধ্যায় গোয়ালে সাঁজালের ধোঁয়ায় আমাদের পুকুরপাড়টা ভরে যেত, বনের গাছপালাগুলো যেন অস্পষ্ট, যেন মনে হত সন্ধ্যায় কুয়াশা হয়েছে বুঝি আজ, সেইদিকে চাইলেই আমার অমনি মনে পড়ত ভণ্ডুলমামার সেই আধ-তৈরি কোঠাবাড়িটার কথা—এমনি শ্যাওড়াবনে ঘেরা পুকুরপাড়ে—এতদিনে কতটা গাঁথা হল কে জানে? এতদিন নিশ্চয় ভণ্ডুলমামা মুখুয্যেবাড়ি টাকা পাঠিয়েছে।
মামারবাড়িতে রাতে এসে পৌঁছালাম। সকালে ওই পথে বেড়াতে গিয়ে দেখি–ও মা, এ কী, ভণ্ডুলমামার বাড়িটা যেমন তেমনি পড়ে আছে! চার-পাঁচ বছর আগে যতটা গাঁথা দেখে গিয়েছিলুম, গাঁথুনির কাজ তার বেশি আর একটুও এগোয়নি, বনে-জঙ্গলে একেবারে ভর্তি, ইটের গাঁথুনির ফাঁকে বট-অশ্বথের বড়ো বড়ো চারা। আহা, ভণ্ডুলমামা বোধ হয় টাকা পাঠাতে পারেনি আর!
ভণ্ডুলমামার সম্বন্ধে সেবার অনেক কথা শুনলাম। ভণ্ডুলমামা লালমণিরহাটে নেই, সান্তাহারে বদলি হয়েছে। তার এখন দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড়ো ছেলেটি আমারই বয়সি, ভণ্ডুলমামার মা সম্প্রতি মারা গিয়েচে। বড়ো ছেলেটির পৈতে হবে সামনের চৈত্রমাসে। সেই সময়ে ওরা দেশে আসতে পারে।
