আবার সে রাস্তা খুঁজিয়া বাহির করিল—এই মাঠের ধারেই একদিন তাহার দলের সঙ্গীদের সঙ্গে এই গাছতলায় রাত্রে শুইয়াছিল বটে। যাহারা তাহাদের তাড়াইয়া আনিতেছিল, এই গাছতলাতেই তাহারা রাত্রে রাঁধিয়া খাইয়াছিল।
আবার পথ…চলিয়াছে, চলিয়াছে…পথের শেষ নাই—প্রভাত দুপুরে পরিণত হইল— দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইল। ক্ষুধা পাইয়াছিল, এক জায়গায় পথের ধারে ছোটো বিল—বিলের ধারে ভারি চমৎকার সবুজ ঘাস। বুধীর লোভ হইল—সে রাস্তা হইতে নামিয়া বিলের ধারে গেল—নরম কচি ঘাসে মুখ ডুবাইয়া সে গোগ্রাসে গিলিতে লাগিল।
বিলের ধারে আরও কয়েকটি গোরু চরিতেছিল।
একজন বলিল—এ বুড়ি কোত্থেকে এসে জুটল হে! একে তো চিনিনে!
আর একজন বলিল—চেহারা দেখো না—যেন কসাইখানার ফেরতা! হাড় পাঁজরা গুনে নেওয়া যাচ্ছে! মরি মরি, কী যে রূপ! বলি ওগো, তোমার বাড়ি কোথায়?
ইহারা বুধীর সন্তানের বয়সি, ইহাদের ফাজলামি তাহার ভালো লাগিল না। সে কথার কোনো উত্তর না-দিয়া গম্ভীর মুখে আপনমনে ঘাস খাইতে লাগিল। নিজের মান নিজের কাছে। তাহাতেও নিস্তার নাই। বেয়াদব ছোকরা আগাইয়া আসিয়া বলিল—বলি, কথা বলছ না কেন বুড়ি? কসাইখানা থেকে পালিয়ে আসচ নাকি? এমন চেহারা কেন? হঠাৎ বুধীর ভয় হইল। কসাইখানা কী জিনিস? পলাইয়া তো আসিয়াছেই বটে—আর সে সেখানে দাঁড়ানো নিরাপদ মনে করিল না। লোভনীয় কচি ঘাসগুলি ফেলিয়া ছুট দিয়া রাস্তার ওপর আসিয়া উঠিল।
পিছন হইতে একজন বলিয়া উঠিল—আরে বাবা, কোথাকার অসভ্য জানোয়ার! ভদ্রলোকের কথার উত্তর দিতে হয় তাও জানে না!
চলিতে চলিতে একদিন বুধী কী করিয়া বুঝিতে পারিল সে ভুল পথে চলিতেছে। এ রাস্তা বাহিয়া এতদূর সে আসে নাই। মাঠের মধ্যে একটা কাঁচা রাস্তা কোথা দিয়া যেন নামিয়া গিয়াছিল—সেই মেটে রাস্তা দিয়া আসিয়া সেবার তাহাদের দল উঠিয়াছিল বড়ো রাস্তাটায়। বুধী ঠিক ঠাহর করিতে পারে নাই, কোথায় সেই মেটে রাস্তা বড়ো রাস্তা হইতে নামিয়া গিয়াছে।
ঠিক তাহাই ঘটিল। সম্মুখে একটা নদী পড়িল। এ নদী সে দেখে নাই। সে পথ ভুল করিয়াছে।
সে বড়ো রাস্তা হইতে নামিয়া পড়িল—মাঠের মাঝখান বাহিয়া কত সরু সরু রাস্তাই চলিয়াছে—এর একটাও পূর্ব পরিচিত নয়। কতকগুলি গন্ধ ও কতকগুলি বিশেষ ছবি বুধীর মনে আছে সেই আগের রাস্তাটা সম্পর্কে। সে ছবি ও গন্ধের সঙ্গে এ রাস্তা খাপ খাইতেছে না। একটা প্রকাণ্ড মাঠের মধ্যে সে ক্রমে আসিয়া পড়িল। দিশাহারা হইয়া গিয়াছে সে। আর কোনো কিছুরই ঠিক নাই তার। এসব জায়গায় কখনো সে আসে নাই, এসব পথে হাঁটে নাই।
মাঠের মধ্য দিয়া অন্যমনস্কভাবে উদভ্রান্তের মতো চলিতে চলিতে হঠাৎ ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনিয়া চমকিয়া পাশের দিকে চাহিল। একটা মস্ত বড় কালকেউটে ফণা বিস্তার করিয়া দুলিতেছে। ছোবল মারিবার দেরি, চক্ষের পলকমাত্র—বুধী থমকিয়া দাঁড়াইয়া বিদ্যুৎবেগে পিছু হটিয়া আসিল-পরক্ষণেই দৌড় দিল খানা, ডোবা, পগার ভাঙিয়া। কেউটেটা কিছুদূর তাহার পিছু পিছু আসিয়া একটা কাঁটাঝোপে আটকাইয়া থামিয়া গেল।
কাঁটাঝোপের ওপাশেই ছোট্ট ডোবাতে দুটি ছেলে-মেয়ে ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরিতেছে। বুধী হুট-পাট করিয়া তাহাদের সামনে গিয়া পড়িতেই তাহারা ছিপ ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বুধী মানুষ দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল অনেক আগেই। সাপটা দেখা যায় না পিছনে, চকিতে পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল।
মেয়েটি ছেলেটির হাত চাপিয়া ধরিয়া বড়ো বড়ো ভয়ার্ত চোখে বুধীর দিকে চাহিয়া বলিল— ও দাদা, গুঁতিয়ে দেবে—কাদের গোরু!
আহা, তাদের গ্রামের তার সেই খুকিটির মতো। স্নেহে বুধীর মন গলিয়া গেল। বুধী বলিতে চাহিল—গুঁতিয়ে দেব কেন, খুকি—সোনা আমার, মানিক আমার আমি কিছু বলব না—ভয় কী? ধরো, তোমরা মাছ ধরো!
ছেলেটি ছিপ উঁচাইয়া মারিবার ভঙ্গিতে বলিল—যাঃ, বেরো যাঃ—এ আপদ কোথা থেকে এসে জুটল আবার—যাঃ যাঃ–
বুধীর ইচ্ছা ছিল দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ওদের মাছ ধরা দেখে—খুকিটাকে দেখে। কিন্তু খুকির দাদা ছিপ গুটাইয়া দাঁড়াইয়া আছে, মারিবে বোধ হয়। সেখান হইতে সে সরিয়া পড়িল।
নিকটে একটা গ্রাম। কাহাদের বাড়ির উঠোনে প্রকাণ্ড এক বিচালির গাদা। উঠানে বড়ো বড়ো নাদায় কতকগুলি গোরু খোল-মাখা বিচালি ও ভূষির জাব খাইতেছে। প্রকাণ্ড নাদাগুলি হইতে উথিত সুমিষ্ট খোলের গন্ধে বুধীর জিহ্বা জলসিক্ত হইয়া উঠিল। শুধু ঘাস আর জল, জল আর ঘাস…সেখানে সেই বড়ো বাড়িটাতে বন্দিশালায় থাকিবার সময় শুকনো বিচালি খাইয়া মরিয়াছে কতদিন।
খোল-মাখানো জাব কতকাল সে যে খায় নাই! বুধীর বড়ো লোভ হইল—সে দেখিল একটা ছোটো নাদায় দুটি বাছুর জাব খাইতেছে। এই তাহার সুযোগ সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে—উঠোনটাতে লোক নাই—অন্ধকারও বেশ ঘন। বুধী চট করিয়া বাছুরের পাশে আসিয়া নাদাটাতে মুখ ডুবাইয়া খাইতে আরম্ভ করিল। আ:, কত কাল পরে খোল-মাখা জাবের আস্বাদ আবার সে পাইল!…
ছোটো বাছুরটা বিস্মিত ও ভীত হইয়া ডাকিল—মা—আ–আ! কে এসে খাচ্ছে দেখো–
কিছুদূরের নাদাটা হইতে মুখ তুলিয়া তাহার মা বুধীকে দেখিতে পাইয়া বলিল —কে রে? দূর হ—দূর হ আপদ–
কথা শেষ করিয়াই বাছুরের মা শিং নাড়া দিয়া বুধীকে গুঁতাইতে আসিল। বুধী তখন মাত্র কয়েক গ্রাস খাইয়াছে—ভয়ে সে খাওয়া ফেলিয়া দৌড় দিল।
একটা বড়ো গোরু বলিয়া উঠিল—আস্পর্ধা দ্যাখ না ভিখিরিটার! …
