মুক্ত! মুক্ত! সে মুক্ত!
তবু নিজেকে সে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করিতে পারিল না—স্থির হইয়া এক জায়গায় দাঁড়াইতে পারিল না। কী জানি যদি লোকজন আসিয়া আবার তাকে ধরিয়া লইয়া গিয়া পাঁচিল ঘেরা বড়ড়া বাড়িটায় পুরিয়া রাখে!
বহু ঘুরিয়া পরে সে ক্লান্ত হইয়া একটা গাছতলায় রাত্রির জন্য আশ্রয় লইল। সে শুইয়া পড়িল একেবারে কোনোদিকে লোক নাই, তবু সে ভালো ঘুমাইতে পারিল না। যখন ঘুম ভাঙিল, তখন ভোর হইয়াছে। সে চলিতে আরম্ভ করিল। দুপুর পর্যন্ত দিকভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক কতদিক ঘুরিতে ঘুরিতে একটা গাছের তলায় দাঁড়াইয়াছে, হঠাৎ তাহার মনে হইল দূরে যে বড়ো রাস্তা চলিয়া গিয়াছে, যার দু-ধারে বড়ো বড়ো গাছের ছায়া—ওই রাস্তা সে ইতিপূর্বে আর একবার দেখিয়াছে!
সেদিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া থাকিতে থাকিতে তাহার মনে পড়িল—অদ্ভুতভাবে পুরোনো স্মৃতিটা মনে পড়িল হঠাৎ।
ওই রাস্তাটা দিয়াই তাহাদের একটা বড়ো দলের সঙ্গে সে আসিয়াছিল মাসখানেক আগে! সেই রাস্তাটা!
বুধী ছুটিয়া গিয়া বড়ো রাস্তাটায় উঠিল। হাঁ, ঠিক চিনিতে পারিয়াছে, সেই রাস্তাটাই তো! কোনো ভুল নাই। সে অভিভূতের মতো দাঁড়াইয়া রহিল–মুক্তি মিথ্যা, এত প্রচুর নরম কচি ঘাস মিথ্যা, নীল আকাশের তলায় বড়ো বড়ো মাঠের নিরঙ্কুশ, নিরাপদ নির্জনতা আর হু-হু উন্মুক্ত হাওয়া সব মিথ্যা—যদি সে তাহার আজন্ম সুপরিচিত সেই গ্রামটিতে না-ফিরিতে পারে, ছোট্ট খুকির দুটি ছোট্ট স্নেহ হস্তের স্পর্শ পুনরায় সে না-পায়!
জীবনপণ—বুধী যে করিয়াই হউক, তাহার গ্রামে তাহার খুকির কাছে ফিরিয়া যাইবেই।
একটা পথচলতি গোরুরগাড়ি হইতে একটা বিচুলির আঁটি পড়িয়া গেল-বুধী গিয়া সেটা মুখে তুলিয়া লইল। শুধুই একেঘেয়ে সবুজ ঘাস খাইতে কী মুখে লাগে? মাঝে মাঝে এই ধরনের সুখাদ্য খাইয়া মুখ বদলাইয়া লইতে হয় বই-কী! তারপর বুধী সোজা রাস্তা বাহিয়া চলিল—এক দিন, দু-দিন, তিন দিন। খাদ্যের ভাবনা নাই—দু-ধারে মাঠ সবুজ হইয়া উঠিয়াছে, নববর্ষায় সুন্দর নিবিড় সবুজ ঘাসে ও আউশ ধানের জাওলায়। আমন ধান আজও রোয়া হয় নাই। জলেরও নাই অভাব, রাস্তার দু-দিকের খানায় প্রচুর টাটকা বৃষ্টির জল।
যাইতে যাইতে একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটিল। একটা গাছতলায় দুপুরবেলা সে বিশ্রাম করিতেছে—একটা ছেলে আসিয়া গলায় দড়ি বাঁধিয়া তাহাকে লইয়া চলিল হঠাৎ। বুধী তো অবাক!
ছেলেটি তাহাকে একটি গ্রামের মধ্যে একটি খড়ের ঘরে—সেখানে লইয়া গিয়া খুঁটির গায়ে বাঁধিল। বাড়িতে তখন কেহ নাই—ছেলেটিও কোথায় চলিয়া গেল। বুধী লক্ষ করিল একজন বৃদ্ধ স্ত্রীলোক ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আপনমনে কী বকিতেছে আর দুলিতেছে। বাড়ির উঠোনে একটি খেজুর গাছ, একটা পেয়ারা গাছ, বাড়ির পেছনে একটা ডোবা। একটু পরে একটা বউ ডোবা হইতে একরাশ বাসন মাজিয়া আনিয়া দাওয়ার এক কোণে নামাইয়া বৃদ্ধাকে বলিল—তুমি একটু চুপ করবে কিনা সকালবেলা, আমি জিগ্যেস করি! বাড়ির সবাই পাগল, পাগলা গারদের মধ্যে থেকে আমার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেচে, আর পারিনে বাবু, মরণ হলেও বাঁচতাম! ফের তুমি যদি ওরকম বকবে মা, তবে হাঁড়িকুড়ি থাকবে পড়ে, ভাতের পিণ্ডি কে খেতে দেয় দেখব এখন আজগে! এই সময় বুধীর দিকে নজর পড়িতে বউটি বলিল— ছেলেটা বুঝি গোরুটা এনেচে তা হলে! বাবা, কাল থেকে কী কম খোশামোদটা করছি ওকে! গোরুটা হারাল, দেখ কোথাও কেউ পন্টে পাঠালে, কী কেউ বেঁধে রাখলে—তা আমার কথা কি কেউ-গোরুটারও হাল হয়েছে দেখো–
কথা বলিতে বলিতে তাহার সামনে আসিয়া বউটি বলিয়া উঠিল—এ তো আমাদের নয়!…কার আবার পরের গোরু ধরে এনেচে দ্যাখো! নাঃ ছেলেটাকে নিয়ে আর পারিনে— এ যেন মনে হচ্চে ও-পাড়ার ভুবনের মা-র গোরু—মাগি এসে আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করবে এখন, যদি টের পায়—
বউটি তার গলার দড়ি খুলিয়া তাহাকে কিছুদূর তাড়াইয়া উঠোনের বাহির করিয়া দিল— সম্ভবত এইজন্য যে, ভুবনের মা এখন হঠাৎ আসিয়া পড়িলে, গোরু যে এখানেই বাঁধা ছিল, ইহার কোনো চিহ্ন না-পায়।
গ্রামের বাহিরে এক জায়গায় প্রকাণ্ড বড়ো একটা গাছ। গাছের তলায় সে একটু দাঁড়াইল। চারিদিকে মাঠ, কচি কচি আউশের জাওলায় মাঠ ঘনসবুজ, বুধীর ভয়ানক লোভ হইল, মাঠে নামিয়া সে ধানগাছ খায়—কিন্তু বিদেশবির্ভুই জায়গা, যদি এখানে পাউন্ডঘরে দেয়—তবে কে আসিয়া পয়সা দিয়া তাহাকে উদ্ধার করিবে? না—সে কোথাও আর আবদ্ধ থাকিতে চায় না। উঃ, বুকের রক্ত হিম হইয়া যায়, এখনও সেই বড়ো বাড়ি, সেই উঁচু পাঁচিল, সেই গরাদওয়ালা কাঠরা, সেই বিশ্রী আওয়াজ—সকলের ওপর, সেই রক্তের গন্ধের কথা মনে উঠিলে…!
মুক্তির আনন্দ আজ নবযৌবনের সঞ্চার করিয়াছে বুধীর দেহে সে ভুলিয়া গিয়াছে তাহার বয়েস আঠোরো-উনিশের কম নয়—সে প্রৌঢ়, সাত-আটটি সন্তানের জননী, তার ওপরে গত পনেরো-কুড়ি দিনের উদবেগে, কষ্টে, উপবাসে শীর্ণদেহা…তার স্নায়ুতন্ত্রীও ছিন্নভিন্ন হইয়া গিয়াছে— তার মনে বল নাই—শরীরে সামর্থ্য নাই…
কিন্তু উদার নীল আকাশে প্রভাতের সূর্য উঠিয়াছে, যেমন উঠিত তাহার জন্মভূমিতে। পাখিরা কলধ্বনি করিতেছে, যেমন করিত তাহাদের নদীর ধারের মাঠের অনেক দিনের সেই পক্ষী বন্ধুটি। বাঁশতলায় প্রথম বর্ষার জলে পুষ্ট হইয়া পিপুললতা বাড়িয়া উঠিয়াছে, অনন্তমূলের চারা বাহির হইয়াছে, গ্রামে গ্রামে ‘বউ কথা-কও’ পাখির সেই সুন্দর আবাল্য পরিচিত ডাক… সম্মুখে অনেক দূরে কোথায় তাহাদের গ্রামখানি, ছোট্ট নদীটা—সুগন্ধি অনন্তমূলের কচি পাতার কী চমৎকার আস্বাদ!…এই তো জীবনকে সে আবার খুঁজিয়া পাইয়াছে—কতকালের পরে মুক্তি আসিয়াছে…এখন মরিলেও তার দুঃখ নাই—শিয়াল-শকুনে তার জীর্ণ দেহটা খাইয়া ফেলিলেও দুঃখ নাই—তবে ছোট্ট খুকিটাকে একবার দেখিয়া সে মরিবে—
