বুধোর মা গ্রাহ্য করেনি সেসব কথা।
আজ সিঙারীগিন্নির মুখে জগন্নাথের অন্নদানমাহাত্ম শুনে ওর বুকখানা দশ হাত হল। ভগবান তাকে ঠিক পথেই চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাহলে! সবাই তাকে মন্দ বলে তাদের গাঁয়ে, তারা এসে দেখুক এখানে!
সন্ধ্যাবেলা মন্দিরে ঠাকুরদর্শন করতে গিয়ে বিগ্রহের দিকে চেয়ে ও আজ ভালো করে দেবতাকে যেন বুঝতে পারলে। সে যা বোঝে—অন্নদান মহাপুণ্য। সে নিজের গোলার ধান আর-বছর আকালের সময় বার করে মুচিদের দিতে যায়নি? গনশা মুচির ভাইবউ ছোট্ট খোকাটার হাত ধরে এসে ওকে আর-বছর শ্রাবণ মাসে বললেও দিদিমা, কাল থেকে মোর খোকার পেটে দুটো দানাও যায়নি। একটা উপায় যদি না-করেন, সবসুদ্দ না-খেয়ে মরতি হবে। ধামা বেঁধে তোমার নাতি আজ দু-দিন আগে আট আনা রোজগার করে এনে’ল। তাতে ক-দিন খাওয়া হবে বলো! দু-টাকা করে চালির কাঠা। একটা হিল্লে করতে হবে দিদিমা।
ও বললে—ধামা নিয়ে আসিস এখন মানকের বউ, ধান দেব। একজন যদি নিয়ে গেল, অমনি দশজন এসে পড়ল। মুচিপাড়ার সব ভেঙে পড়ল ধামা-কাঠা হাতে। সবাই কান্নাকাটি করতে লাগল। খেতে পাচ্ছিনে দিদিমা, ধান দেও। কাউকে সে শুধু-হাতে ফিরিয়ে দেয়নি। এতদূর থেকেও জগন্নাথদেব তা জানেন। তাই কী এতদূর থেকে তাকে ডেকে এনেছেন? সেদিন কীসের সেইসব হিজিবিজি কথা বলছিল দাড়িওলা সন্নিসিঠাকুর! সে কিছুই বুঝছিল না। আজ জগন্নাথের কথা সে ঠিক বুঝতে পেরেছে।
অন্নহীন যে, তাকে খাওয়াও, মাখাও। গোলার ধান কর্জ দাও, ওদের বিনা বাড়িতেই কর্জ দাও।
খুড়িমাকে সে ফেরবার পথে সব বললে।
জ্যোৎস্নারাত্রে সমুদ্রের ধারে ওরা সবাই গেল, বুধোর মা-ও গেল। কূলকিনারা নেই জলের, আর কী চমৎকার জ্যোৎস্না! কাল যে বৃদ্ধটির সঙ্গে মন্দিরে দেখা, তিনিও ছিলেন। কে একজন বড়ো সন্নিসি, নাম শ্রীচৈতন্য, এমন জ্যোৎস্নারাত্রে নাকি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলেন, উনি বলেছিলেন সে গল্প। না, সে নিজে কখনো ওঁদের নামও শোনেনি। অজ পাড়াগাঁয়ে বাড়ি, কে ওঁদের নাম শোনাচ্ছে? সে জানে পায়রাগাছির ফকিরের নাম। পায়রাগাছির ফকিরও মস্ত সাধু। সেবার তার একটা গাইগোরু কী খেয়ে হঠাৎ মরে যায় আর কী, সবাই বললে পায়রাগাছির ফকিরের খুব ক্ষমতা। বুধোকে সেখানে পাঠানো হল। ফকির সাহেবের সামান্য কী ওষুধে গোরু একেবারে চাঙ্গা হয়ে উঠল।
ওঁরা সবাই ভালো, সবাই বড়ো। সে-ই কেবল পাপী।
বুধোর মা-ও দু-হাত জুড়ে পায়রাগাছির ফকির সাহেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে।
খুড়িমা বললেন—চলো বুধোর মা, বাসায় ফিরি। ভালো লাগছে?
—পাপমুখে কী করে আর বলি বামুন-দিদি! ইচ্ছে হচ্ছে জগন্নাথের পায়ে চেরজন্ম পড়ে থাকি। সুদু ওই ছোটো নাতনিটার মায়া। আমার হাতে না-হলি দুষ্টু মেয়ে খাবে না। এখন বসে বসে তার কথাই বড় মনে হচ্ছিল। আহা, কদ্দিন মুখটা দেখিনি!
বুধোর মা আঁচলে চোখ মুছলে।
সে-রাত্রে শুয়ে বুধোর মা ছটফট করছে, অনেক রাত্রেও কাতরাচ্ছে দেখে খুড়িমা ও বোষ্টম-বউ ওকে ডাক দিলেন। দেখা গেল, ওর বড় জ্বর হয়েছে। জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে গেল বুধোর মা। সেদিন ভুবনেশ্বর ইস্টিশনের প্ল্যাটফর্মে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর খানিকটা কেটে যায়। সেই কাটা জায়গাটা বিষিয়ে উঠেছে, পরদিন দেখা গেল। জ্বর কমে না দেখে ডাক্তার ডেকে দেখানো হল। শেষপর্যন্ত ডাক্তারের পরামর্শে রোগীকে হাসপাতালে দেওয়া হল।
তিন দিন পরে—রথের আগের দিন।
বুধোর মা-র অবস্থা খুব খারাপ। খুড়িমা, বোষ্টম-বউ, গ্রামের সবাই ঘিরে বসে, এমনকী সেই বৃদ্ধা পর্যন্ত! কখনো-কখনো জ্ঞান হয়, কখনো আবার অজ্ঞান হয়ে
যায়। ডাক্তার বলছে, অবস্থা ভালো নয়।
খুড়িমা বললেন—ও বুধোর মা, কেমন আছ?
—ভালো না, বামুনদিদি।
—বাড়ি যাবে?
—শরীরডা সেরে উঠলে চলুন যাই বামুনদিদি। ছোটো নাতনিটার জন্য মনডা কেমন করছে!
ভক্তিমতী বৃদ্ধাটি বললেন—ভগবানের নাম করো দিদি। বলো—হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে—ওসব চিন্তা ছেড়ে দাও।
রাত বারোটার সময় আর একবার জ্ঞান হল ওর। জ্ঞান হলেই বলে উঠল—ও মুখুজ্যে ঠাকুর, আমার সেই সাত গণ্ডা ট্যাকা—
খুড়িমা মুখের ওপর ঝুঁকে বললেন—কী বলছ, ও বুধোর মা?
—আমায় সেই সাত গণ্ডা ট্যাকা আর শাড়ি দেবা না?
—হরিনাম করো। হরি হরি বলো। বলো, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে!
—আমবাগানের তলায় মুখুজ্যে ঠাকুরের সঙ্গে সিঁদুরকৌটো গাছটার কাছে দেখা। ঘাটের পথ। লোকজনের যাতায়াত বড্ড। এখান থেকে সরে চলো ওদিকি, ও মুখুজ্যেঠাকুর!
আমি খবরটা জানতাম না।
রথের দিন-পাঁচ-ছয় পরে বুধোর সঙ্গে হঠাৎ পথে দেখা। ওর গলায় কাছা দেখে। একটু অবাক হয়ে বললাম—কী রে, গলায় কাছা কেন?
বুধো বললে—মা নেই। চিঠি এসেছে কাল। রথের দিন মারা গিয়েছে।
পরে একটু থেমে বললে—তিনি ভালোই গিয়েছে। বয়েস তো কম হয়নি। কিন্তু এতগুলো ট্যাকা দাদাঠাকুর, কোথায় যে রেখে গেল, সন্ধান দিয়ে গেল না।
কাউকে তো বলত না ট্যাকার কথা!
গ্রামে সবাই বললে—রথের দিন তীথিস্থানে মিত্যু, কী জানি কীরকম হল! অমন স্বভাব-চরিত্তির, চিরকালের খারাপ মেয়েমানুষ, জগন্নাথের নিতান্ত কিরপা না-হলে কী এমন হয়! মাগীর অদেষ্ট ছেল ভালো।
বুড়ো হাজরা কথা কয়
সকালবেলা পাঁচুদাসী বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।
