উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করে একজন কুলিকে—বলি শোনো, একটু ভালো জল পাওয়া যায় কনে?
কুলি আধা বাংলা আধা হিন্দিতে যা বলে গেল তার অর্থ এই—ভালো জল আমি পাব কোথায়? নিজে খুঁজে দ্যাখো!
একজন ওদের বলে দিলে, ওভারব্রিজের ওপর বিছানা করে শুতে। ওখানে হাওয়া আছে, মশা লাগবে না, প্ল্যাটফর্মে বেজায় মশা।
ওরা তাই করলে বটে, কিন্তু রাতে পাঁচুদাসীর মোটে ঘুম হল না। হইচই চিৎকার, রেলগাড়ি আসচে সারারাত ধরে। কত কষ্টে ভোর হল। রাত আর পোহায় না।
ঘুমজড়িত কণ্ঠে পাঁচুদাসী বললে—হ্যাঁগো, ওই চা কি লোকের খাবার সময় অসময় নেই গা? সারারাতই চা গরম! লোকে ঘুমুবে না চা খাবে? চক্ষেও কি ওদের ঘুম নেই? এমন অনাছিষ্টি কাণ্ডও যদি কখনো দেখে থাকি!
ভোরে নাভারনের ট্রেন এল। লোকজন সব উঠল। ওরাও উঠল। আবার সেই ছোটো খোকার মুখ মনে পড়ল পাঁচুদাসীর। সেই ছোট্ট সুন্দর মুখখানি, সম্মুখের এক অজানা দিনের কোণ থেকে উঁকি মারচে, কীসের আড়াল ওদের দুজনের মাঝখানে! হাজরাতলার বুড়ো হাজরা ঠাকুর কি সে আড়াল দূর করতে পারবেন?
নাভারন ছোট্ট ইস্টিশান।
সামনের চওড়া পাকা রাস্তা গিয়ে ওধারের বড়ো রাস্তায় মিশেছে। বড়ো বিলিতি চটকাগাছের সারি পথের দু-ধারে। পাঁচুদাসী বললে—ও রাস্তা কোথাকার গো?
উদ্ধব দাস জানে না। বললে—কী জানি? বলতে পারিনে।
একজন গাড়োয়ান ধানের বস্তা নামাচ্ছিল গোরুরগাড়ি থেকে, সে বললে—ওই রাস্তা? ও গিয়েছে যশোরে, ইদিকে কলকাতায়। ওর নাম যশোর রোড।
যশোর রোড! যশোর রোড! পাঁচুদাসীর মুখে হাসি এসে পড়ে অকারণে! কী নাম যে বাপু!
উদ্ধব দাস সেই গাড়ির গাড়োয়ানকে বললে—নিশেনখালির হাজরাতলায় নিয়ে যাবা?
—তা যেতি পারি। ক-জন?
—দু-জন। এই তো দেখতে পাচ্চ।
—আজ পরবের দিন, সেখানে বড্ড ভিড় হয়, কত দেশ থেকে হাজরাতলায় পুজো দিতি লোক আসে। পাঁচটি টাকা ভাড়া লাগবেক যাতায়াতে।
এমন সময় পাঁচুদাসী লক্ষ করলে দামি শাড়ি পরনে একটি সুন্দরী বউ স্টেশনের বাইরে জামতলাটায় ওদের কাছে এসে দাঁড়াল। ওর সঙ্গে একটি ফরসা জামাকাপড় পরা ভদ্রলোক, চোখে চশমা, হাতে ঘড়ি। পেছনে পেছনে একটা চাকর গোছের লোক, তার হাতে চামড়ার একটি বাক্স। বউটি তাকে বললে—তুমি কোথায় যাবে?
পাঁচুদাসী সংকোচের সুরে তাকে বসলে—নিশেনখালির হাজরাতলায়—
বউটি পেছন ফিরে তার সঙ্গী ভদ্রলোককে বললে—ওগো, এরাও সেখানে যাচ্ছে—
ভদ্রলোকটি উদ্ধব দাসকে বললে—তোমরাও হাজরাতলায় যাবে?
—হ্যাঁ বাবু। আপনারাও সেখানে যাবেন?
—আমরাও সেখানে যাচ্চি। কত দূর?
—তা তো বাবু জানিনে। আমরা নতুন যাচ্চি। আজ মঙ্গলবার, সেখানে আজ পুজো দিতে হয়, তাই যাব। আমাদের বাড়ি অনেকদ্দূর এখান থেকে।
—তাই তো! এ যে অজ পাড়াগাঁ দেখছি। কোথায় কতদূর যেতে হবে না জানলে এখন করি কী—
-বাবু, এই গোরুরগাড়ি সেখানে যাবে বলছে। পাঁচ টাকা ভাড়া। চলেন ওই গাড়িতেই সবাই যাই। আপনারা এখন গাড়ি পাবেনই বা কনে, মাঠাকরুন না-হয় গাড়িতে উঠুন, আমি হেঁটে যাব এখন।
বেলা বারোটার সময় ওরা একটা আধমজা নদীর ধারে এসে হাজির হল। নদীর নাম ব্যাং নদী—দু-ধারে বনজাম আর হিজল বাদামের বন, বাঁশনি বাঁশের বন আর বেতঝোপ। অত বেলা হলেও রোদ নেই এপারে, দিব্যি ঘন ছায়া। গাড়োয়ানের মুখে শোনা গেল নদী পার হয়ে আধক্রোশটাক গেলেই নিশেনখালির হাজরাতলা।
ইতিমধ্যে বউটির সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছে পাঁচুদাসীর। ওর নামটি বড়ো কটোমটো, মুখ দিয়ে উচ্চারণ হওয়া কঠিন—ম-ন-জুলা। কলকাতায় শ্বশুরবাড়ি, সঙ্গে যিনি এসেছেন উনিই স্বামী, কলকাতায় চাকুরি করেন। পয়সাওয়ালা লোক, কলকাতায় নিজেদের বাড়ি আছে। বিয়ে হয়েছে আজ চার বছর, ছেলেপুলে না হওয়াতে হাজরাতলায় পুজো দিতে চলেছে ওদেরই মতো।
ম-ন-জুলা বলছে—আচ্ছা ভাই, ঠাকুর খুব জাগ্রত, না?
—শুনেছি তো দিদি। আমারও তো সেইজন্যিই আসা। যদি উনি মুখ তুলি চান
—আমারও তাই। তোমায় বলতে কী, সব আছে কিন্তু মনে সুখ নেই। উনি আবার এসব মানেন না, আমি জোর করে নিয়ে এসেছি। বলি চলো, পাঁচ জায়গায় দেখতে হয়—এতে আর কষ্ট কী? আমার তো দিব্যি লাগছে ভাই। কী চমৎকার নদীর ধারটা-কলকাতা থেকে কতকাল কোথাও বার হইনি ভাই—মধুপুর যাওয়া হয়েছিল সেবার পুজোয়—দু-বছরহ-ল—
—সে কোথায় দিদি? মধুপুর?
-–পশ্চিমে সাঁওতাল পরগনায়। পাহাড় আছে, শালবন আছে সেখানে। বেশ ভালো জায়গা—কিন্তু এ জায়গাও আমার বেশ ভালো লাগছে—কত পাখির ডাক! পাখির ডাক শুনে যেন বাঁচলাম কত দিন পরে। কেমন সুন্দর, না?
পাঁচুদাসী বউটির কথাবার্তার ভঙ্গিতে কৌতুক অনুভব করলে। পাখির ডাক শুনে শুনে তার কান পচে গেল। সে আবার কী একটা জিনিস এমন তা তো জানা নেই! যত আজগুবী কাণ্ড! ভদ্রতার খাতিরে সে বললে—হ্যাঁ দিদি, ঠিক। চলুন আমার সঙ্গে আমাদের গাঁয়ে ঝিটকিপোতায়। দিনরাত পাখির কিচিরমিচির শোনাব।
তারপর ওরা ব্যাং নদী জীর্ণ খেয়ায় পার হয়ে ওপারে চলে গেল। আরও কয়েক দলের সঙ্গে দেখা হল—আশপাশের গ্রাম থেকে তারাও চলেছে, আজ মঙ্গলবারে হাজরাতলায় পুজো দিতে। গাড়ি নদীর ওপারেই রয়ে গেল। এ পথটুকু হেঁটেই যেতে হবে। নদীর ধার দিয়ে খানিকটা গিয়ে একটা যজ্ঞিডুমুর গাছের তলা দিয়ে বনঝোপের পাশ কাটিয়ে পথ চলেছে উত্তর মুখে—বাবলাগাছে ভরতি সবুজ মাঠের মাঝখান বেয়ে।
