পাণ্ডা ওদের বাসায় নিয়ে এল। দোতলা ঘরের একটা কুঠুরিতে ওদের থাকবার জায়গা। ছোটো জানালা দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া আসছে। দেয়ালের গায়ে বাঁশের আড়ায় অনেকগুলো বেতের পেটরা ভোলা। পাণ্ডাগিন্নি বললে—ওগুলোতে ওদের কাপড়চোপড় থাকে। পাণ্ডার বাড়িতে শালগ্রাম শিলার নিত্য পূজা হয়। বাড়ির মেয়েরা যেমন সুন্দরী, তেমনই ভক্তিমতী। দোতলার ছোট্ট ঠাকুরঘরে অনেক পুরোনো আমলের কাঁথা পাতা, কড়ি-ঝিনুকের দোলায় গৃহদেবতা বসানো, দেয়ালে পদ্ম আঁকা, সর্বদা ধূপ-ধুনোর গন্ধ সে ঘরে। মেয়েরা স্নান করে ঠাকুরের স্তব পাঠ করে, ধপ ধপ করে ওদের গায়ের রং, মাথায় একটাল করে কালো চুল।
বড়ো মেয়েটির নাম রুক্মিণী, সে বলে—মোর বাবা ভিতরছ পাণ্ডা।
খুড়িমা বলেন—সে কী?
রুক্মিণীর মা বুঝিয়ে বলে—পাণ্ডাদের মধ্যে বড়ো। সিঙার-বেশ করবার একমাত্র অধিকার ওদের। সেইজন্যে উপাধি সিঙারীবৃন্দাবন সিঙারীর পুত্র গোবিন্দ সিঙারী। অনেক বেশি মান ওদের। দুজন গোমস্তা, তিন-চারজন ছড়িদার মাইনে করা, কটক থেকে পর্যন্ত যাত্রী বাগিয়ে আনে!
রাত্রে ওদের জন্যে মন্দির থেকে এল ঘিয়েভাজা মালপোয়া, ভুরভুর করছে গব্যঘৃতের সুগন্ধ তাতে, আরও দু-তিনরকম মিষ্টি। পাণ্ডাগৃহিণী বললেন—কাল কণিকা-প্রসাদ আনিয়ে দেব শ্রীমন্দির থেকে। মধ্যাহ্নধূপ সরে গেলেই লোক পাঠাব।
সকালে উঠে ছড়িদার ওদের নিয়ে সমুদ্রস্নান করাতে গিয়ে একজন নুলিয়ার জিম্মা করে দিলে।
বুধোর মা বলে উঠল—ও বামুনদিদি, ই কী কাণ্ড! এ যে আমারে নিয়ে নাচতি লাগল ঢেউয়ে!
বোষ্টম-বউকে উত্তাল এক ঢেউয়ে তুলে নিয়ে সপাটে এক আছাড় মারলে বালির চড়ায়।
স্নানান্তে মন্দিরে গিয়ে সবাই ঠাকুরদর্শন করলে! কাল রাত্রের সেই বৃদ্ধাটির সঙ্গে বিমলাদেবীর মন্দিরে দেখা। তিনি নিজে নিয়ে গেলেন ওদের নৃসিংহদেবের মন্দিরে প্রাঙ্গণ পার হয়ে। সেদিন মধ্যাহ্নধূপ সরতে একটু দেরি হয়ে গেল, কণিকা-প্রসাদ নিয়ে পৌঁছুল বাসায় বেলা চারটের সময়। খুড়িমার একটু কষ্ট হল; অন্যান্য সঙ্গিনীদের খাওয়া অভ্যেস বেলা তিনটের সময়, তারা বিশেষ অসুবিধে অনুভব করলে না।
সন্ধ্যাবেলায় বিমলাদেবীর মন্দিরের চাতালে সেই সাধুটির গীতা-ব্যাখ্যা হচ্ছে। ওরা সবাই গিয়ে বসল সেখানে হাত জোড় করে। আরও অনেক বৃদ্ধা সেখানেই উপস্থিত, প্রায় সকলের হাতেই জপের মালা। সকলে একমনে গীতার ব্যাখ্যা শুনছে।
বুধোর মা কিছুই বুঝলে না। দু-চারবার বোঝবার চেষ্টা যে না-করলে এমন নয়, কিন্তু কী যে বলছেন উনি, যদি একটা কথার অর্থ সে বুঝে থাকে! তবুও তার চোখ দিয়ে জল এল—কোনও কারণে নয়, এমনিই। কেমন সুন্দর কথা বলছেন উনি, মুনিঋষিদের মতো চেহারা। কতবড়ো উঁচু মন্দির, বাবাঃ! উই কেমন একটা লাল শাড়ি পরা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে! আচ্ছা কত টাকা খরচ হয়েছে না-জানি এই মন্দির তৈরি করতে! পাশের একজন বৃদ্ধাকে সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলে— মন্দির কারা তৈরি করে’ল মা?
বৃদ্ধা একমনে শুনছিলেন—বিরক্ত হয়ে বললেন—আঃ একমনে শোনো না বাপু
বুধোর মা অপ্রতিভ হয়ে বললে—না, তাই শুধোচ্ছিলাম।
ওদিক থেকে কে ধমক দিয়ে উঠল—আঃ!
আর একজন কে টিপ্পনি কাটলে—শুনতে আসে না তো, কেবল গল্প করতে আসে।
বুধোর মার বড়ো রাগ হয়ে গেল। একটু কথা বলবার জো নেই, বাব্বাঃ! মাগিদের যদি একবার পেতাম আমাদের গাঁয়ে, তবে দেখিয়ে দেতাম। পরক্ষণেই সে রাগ সামলে গেল। না না, সে মহাপাপী। জগন্নাথ প্রভু দয়া করে তাকে এনেছেন এখানে। নইলে তার কী সাধ্যি সে এখানে আসে? মন্দিরে এসে রাগ করতে নেই। কেমন সুন্দর জায়গা, কত সব ভালো লোক, কেমন ভালো কথা! এসব কথা কেউ তাদের গাঁয়ে বলে? ওরকম বুড়ো তো কতই আছে— ন’লে জেলের বাবা কেদার, কাক-তাড়ানে পাঁচু, শ্যামা যুগী, বেহারী কুমোর— আরও দু-একটা নাম মনে আসতে সে তাড়াতাড়ি চেপে গেল। ওসব কিছু নয়, মুখে মারো ঝাঁটা মুখপোড়াদের!
এতকাল সে কোথায় কোন গর্তে পড়ে ছিল? কী চমৎকার জায়গা, কী পুণ্যির জায়গাতে জগন্নাথ দয়া করে তাকে এনে ফেলেছেন। গীতার ব্যাখ্যা শেষ হয়ে গেলে সবাই যখন চলে আসছিল, তখন সে আবার কাকে জিজ্ঞেস করলে— আচ্ছা, এ মন্দিরডা কে তৈরি করে’ল মা-ঠাকরোন?
—বিশ্বকর্মা।
—বটে!
বুধোর মা আবার অবাক হয়ে কতক্ষণ মন্দিরের দিকে চেয়ে রইল।
খুড়িমা পিছন থেকে বললেন—ও বুধোর মা, অমন কথা বলতে আছে শাস্ত্রপাঠের সময়? ছিঃ আর অমন কোরো না!
রাত্রে বাসায় এসে বুধোর মায়ের উৎসাহ কী! বললেও বামুনদিদি, বড্ড ভালো লাগছে আমার। যে-কডা টাকা হাতে আছে, তীথিধম্মেই খরচা করব। কী ভাগ্যি ছেল আমার যে এখানে এনেছেন জগন্নাথ!
রুক্মিণীর মা ওদের কাছে বসে বসে জগন্নাথদেবের অনেক মহিমাকীর্তন করলেন। কলিকালে জাগ্রত দেবতা জগন্নাথ। যে যা কামনা করে, তাই তিনি পূর্ণ করেন। কলিকালে অন্ন বহ্ম, অন্নদান মহাসেবা। তাই তিনি শুধু অন্ন বিতরণ করছেন দু-হাতে। যে যেখানে ক্ষুধার্ত আছে, সকলকে শুধু পেট ভরে খাওয়াচ্ছেন তিনি। ধ্যান-ধারণা তপস্যা এসব শিকেয় তুলে রাখো—অন্ন বিলোও, শুধু অন্ন বিলোও। অন্নদান মহাযজ্ঞ।
বুধোর মা এ-কথাটা কিছু কিছু বুঝতে পারে। গত বছর বর্ষাকালে, যখন লোকে না-খেয়ে মরছে তাদের গাঁয়ের আশপাশে, তখন নিজের গোলা থেকে সে মুচিপাড়ার সতেরো জন লোককে বিনা বাড়িতে ন-বিশ ধান কর্জ দিয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল—মুচিদের ধান কর্জ দিলে বুধোর মা, ওদের লাঙল নেই, জমি নেই, কর্জ শোধ দেবে কী করে? বাড়ি দেওয়া তো চুলোয় যাক গে!
