—তোরা কবে এলি? বামুন-দিদি কবে এলেন? ওমা, আমি কনে যাব! ই কী কাণ্ড!
—তাই তো!
—তোরা আসবি আমাকে তো বললিনে কিছু?
–তুমি এলে কাদের সঙ্গে? তা কী করে জানব যে তুমি আসবে?
খুড়িমা ইতিমধ্যে কাপড় ছেড়ে এগিয়ে এসেছেন। সুদূর বিদেশে নিজের গ্রামের লোকের সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে পরস্পর দেখা হওয়া—এ যাদের ভাগ্যে না ঘটেছে তারা এর দুর্লভ আনন্দের এক কণাও উপলব্ধি করতে পারবে না।
বিশেষ করে এরা কখনো বিদেশে বেরোয়নি, এই সবে বিদেশে পা দিয়েই এ ধরনের ঘটনা।
খুড়িমা একগাল হেসে বললেন—ওমা, আমি কোথায় যাব! তুমি কবে এলে গা?
বুধোর মা বললে—কী ভাগ্যি করে’লাম বামুন-দিদি! তিথিস্থানে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে কী আশ্চর্যি কাণ্ড! কবে এলেন বামুন-দিদি?
পরস্পর আলাপ-আপ্যায়নের পর বিস্ময়ের প্রথম বেগ কেটে গেলে সবাই পরামর্শ করে ঠিক করলে, এখন থেকে ওরা একসঙ্গে থাকবে সবাই। সেদিন একই ধর্মশালায় সবাই গিয়ে উঠল, মন্দির দর্শন করলে, পরদিন সকালে একত্র গোরুরগাড়িতে খণ্ডগিরি উদয়গিরি যাত্রা করলে।
এর পরবর্তী ইতিহাস খুড়িমা বা তাদের অন্যান্য সঙ্গীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা।
খুব সকালে রওনা হয়ে ওরা বেলা সাতটার সময় খণ্ডগিরি উদয়গিরির পাদদেশে বন-নিকুঞ্জে পৌঁছে গেল। খুড়িমা লেখাপড়া জানতেন, দু-একখানা মাসিক পত্রিকায় খণ্ডগিরির বিবরণও পড়েছিলেন। তিনি সঙ্গিনীদের সব বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। বুধোর মা কখনো পাহাড় দেখেনি জীবনে, এবার পুরী আসবার পথে বালেশ্বর ছাড়িয়ে পাহাড় প্রথম দেখে অবাক হয়ে যায়। উদয়গিরি-আরোহণ ওর জীবনে এই প্রথম পাহাড়ে ওঠা।
খুড়িমার মুখে এ গল্প শুনতে শুনতে আমি চোখ বুজে অনুভব করবার চেষ্টা করছিলুম—মাত্র একদিন আগে যে উদয়গিরির নির্জন বনভূমিতে আমি আমার
এক সাহিত্যিক বন্ধুর সঙ্গে অমনি এক সুন্দর মেঘমেদুর প্রভাতে বসে বসে বনবিহঙ্গ-কাকলির মধ্যে বহুশতাব্দী-পারের সংগীত শুনেছিলুম—সেখানে গিয়ে বুধোর মায়ের মনের সে ভার্জিন আনন্দ।
সমতল পাষাণচত্বরের মতো শৈলশিখর, যেন প্রকৃতির তৈরি পাষাণবেদি। কত বন্য লতাপাতা, কুচিলা গাছের জঙ্গল, কত গুহা, কত কারুকার্য, কত যক্ষ-যক্ষিনী, কত নাগ-নাগিনী, পাষাণে পাষাণে মৌন অতীতের কত মুখরতা।
বুধোর মা বলে উঠল—কী চমৎকার পাথরে বাঁধানো ঠাঁই বামুনদিদি! আমাদের গাঁয়ে শুধু কাদা আর ধুলো! কত ভাগ্যি করলি তবে এসব জায়গায় আসা যায়! আচ্ছা, ওসব ঘরের মতো তৈরি করেছে কারা পাহাড়ের গায়ে?
–মুনিঋষিদের গুহা।
-–মুনিঋষিদের কী বললে বামুনদিদি?
—গুহা। মানে, থাকবার ফোকর।
—কে করেছে এসব? গবরমেন্টো?
—সেকালের রাজরাজড়ারা তৈরি করেছেন।
—এসব দেখলি চোখ জুড়োয় বামুনদিদি। কখনো দেখিনি এসব। পিরথিমে যে এমনসব জিনিস আছে তা কখনো জানতাম না। জানবই বা কী করে, চেরকাল বাঁশবন ডোবা আর গোরুর গোয়াল এই নিয়ে আছি!
নামবার পথে একটি ফর্সা স্ত্রীলোককে একটি ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওরা সেখানে গেল। খুড়িমা বললেন—আপনার এখানে ঘর?
স্ত্রীলোকটি উড়িয়া ভাষায় বললে—হ্যাঁ, নিজের ঘর। তোমরা কোথায় যাবে?
–রথ দেখতে এসেছি বাংলা দেশ থেকে। এখানে খাবার কিছু পাওয়া যায়?
—আমি মুড়ি বিক্রি করি। আর আচার আছে—লঙ্কার, আমের, কুলের।
—কীরকম আচার দেখি?
স্ত্রীলোকটি ঘরের ভিতর থেকে যা হাতে করে এনে দেখালে, সে কতকগুলো নুন-মাখানো আমের টুকরো এবং কুল। খুড়িমা বা তাঁর সঙ্গিনীরা সেসব পছন্দ করলে না। পথে আসবার সময় খুড়িমা বললেন—ওমা, ওর নাম নাকি আচার! আমসি আর শুকনো কুল, ওর নাম নাকি আচার! এখানে আচার তৈরি করতে জানে না বাপু।
বুধোর মা তো আচার দেখে তখন হেসেই খুন হয়েছিল। বললে—না-একটু তেল, না-একটু গুড়, না-দুটো মেথি কী কালোজিরে। আচার বুঝি অমনি হয়? আপনারা যেমন খান, আমাদের তো তা কিছুই হয় না, তাও ওদের চেয়ে ভালো হয়।
ভুবনেশ্বর স্টেশনে বিকেলে ওরা এল পুরী প্যাসেঞ্জারের জন্যে।
ট্রেনের তখনও দেরি। দক্ষিণ দিক থেকে সমুদ্রের অবাধ হাওয়া বইছে প্ল্যাটফর্মে। শেষরাত্রে উঠে ভুবনেশ্বর যেতে হয়েছিল, বুধোর মা ঘুমিয়ে পড়ল সেখানে কাঁথা পেতে। দু-ঘণ্টা পরে ওদের প্রথম সমুদ্রদর্শন হল পুরীতে। আষাঢ় মাসের দিন, তখনও সন্ধ্যা হয়নি।
পাণ্ডা বললে—দেখুন মা–
বুধোর মা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সমুদ্রের ধারে। নীল সমুদ্র ধু-ধু করছে যতদূর চোখ যায়! ফেনার ফুল মাথায় বড়ো বড়ো ঢেউ এসে আছাড় খেয়ে পড়ছে বালুবেলায়। দক্ষিণে বামে সামনে অকূল জলরাশি। খুড়িমা, বোষ্টম-বউ, বুধোর মা সকলেই নির্বাক নিস্পন্দ। খুড়িমার যেন কান্না আসছে। কতক্ষণ পরে ওদের চমক ভাঙল। বুধোর মা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে—ই কী কাণ্ড বামুনদিদি! এমন কখনও ঠাওর করিনি গাঁয়ে থাকতি!
খুড়িমা বললেন—তাই বটে।
বুধোর মা বললে—উঃ রে জল!
খুড়িমা বললেন—তাই।
কেউই চোখ ফেরাতে পারছিল না সমুদ্রের দিক থেকে। ভেবে ভেবে বললে বুধোর মা—আচ্ছা বামুনদিদি, ওপারে কী গাঁ?
খুড়িমা বললেন—ওপারে? ওপারে—এ-এ লঙ্কাদ্বীপ।
—রাম-রাবণের সেই লঙ্কা, বামুনদিদি?
—হ্যাঁ।
—কী কাণ্ড! অ্যাদ্দিন মরছিলাম ডোবায় আর বাঁশবনে পচে, কত কী দ্যাখলাম!
—চলো সব, এখুনি গিয়ে মন্দিরে ঠাকুরদর্শন করে আসি।
জগন্নাথ বিগ্রহ ও বিরাট মন্দির দেখে সবাই অত্যন্ত খুশি। রাত সাড়ে নটার পরে জগন্নাথ বিগ্রহের সিঙার-বেশ হবে শুনে ওরা সকলে মন্দিরের অন্য অনেক মেয়েদের সঙ্গে বসে রইল। একটি বৃদ্ধার সঙ্গে খুড়িমার খুব আলাপ হয়ে গেল। তাঁর বাড়ি হুগলি জেলার সিঙ্গুরের কাছে কামদেবপুর। বাড়িতে তাঁর দুই ছেলে চাষবাস দেখে, তাদের ছেলেপুলে অনেকগুলি, মস্ত সংসার। বৃদ্ধার ভালো লাগে না সংসারের গোলমাল, বছরের মধ্যে চার-পাঁচ মাস পুরীতে প্রতিবৎসর কাটিয়ে যান। ভগবানের কথা, গীতার কথা ইত্যাদি বলতে ও শুনতে খুব ভালোবাসেন। মন্দিরে কোনো এক সাধু এসেছেন, রোজ সন্ধ্যায় গীতার ব্যাখ্যা করেন, সেসব শুনলে মানুষের মন আর ছোটো জিনিস নিয়ে মত্ত থাকতে পারে না। কাল খুড়িমার সময় হবে কী, তাহলে সিংহদরজার কাছে তিনি দাঁড়িয়ে থাকবেন, নিয়ে যাবেন সেই সাধুর কাছে ওঁকে বা ওঁর সঙ্গিনীদের।
