পৌঁষ মাসে আমার নতুন কেনা জমিতে সামান্য কিছু ধান হল। আমার ধান রাখবার জায়গা নেই। সকলে বললে, বুধোকে বলুন, ওর গোলায় জায়গা আছে। তবে ওর মা—
বুধোর মাকে গিয়ে বললাম সোজাসুজি—ওগো, আমাদের দুটো ধান রাখবে তোমার গোলার?
—আমার গোলায় জায়গা কোথায় বাবাঠাকুর? কতডি ধান?
—বিশ চার পাঁচ। রেখে দিতেই হবে। নষ্ট হয়ে যাবে ধান তোমার গোলা থাকতে?
বুধোর মা হেসে বললে—তা রেখে দিয়ে যাও। তবে চোর কী হঁদুরে ধান নষ্ট করলি আমারে দায়িক হতি হবে না তো?
হায় কালীপদ দাদু, তুমি বেঁচে থাকলে হয়তো ওর হাসিটা এত বয়সেও মাঠে মারা যেত না। ভালো করে চেয়ে দেখে মনে হল এখনও ওকে বুড়ি বলা চলে না—অন্তত বুড়ি বলতে যা বোঝায় তা ও নয়। বেশ দোহারা চেহারা, লম্বা আঁটসাঁট গড়নের একটা আভাস আসে বটে, কিন্তু তা নয়, ঢিলেঢালা হয়ে গিয়েছে শরীর। তবে মুখের চেহারা এখন আশ্চর্য রকমের ভালো—এত বয়সেও। গর্ব ও তেজ ওর চালচলনে, চোখের দৃষ্টিতে, হাত-পা নাড়ারভঙ্গিতে।
খুব বড়ো জমিদারি থাকলে ও দাপটের ওপর জমিদারি চালাতে পারত রানি চৌধুরানির মতো। হয়তো ক্যাথেরিন দি গ্রেট কিংবা এলিজাবেথ হতে পারত রাজ্য-সাম্রাজ্যের অধীশ্বরী হলে। লুক্রেজিয়া বর্জিয়ার মতো নিষ্ঠুর আলো ওর চোখে এখনও খেলে—চোখ দেখে মনে হয়।
কিন্তু আমার ওপর ও কেন এত প্রসন্না হয়ে উঠল কে জানে। আমার ধানগুলো গোলায় তোলবার সময় চমৎকার করে গোবর দিয়ে লেপাপোঁছা উঠোনে দু-দশটা ধান যা ছড়িয়ে পড়েছিল, নিজের হাতে ঝাড়ন দিয়ে ঝাঁট দিয়ে, খুঁটে খুঁটে তুলতে লাগল। বললে—এ সব গোলায় তুলে রাখো বাবাঠাকুর, লক্ষ্মীর দানা নষ্ট করতি আছে! তুলে রাখো যত্ন করে। দাঁড়াও, আরো দুটো ইদিকে ছড়িয়ে আছে— পোড়ারমুখখাগুলো কী করে যে ধান তোলে, সব ঠেলামারা কাজ। মন দিয়ে কী কেউ কাজ করে এ বাজারে!
অনেকদিন পরে আবার ওকে দেখে ছেলেবেলাকার কথা মনে পড়ে। ভালোই লাগে।
আমি বললাম—তীর্থধর্ম করেছ?
বুড়ি জিভ কেটে বললে—সে ভাগ্যি কী আমার হবে বাবাঠাকুর?
—কেন, গেলেই হয়! পয়সাকড়ির যা হোক অভাব তো নেই।
—কে বললে বাবাঠাকুর? পাড়ার মুখপোড়া-মুখপুড়িরা আমার নামে লাগায়। পয়সা কনে পাব?
—দেখ, সে তোমার ইচ্ছে। আচ্ছা, এ গাঁ ছেড়ে কখনও কোথাও গিয়েছ?
–গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে’লাম কালীগঞ্জে।
—অড়ংঘাটার যুগলকিশোর দেখোনি?
—না বাবা। একবার ওপাড়ার বিনু ঘোষের শাশুড়ি ঘোষপাড়ার সতীমায়ের দোলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তা আমার পায়ে ফোড়া হয়ে সেবার যাওয়া ঘটল না অদেষ্টে। অনেকদিনের কথা, তখন আমার পঞ্চা চার বছরের। ক-বছর হল বাবা?
—তা হয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর।
—এবার কোথাও যাব ভাবছি বাবা। চিরজম্মাে কেটে গেল এই বাঁশবাগানের ডোবা আর গাঙের ঘাটে, আর মুচিপাড়ার মাঠ আর গোয়াল গোবর নিয়ে। এইবার একটু দেশ বিদেশডা দ্যাখব।
এর পরের ইতিহাসটা আমার সংগ্রহ করা বুধো মণ্ডলের শালির বড়ো ছেলে ও তার খুড়শাশুড়ির কাছ থেকে। আর ওপাড়ার খুড়িমার কাছ থেকে। আমি নিজে জ্যৈষ্ঠ মাসে পুরী থেকে এসেছি, চটক পাহাড়ের ওপাশের নির্জন সমুদ্রবেলায় ঝাউবনের সংগীত ও উদয়গিরি খণ্ডগিরির শ্যামশোভা, প্রাচীন যুগের তপস্বীদের আশ্রমগুলির ছবি আমার মনে যে স্বপ্ন এঁকে দিয়েছে তখনও তাতে বিভোর হয়ে আছি, এমন সময় ওবাড়ির খুড়িমা এসে বললেন—ওমা, পুরী থেকে চলে এলে তুমি, আমি যে যাচ্ছি রথ দেখতে!
—তা কী করে জানব খুড়িমা, চিঠি দিলেন না কেন পুরীর ঠিকানায়?
—তখন কী ঠিক ছিল বাবা? কাল বসে ঠিক করলাম। আমি যাব আর বোষ্টম বউ।
—আমার সঙ্গে যদি যেতেন! আপনারা কখনো পুরী যাননি, বিদেশেও বেরোননি, একা যাওয়া এতদূর! বিপদে না-পড়েন!
—তুমি বাবা তোমার জানাশোনো লোককে চিঠি লিখে দাও। পাণ্ডাদেরও চিঠি লেখো।
সব বন্দোবস্ত করে চিঠিপত্র দিয়ে গ্রামসম্পর্কের খুড়িমাকে পুরীতে রওনা করে দিলাম। দিন পনেরো কেটে গেল।
একদিন কুমোরপাড়ার পথ দিয়ে বিকেলে আসছি, হঠাৎ সামনে পড়ে গেল বুধো মণ্ডল। আমি বললাম—কী রে, তোর মা ভালো আছে?
—প্রাতোপেন্নাম। আজ্ঞে বাবু, মা তো ছিক্ষেত্তর গিয়েছে।
—সে কী! তোর মা গিয়েছে? কই জানিনে তো? কার সঙ্গে?
—আমার শালির ছেলে আর এক খুড়শাশুড়ি গেল কিনা রথে, তাদেরই সঙ্গে।
—তা তো শুনিনি। ওপাড়ার খুড়িমা, মানে রামের মা, আর শশী বৈরাগীর স্ত্রী ওরা গেল সেদিন। ওরা একসঙ্গে
—সে বাবু আমরা শুনিনি। তা হলে তো ভালোই হত।
—কিন্তু যোগাযোগ ঠিকই ঘটেছিল। ভুবনেশ্বরের বিন্দু সরোবরের তীরে বাঁধাঘাটের সোপানে খুড়িমা সিক্তবসনে কাপড় ছাড়বার ব্যবস্থা করছেন, হঠাৎ অল্পদূরে কাকে দেখে তিনি অবাক হয়ে সেদিকে চেয়ে রইলেন। পাশেই ছিল বোষ্টম-বউ, তাকে বললেন—হ্যাঁগা বোষ্টম বউ, ও কে দেখো তো? আমাদের গাঁয়ের বুধোর মা না?
শশী বৈরাগীর বউ চোখে কম দেখে। সে বললে—না মা ঠাকরুন, বুধোর মা এখানে কন থেকে আসবে? আপনি যেমন—!
–এগিয়ে দেখোনা বউ, আন্দাজে মারলে হয় না। ও ঠিক বুধোর মা, যাও গিয়ে দেখে এসো।
বুধোর মা হঠাৎ সামনে স্বগ্রামের বোষ্টম-বউকে দেখে হাঁ করে রইল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলে না।
বোষ্টম-বউ এগিয়ে বললে—বলি দিদি নাকি? ওমা, আমার কী হবে! তাই বামুন-মা বললে—
বুধোর মায়ের আড়ষ্ট ভাব তখনও কাটেনি। বললে—কে?
বামুন-মা আমাদের। রামবাবুর মা। ওই যে ভিজে কাপড় ছাড়ছেন ওখানে–
