সে বেশ বোঝে এখানে কেহ তাহাকে ভালোবাসে না, যেমন সেই ছোটো খুকি তাহাকে ভালোবাসিত, যত্ন করিয়া খাওয়াইত, গলা ধরিয়া কত আদরের কথা বলিত।…কোথায় গেল ছোটো খুকিটা? কেন তাহাকে এখানে আনা হইয়াছে? কেন আনা হইয়াছে তাহা সে বুঝিতেই পারে না। কেবল সে এইটুকু জানে, কত দিন ধরিয়া দীর্ঘ কঠিন পথ বাহিয়া তাহাকে এখানে আসিতে হইয়াছে—সঙ্গে বহু সঙ্গী ছিল, কিন্তু অপরিচিত, কারো সঙ্গে বুধীর আলাপ হয় নাই তেমন, আলাপ করিবার মতো মনের অবস্থাও তাহার ছিল না।
কেহ যত্ন করিয়া তাহাকে খাওয়ায় নাই। এখানকার খাবার মুখে দিবার উপায় নাই। কেমন যেন ভ্যাপসা গন্ধ, ভালো আস্বাদ তো নাই-ই ভালো গন্ধ পর্যন্ত নাই খাবারের। বুড়ি তাহাকে যত্ন করিয়া খাওয়াইত, এ কথা অস্বীকার করিতে পারিবে না। হয়তো সে ছোটো খুকির মতো ভালোবাসিত না অতটা—কিন্তু সন্ধ্যার সময় পেটপুরিয়া খাইবার ব্যবস্থা করিতে কখনো ত্রুটি করে নাই।
সত্যি, এ যে কোন জায়গায় আসিয়াছে, তাহার আদৌ কোনো ধারণাই নাই। এমন অদ্ভুত ও ভয়ংকর জায়গা তার অভিজ্ঞতার বাহিরে ছিল এত দিন। কী হট্টগোল, নানারকম নতুন নতুন বিকট বিকট শব্দ জায়গাটাতে! তাহার মন আরও পাগল হইয়া উঠিল এ শব্দে ও আওয়াজে। জীবনে কখনো এত অদ্ভুত ধরনের সব আওয়াজ সে শুনে নাই। অথচ তাহার বয়স কম হয় নাই। বুধীর জীবন কাটিয়াছে এই বিশ্রী জায়গা হইতে বহু দূরে। কত দূর তাহার ঠিক ধারণা নাই, কিন্তু মোটের ওপর বহু বহু দূরে অন্য এক স্থানে, যেখানে অবারিত সবুজ মাঠ আছে, অপূর্ব সুঘ্রাণে ভরা কোমল সরস ঘাসে ঢাকা। কী সুন্দর স্বাদ সে ঘাসের! মাঠের ধারে কলস্বনা নদী, নদীর কিনারায় জলের ধার পর্যন্ত নানাজাতীয় ঘাসের ও জলজ শাকের বন—ঠান্ডা, নরম, তাজা—কী অপূর্ব তাদের সুগন্ধ! স্বাদ তো আছেই ভালো কিন্তু সেই নতুন-ওঠা বর্ষা-সতেজ কচি ঘাস ও কলমিলতার তাজা গন্ধের কথা যখনই মনে হয় তখন মনে পড়ে, একহাঁটু দীর্ঘ, ঘনশ্যাম তৃণরাজির মধ্যে মুখ ডুবাইয়া পেট ভরিয়া সে তৃপ্তির ভোজ—হু হু উন্মুক্ত বাতাস ও দূরপ্রসারী প্রান্তরের মধ্যে সে মুক্তির আনন্দ—তখন বুধী সত্যই ক্ষেপিয়া যায়—তাহার জ্ঞান থাকে না। মুক্তির জন্য সে উন্মাদ হইয়া উঠে। জীবনের বহুদিন সেখানে সে কাটাইয়াছে। বহুদিন। কত দিন তাহা সে জানে না, বয়স তো তার কম হয় নাই…প্রথম জীবনের কথা প্রায় কিছুই তাহার মনে নাই—যা একটু-আধটু মনে পড়ে—সব আবছায়া ধোঁয়া—কেবল খুব বড়ো বড়ো সবুজ মাঠ, তলায় ফল বিছিয়ে-থাকা বড়ো বড়ো গাছ, সুপেয় শীতল স্রোতের জল, সাঁজালের ধোঁয়ার মৃদু গন্ধভরা আবাসস্থান, এইসব মনে পড়ে।
আজকাল কিন্তু বেশি করিয়া মনে পড়ে ছোটো খুকির কথা—খুকি তাহাকে সত্যই ভালোবাসিত।
এটা কোন জায়গা? এক-একবার বুধীর মনে হয়, হয়তো-বা এটা পাউন্ডঘর। কিন্তু বুধী জীবনে তো কতবার পাউন্ড ঘরে কত বিনিদ্র রজনী যাপন করিয়াছে— এ ধরনের পাউন্ড ঘর তো দেখে নাই! সেখানে তো বাঁশের বেড়া ঘেরা খোলা জায়গায় তাহাকে থাকিতে হইয়াছে, মাথার ওপর সেখানে নীল আকাশ, সবুজ গাছপালাও চোখে পড়ে, পাখির ডাকও শুনা যায়—এমন বিশ্রী আওয়াজ তো সে সব জায়গায় শুনে নাই! এমন কঠিন ইটের দেয়াল দিয়া ঘেরা নয় সে জায়গা।
পাখির কথায় বুধীর মনে পড়িল অনেকদিন আগেকার এক ঘটনা। কতদিন আগে তাহা সে বলিতে পারিবে না, মাঠের ধারে সে ঘাস খাইতেছিল, একটা কী পাখি বনের ডাল হইতে উড়িয়া আসিয়া তাহার শিং-এর উপর বসিল। শিং-এর উপর পাখি বসা সে পছন্দ করে না— সুতরাং শিং নাড়া দিতেই পাখিটা উড়িয়া বসিল তাহারই সামনেকার উলুঘাসে ভরা বাচড়ার উপর। তখন উলুঘাসের শিষ গজাইয়াছে, শিষের মাথায় সাদা সাদা ফুল অজস্র অজস্র। পাখিটা সেই উলুফুলের মধ্যে বসিয়া পালক ফুলাইয়া পায়চারি করিতে লাগিল। কী সুন্দর গায়ের রং, কী নরম রঙিন পালকের বোঝা তার গায়ে, কেমন রঙিন ঠোঁটখানি!
বুধীর মন সুন্দর পাখিটার প্রতি ভালোবাসায় ভরিয়া গেল। সুতরাং খানিকটা পরেই যখন পাখিটা আবার তার শিং-এর উপর চড়িয়া বসিল, এবার সে শিং নাড়া দিল না। এইরকম করিয়া পাখিটার সঙ্গে তার ভাব জমিয়া গেল। পাখিটার ভাষা ছিল তার শিং-এর উপর চটুল পা দুইখানির নাচুনি—কত নির্জন রৌদ্রভরা দুপুরে বুধী হয়তো মাঠে দাঁড়াইয়া উত্তাপে ও তৃষ্ণায় ঝিমাইতেছে—অমনি ছোট্ট পাখিটা নিকটবর্তী বনভূমি হইতে উড়িয়া তাহার শিংএ আসিয়া বসিত। বুধীর নিঃসঙ্গতা অমনি দূর হইয়া যাইত—তাহাদের কত কথা কত গল্প চলিত সন্ধ্যা পর্যন্ত তারপর নামিত অন্ধকার। বুড়ি আসিয়া খোঁটা উপড়াইয়া তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইত—পাখি যাইত উড়িয়া। একদিন সেই মাঠে ফাঁদ পাতিয়া কাহারা পাখি ধরিতে আসিল। পোষা ডাহুকের ডাক শুনিয়া বন্য পাখিটা খাঁচার নিকটে যাইতেই ফাঁদে পড়িয়া গেল। শিকারিরা তাহাকে খাঁচায় পুরিয়া লইয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময়ে ছোটো পাখিটার কী করুণ আর্তনাদ!
মাঝে মাঝে বুধীর সন্তান হইত। বেশ ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলি ছুটিয়া, লাফাইয়া, নাচিয়া বেড়াইত সারা মাঠ। প্রথম প্রথম তাহাদের বড়ো ভালো লাগিত কিন্তু বড়ো হইয়া গেলে তাহারা কোথায় চলিয়া যাইত—তাহাদের কথা বুধীর আর বড়ো একটা মনে পড়িত না।
…কত কথাই মনে হয়। এই বিকট আওয়াজে ভরা নোংরা, কুশ্রী ইটের দেয়ালে ঘেরা এই জায়গায়—আজ কদিন আসিয়া সে মরিয়া যাইতেছে…আর একটা ব্যাপার…
