পাঁচুদাসীর নিঃসন্তান বুভুক্ষু প্রাণ বলে উঠল—আসবি খোকা? আসবি? তোর হাতে ওকি?
—বাগুন। তোদের খেতে নিড়েন পাট করে পুঁতে দেবানি—
-–ওরে আমার সোনা! কানে ছিলে এমন মানিক? আয় আয়—
কি চমৎকার মুখখানা খোকার! ওই ছিরু ঘোষের মেজে নাতির মতো দেখতে। পাঁচুদাসীর বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল স্বপ্নের কথা ভেবে। কোথায় হারিয়ে গেল সে মুখ! স্পষ্ট মুখখানা মনে পড়ে এখন। চোখে জল এসে পড়ে পাঁচুদাসীর।
সত্যি যেন এ স্বপ্ন! সত্যি হবে?
আজই বিশেষ করে ও-স্বপ্ন কেন?
আজ পাঁচটি বছর বিয়ে হয়েছে, একটি ছেলে নেই, মেয়ে নেই। নিঃসন্তান দাম্পত্য সংসারের আকাশে বাতাসে আড়ালে অবকাশে নিষ্ঠুর কালো ছায়া ফেলে থমথমিয়ে থাকে, অথচ অভাব তো নেই সংসারে। গোলাভরা ধান, ডোলভরা মুসুরি, ছোলা, খেতপোরা বেগুন, কুমড়ো, তেঁড়শের চারা ঠেলে উঠেছে কানিজোলের খেতে। গত শীতকালে সাতগণ্ডা ভাঁড় খেজুরগুড়ে ভর্তি করে আড়ায় তুলে রেখেছে বর্ষাদিনের জন্যে। হাটরা হাট চার-পাঁচ টাকা শুধু বেগুন কুমড়ো বিক্রি। লাউ কী মাচায়! যেমন তেজালো লতা, তেমনি তার ফলন। সূর্যমুখী লঙ্কা খেতে দু-দিকে মুখ করে যেন চোদ্দো পিদিম জ্বালিয়ে রেখেছিল মাঘের শেষেও।
উদ্ধব দাস খাওয়া শেষ করে থালা ধুয়ে ফেললে নদীর জলে। মাঝি ছাড়লে ডিঙি। পশ্চিম আকাশে মেঘ জমে আসছে, কালবোশেখীর দিন, উদ্ধব বললেও মাঝি, হাত চালিয়ে নাও—ওই দ্যাখো—
মাঝি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ঈশান কোণের আকাশে চেয়ে বললে—তাতমেঘা। জল হবে না।
-তোকে বলেচে!
—দেখে নিও মোড়ল। তাতের মেঘ, বাতাস উঠতি পারে, জল হবে না।
—বাতাস উঠলেও তো মুশকিল। হাত চালিয়ে নাও—এবার ক-খানা বাঁক?
—আর একখানা। ওই পাইকপাড়ার বটগাছ থেকে শুরু হল বাঁকখানা। ওর ও মুড়োয়—
পাঁচদাসীর মজা লাগে ওদের কথাবার্তা শুনতে।
বাড়ি থেকে বেরুলে দুশো রগড়। আজ চরের কাশবনে চড়ুইভাতি চাঁদের আলোর তলায়। বাঁশের চোঙে ফু পেড়ে ধোঁয়াভরা রান্নাঘরে ভাত রান্না নয়। কি বিশ্রী এবারকার তেত্তি বীজ গাছের চ্যালাগুলো। আগুন ধরতে কী চায়! ফু পেড়ে পেড়ে চোখ রাঙা হয়ে যায় একেবারে। সেই ছোট্ট খোকা যেন ওই চরে কাশের ডগায় ডগায় ফড়িং প্রজাপতি ধরে বেড়াচ্ছে। তাকেই ও দেখচে সর্বত্র। সবসময়ই তার কথা মনে পড়ছে।
স্বপ্ন কী সত্যি হয়?
যদি সত্যি হয়! কে বলতে পারে?
ওর সারা গা আবার যেন শিউরে ওঠে।
সন্ধ্যার আর দেরি নেই। ওই দূরে বাঁ-দিকের পাড়ে একটা ইটের পাঁজা। অন্যদিকে হলদে রঙের কোঠাবাড়ি একটা। বড়ো বড়ো গাছের তলায় আরও দু একটা বাড়ি চোখে পড়ে। পাঁচুদাসী জিজ্ঞস করলে—হ্যাঁগা, ওই বাড়িটা কাদের? ভালো বাড়ি।
মাঝি বললে—ওটারে বলে ডাক-বাংলা। সাহেবরা এসি থাকে।
উদ্ধব দাস বললে—সেবার বাগুন বিক্রি করতি এসে দেখি ওর বারান্দায় গোরা সাহেব পিলপিল করচে। এই সঙ্গে মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে। ভিড় কী! সাহেবের ছেলেরা ছুটোছুটি করচে ইদিক-ওদিক।
পাঁচুদাসী কী ভেবে বললে—হ্যাঁগা, সাহেবদের ছেলেরা দেখতি কেমন?
—খুব ফরসা।
—কেমনধারা ফরসা?
—সে কী বোঝাব তোরে? তুই পাড়াগেঁয়ে ভূত, সাহেবের কী বুঝিস?
—আহা-হা! আর উনি একেবারে শহুরে বাবু! সেই একবার বাগুন বেচতি তো এসেছিলে—বলে জন্মের মধ্যি কম্ম, চত্তির মাসে রাস!
ওরা ডাঙায় জিনিসপত্র নামাল। হেঁটে যেতে হবে ইস্টিশানে—আধক্রোশটাক ডাকবাংলার ঘাট থেকে। একটা ভারি বোঁচকা, এক বোঝা ডাঁটা আর কুমড়ো শাক এই সঙ্গে। পাঁচুদাসী বোঁচকা কাঁখে পেছনে পেছনে চলল—আগে আগে উদ্ধব দাস। মাঝি রইল ঘাটেই, ঝালতলায় সে বেঁধে-বেড়ে খাবে, নৌকোতে শুয়ে থাকবে রাত্রে—আবার কাল রাত দশটার সময় ওরা ফিরবে, নৌকো ছাড়া হবে তখন।
উদ্ধব দাস বললে—তোমার কী কী লাগবে বলো, কিনে দিয়ে যাই–
—হাঁড়ি একটি, সরা একটি,—আর খলি মাছ যদি বাজারে পাই, মাছের দামটা দিয়ে যাও।
—মুসুরি ডাল খাবা। এক সের ডাল দিইচি আবার মাছের পয়সা; ভারি বড়োনোক দেখেছো মোরে!
মাঝি অনুনয়ের সুরে বললে—দিয়ে যাও মোড়ল। আমাদের ওদিকি খয়রা মাছ খেতি পাইনে। যদি কাল বাজারে খয়রা মাছ পাই—চার আনা দ্যাও।
পাঁচুদাসী স্বামীকে ধমক দিয়ে বললে—দ্যাও না গো ওকে। ছেলেমানুষ। যাচ্ছি। একটা শুভ কষ্মে। যা খেতি চায় ওর প্রাণ, দাও ওকে। চারগণ্ডা পয়সা দাও মাছের আর দু-আনা দাও রসগোল্লার
উদ্ধব দাসকে অগত্যা নগদ ছ-আনা পয়সা দিতে হল মাঝির হাতে। মেয়েমানুষের নাই পেলে কী আর রক্ষে রাখে লোক? যাকগে।
কখন গাড়ি আসে নাভারনের ওরা কিছুই জানে না। স্টেশনে গিয়ে জিজ্ঞস করে জানা গেল, নাভারনের গাড়ি আসবে কাল ভোরবেলা। কেউ জানে না সে-কথা। পাঁচুদাসী স্বামীকে বকলে, না-জেনেশুনে আসো কেন? নৌকোতে রাত কাটালে দিব্যি হত। এখানে কী শোবার জায়গা আছে? এত ভিড়, এত লোকের চিৎকার—মাগো, ইস্টিশান নয়—যেন কুঁদিপুরের গাজনতলায় আড়ং বসেচে!
উদ্ধব দাস অভিজ্ঞতার অটুট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললে—তুই থাম দিকি। তুই চিনিচিস কেবল কুঁদিপুরের গাজনতলার আড়ং—দেখলি বা কী জীবনে?
—তুমি খুব দেখেচো তো! তা হলেই হল—
—তোর চেয়ে তো বেশি। আমি আসিনি বনগাঁ ইস্টিশান? শেয়ালদ’ গিইচি আলু-পটলের আড়তে। এই রেলে চড়ে যেতি হয়। সাড়ে চোদ্দো আনা ভাড়া। এই দিকি—
উদ্ধব দাস আঙুল দিয়ে কলকাতা লাইনের ডিসট্যান্ট সিগন্যালটা দেখালে।
