বুধী রক্তের গন্ধ পায় কেন এখানে! সন্দেহের সহিত সে চারিদিকে চাহিয়া দেখিয়াছে, কিছু টের পায় নাই, তবে দূর হইতে রক্তের গন্ধ ভাসিয়া আসে তাহা সে বেশ বুঝিতে পারে।
প্রথম প্রথম তাহার মনে হইত—এও একরকমের পাউন্ডঘর—একদিন বুড়ির ছেলে আসিয়া তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইবে। কিন্তু পাউন্ডঘরের অভিজ্ঞতা হইতে বুধী জানে যে, সেখানে একদিন বা বড়োজোর দু-দিন থাকিতে হয়—তার পরেই বুড়ির ছেলে আসিত দড়ি হাতে তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইতে। আর এখানে আসিয়াছে আজ পাঁচ-ছ-দিন কী তারও বেশি—না, পাউন্ডঘর নয়, তার চেয়েও গুরুতর বিপদে এবার সে পড়িয়াছে!
দিনের পর দিন কাটিতে লাগিল। আর একটা জিনিস বুধী লক্ষ করিয়াছে আজ ক-দিন। প্রতিদিন বৈকালে দুজন লোক আসিয়া এই গোরুর ভিড়ের মধ্যে বাছিয়া বাছিয়া কয়েকটি গোরুর গায়ে কী কী ছাপ মারিয়া যায়—পরদিন শেষরাত্রের দিকে সেই গোরুগুলিকে কোথায় যেন লইয়া যায়—তারা আর ফেরে না।
কেন ফেরে না, কোথায় যায় তারা?
আর ওই রক্তের গন্ধটা…তাজা রক্তের গন্ধ! যেদিন বাতাস ওই কোণ হইতে বয়, সেদিন রক্তের গন্ধটা আসে। ভয়ে সন্দেহে বুধীর বুক উড়িয়া যায়। সাথি ছোটো খুকি…কতদিন তোমাদের সাথে দেখা হয় নাই, বন্ধু হিসাবে আসিয়া এ বিপদ হইতে উদ্ধার করো! এমন বিপদে জীবনে কখনো সে পড়ে নাই!
এইসব সাত-পাঁচ ভাবিয়া বুধীর রাত্রে ভালো ঘুম হইল না। এদিকে সকাল বেলা হইতেই চারিধারে বিকট আওয়াজ শুরু হইল। বুধীর সঙ্গেই একটি অল্পবয়স্ক প্রতিবেশী আজ কয়েক দিন ধরিয়া আছে, প্রথম প্রথম বুধী তাকে পছন্দ করিত না। সে যেন একটু বেশি চাল দেখাইতে চায়—বুধী পাড়াগেঁয়ে বলিয়া যেন তাহাকে আমল দিতেই চাহিত না। কিন্তু এ ভয়ংকর নির্বান্ধব স্থানে চাল ক-দিন খাটে? শীঘ্রই তাহার অল্পবয়স্ক প্রতিবেশীটিকে সমস্ত চাল বিসর্জন দিতে হইল।
একদিন বুধী দেখিল সে কাঁদিতেছে।
বুধীর মনে কষ্ট হইল। আহা ছেলেমানুষ! তাহার প্রথম সন্তান এতদিন ওই বয়সের হইয়াছে—বড়ো হইলে বুধী তাহাকে আর দেখে নাই! কে জানে কোথায় গিয়াছে! বাঁচিয়া আছে কিনা তাই-বা কে জানে?
সহানুভূতি প্রকাশ করিবার উপায় নাই। বুধীর ইচ্ছা হইল সঙ্গীটির সে গা চাটে। কিন্তু দুজনের মধ্যে তারের বেড়া। বুধী তবুও তাহাকে যতদূর সম্ভব সান্ত্বনা দিয়াছিল সেদিন। ছেলেমানুষ, বেশ নধর গড়ন, তবুও এই ভয়ানক স্থানে পেটভরিয়া না-খাইতে পাইয়া রোগা হইয়া গিয়াছে।
সেই হইতে দুজনে বেশ ভাব। আজ সকালে উঠিয়া বুধী তাহার দিকে চাহিয়া দেখিল, সে আবার খাইতেছে। ছেলেমানুষ, খাইবার লোভই বেশি।
খাওয়া শেষ করিয়া তাহার তরুণ বন্ধু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠিল—হাম্বা আ-আ!
বুধী বলিল—চুপ করো। ছি, মন খারাপ করো না। কিন্তু তাহার নিজের মন দিয়া তো বুঝিতেছে, কী দারুণ অশান্তিতে কাটিতেছে এখানে, তবুও ছেলেমানুষকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়াও ভালো।
বুধী বলিল—খাও খাও। যা পড়ে আছে, ও দুটি খেয়ে ফেলো। এমন সময়ে দুজন যমদূতের মতো লোক তাহাদের কাঠরায় ঢুকিল। বুধীদের কাঠরায় তাহারা প্রায় জন-কুড়ি আছে। এই কুড়িজনের অধিকাংশই প্রৌঢ়বয়স্ক। একজন তো আছে, বৃদ্ধের দলে তাকে অনায়াসেই ফেলা চলে।
এদের মধ্যে বুধীর বন্ধুটি অল্পবয়স্ক এবং বেশ নধর দেখিতে। যমদূতের মতো লোক দুটি তাহার গায়ে কি একটা ছাপ মারিয়া চলিয়া গেল—কাঠরায় আরও দুটি প্রৌঢ় সঙ্গীর গায়েও তাহারা ছাপ দিল। একটু পরে দুজন লোক আসিয়া কাঠরায় ঢুকিল এবং ছাপমারা সঙ্গীগুলিকে দড়ি খুলিয়া কোথায় যেন লইয়া গেল।
সকাল গড়াইয়া দুপুর, দুপুর গড়াইয়া বৈকাল হইয়াছে। বুধীর তরুণ বন্ধু ফিরিল। ছাপ-মারা-সঙ্গীদের কেহই ফিরিল না। বুধীর মনে ভয়ানক সন্দেহ হইল— সেই সঙ্গে কি একটা অজানা ভয়ে ওর গলা পর্যন্ত শুকাইয়া উঠিল। সেই রক্তের গন্ধ…টাটকা তাজা রক্তের গন্ধ…এখানে কোনাকুনি হাওয়া বহিলেই যেটা পাওয়া যায়—সেই গন্ধের কথা হঠাৎ মনে আসিতেই ভয়ে আতঙ্কে বুধীর সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। ভয়ে মরিয়া হইয়া সে গলার দড়িতে এক হেঁচকা টান মারিতেই সেটা গেল ছিঁড়িয়া।
বুধী উন্মাদের দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিল। কাঠরায় ঢুকিবার কাঠের মোটা গরাদে বসানো নীচু ফটকটা বন্ধ। নিকটে কেহ কোথাও নাই। পড়াগাঁয়ে সে ‘মানুষ’, উঁচু উঁচু বাঁশের বেড়া টপকানো তার আজীবন অভ্যাস—এক লাফে ফটকটা ডিঙাইয়া সে কাঠরার বাহিরে আসিল। তারপর বড়ো উঠান পার হইয়া বড়ো ফটকের নিকট পৌঁছিল—সেটাও খোলা। সে ছুটিতে ছুটিতে বড়ো ফটকটাও পার হইয়া গেল।
পরবর্তী পনেরো মিনিটের কথা তাহার ঠিক স্পষ্ট মনে নাই—চওড়া রাস্তা লোকের ভিড়—বড়ো বড়ো ধরনের গাড়ি রাস্তা দিয়া ছুটিতেছে—বড়ো বড়ো বাড়ি,–একটা খাল—একটা পুল—আরও লোকজন—একজোড়া মহিষ—সেই বিকট আওয়াজ সর্বত্র—দিশাহারার মতো ছুটিতে ছুটিতে বুধী রাস্তার পর রাস্তা পার হইতে লাগিল। কত রাস্তা—এদেশে রাস্তার কী শেষ নাই? আবার বাড়িঘর —আবার রাস্তা—দু-দু-বার সে গাড়ি চাপা পড়িতে পড়িতে বাঁচিয়া গেল! আবার বড়ো একটা পুল—দূরে রেলগাড়ি যাইতেছে—রেলগাড়ি সে চেনে—তাহাদের গ্রামে দক্ষিণ মাঠে ট্যাংরার ধানখেতের মধ্যে দিয়া বাঁধা উঁচু সড়ক বাহিয়া রেলগাড়ি যায়।
এখানে উপরে রেলরাস্তা—নীচে দিয়া রাস্তা—ছুটিয়া পুলের তলা দিয়া সে রেলরাস্তাও পার হইল।—আবার দৌড় দৌড়! বৃদ্ধ শরীর, সে হাঁপাইয়া পড়িল। যখন তাহার দিশেহারা ভাবটা কাটিয়া জ্ঞান ফিরিয়া আসিয়াছে, তখন সে দেখিল একটা জলার ধারে খুব বড়ো মাঠের মধ্যে সে একা দাঁড়াইয়া। সামনের প্রকাণ্ড জলাটি কচুরিপানায় বোঝাই, সেখান দিয়া পথ বন্ধ। আর ভিড় নাই, রাস্তার গোলকধাঁধা নাই, গাড়ির ঘড়ঘড় আওয়াজ নাই। এখানে অনেক দূর পর্যন্ত আকাশ দেখা যাইতেছে—হু-হু হাওয়া বহিতেছে জলার দিক হইতে…যেন তাহাদের গ্রামের নদীর ধারের মাঠের মতো।
