ড্রেসডেন চায়না নয়, অন্য কিছু নয়, সামান্য একটা পেয়ালা। হাজুর মনস্তুষ্টির জন্য বলিলাম—বেশ জিনিস, বাঃ—
ও উৎসাহ পাইয়া আমাকে ঘরের এজিনিস-ওজিনিস দেখাইতে আরম্ভ করিল। একখানা আয়না, একটা টুকনি ঘটি, একটা সুদৃশ্য কৌটা ইত্যাদি। এটা কেমন? ওটা কেমন? সে এসব কিনিয়াছে। তাহার খুশি ও আনন্দ দেখিয়া অতিতুচ্ছ জিনিসেরও প্রশংসা না-করিয়া পারিলাম না। এতক্ষণ ভাবিতেছিলাম, ইহাকে এ পথে আসিবার জন্য তিরস্কার করি এবং কিছু সদুপদেশ দিয়া জ্যাঠামশায়ের কর্তব্য সমাপ্ত করি। কিন্তু হাজুর খুশি দেখিয়া ওসব মুখে আসিল না।
যে কখনো ভোগ করে নাই, তাহাকে ত্যাগ করো যে বলে, সে পরমহিতৈষী সাধু হইতে পারে, কিন্তু সে জ্ঞানী নয়। কাল ও ছিল ভিখারিনি, আজ এ পথে আসিয়া ওর অন্নবস্ত্রের সমস্যা ঘুচিয়াছে, কাল যে পরের বাড়ি চাইতে গিয়া প্রহার খাইয়াছিল, আজ সে নিজের ঘরে বসিয়া গ্রামের লোককে চা খাওয়াইতেছে, নিজের পয়সায় কেনা পেয়ালা-পিরিচে—যার বাবাও কোনোদিন শহরে বাস করে নাই বা পেয়ালায় চা পান করে নাই। ওর জীবনের এই পরমসাফল্য ওর চোখে। তাহাকে তুচ্ছ করিয়া, ছোটো করিয়া, নিন্দা করিবার ভাষা আমার জোগাইল না।
সংকল্প ঠিক রাখা গেল না। হাজু চা করিয়া আনিল। আর একখানা কাঁসার মাজা রেকাবিতে স্থানীয় ভালো সন্দেশ ও পেঁপে কাটা। কত আগ্রহের সহিত সে আমার সামনে জলখাবারের রেকাবি রাখিল।
সত্যিই আমার গা ঘিন ঘিন করিতেছিল।
এমন জায়গায় বসিয়া কখনো খাই নাই—এমন বাড়িতে।
কিন্তু হাজুর আগ্রহভরা সরল মুখের দিকে চাহিয়া পাত্রে কিছু অবশিষ্ট রাখিলাম। হাজু খুব খুশি হইয়াছে—তাহার মুখের ভাবে বুঝিলাম।
বলিল—কেমন চা করিচি জ্যাঠামশায়? চা মোটেই ভালো হয় নাই—পাড়াগেঁয়ে চা, না-গন্ধ, না-আস্বাদ। বলিলাম— কোথাকার চা?
—এই বাজারের।
—তুই নিজে চা খাস?
—হুঁ, দুটি বেলা। চা না-খেলে সকালে কোনো কাজ করতে পারিনে, জ্যাঠামশায়।
আমার হাসি পাইল। সেই হাজু!–
ছবিটি যেন চোখের সামনে আবার ফুটিয়া উঠিল। রায়বাড়ির বাহিরের ঘরের পৈঠার কাছে বসিয়া খোলাসুদ্ধ তরমুজের টুকরা হাউহাউ করিয়া চিবাইতেছে। সেই হাজু চা না-খাইলে নাকি কোনো কাজে হাত দিতে পারে না।
বলিলাম—তা হলে এখন উঠি হাজু। সন্দে উতরে গেল। আবার অনেকখানি রাস্তা যাব।
হাজুর দেখিলাম, এত শীঘ্র আমাকে যাইতে দিতে অনিচ্ছা। গ্রামের এ কেমন আছে, সে কেমন আছে, জিজ্ঞাসাবাদ করিল। বলিল—একটা কথা জ্যাঠামশায়, মাকে পাঁচটা টাকা দেব, আপনি নিয়ে যাবেন? লুকিয়ে দিতে হবে কিন্তু টাকাটা। পাড়ার লোকে না-জানতে পারে। মার বড়ো কষ্ট। আমি মাসে মাসে যা পারি মাকে দিই। গত মাসে একখানা কাপড় পাঠিয়েছিলাম।
কার হাতে দিয়ে দিলি?
—বিনোদ গোয়ালা এসেছিল, তার হাত দিয়ে লুকিয়ে পাঠালাম।
—তোর ছেলেটা কোথায়?
—মার কাছেই আছে। ভাবচি এখানে নিয়ে আসব। সেখানে খেতে-পরতে পাচ্ছে না। এখানে খাওয়ার ভাবনা নেই জ্যাঠামশায়, দোকানের খাবার খেয়ে তো অছো হল। সিঙ্গেড়া বলুন, কচুরি বলুন, নিমকি বলুন—তা খুব। এমন আলুর দম করে ওই বটতলার খোট্টা দোকানদার, অমন আলুর দম কখনো খাইনি। এই এত বড়ো বড়ো এক-একটা আলু—আর কত রকমের মশলা—আপনি আর একটু বসবেন? আমি গিয়ে আলুর দম আনব, খেয়ে দেখবেন!
নাঃ, ইহার সরলতা দেখিয়াও হাসি পায়। রাগ হয় না ইহার উপর। বলিলাম— না, আমি এখন যাচ্ছি। আর ওই টাকাটা আমি নিয়ে যাব না, তুমি মনিঅর্ডার করে পাঠালেও তো পারো। অন্য লোকে দেবে কি না দেবে—বিনোদ যে তোমার মাকে টাকা দিয়েছে, তার ঠিক কী?
হাজুর এ সন্দেহ মনে উঠে নাই এতদিন। বলিল—যা বলেচেন জ্যাঠামশাই, টাকাটা জিনিসটা তো এর-ওর হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিই, মা পায় কিনা পায় তা কী
জানি!
—এ পর্যন্ত কত টাকা দিয়ে?
—তা কুড়ি-পঁচিশ টাকার বেশি। আমি কী হিসেব জানি জ্যাঠামশাই? মা কষ্ট পায়, আমার তা কী ভালো লাগে?
—কার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিস?
হাজু সলজ্জ মুখে চুপ করিয়া রহিল। বুঝিলাম আমাদের গ্রামের লোকজন ইহার নিকট যাতায়াত করে।
বলিলাম—আচ্ছা দে সেই পাঁচটা টাকা।—চলি—
—আবার আসবেন জ্যাঠামশাই। বিদেশে থাকি, মাঝে মাঝে দেখেশুনে যাবেন এসে।
গ্রামে ফিরিয়া হাজুর মায়ের সঙ্গে দেখা করিয়া টাকা পাঁচটি তাহার হাতে দিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম—আর কেউ তোমাকে কোনো টাকা দিয়েছিল?
হাজুর মা আশ্চর্য হইয়া বলিল—কই না! কে দেবে টাকা?
বিনোদ ঘোষের নাম করিতে পারিতাম। কিন্তু করিলে কথাটা জানাজানি হইয়া পড়িবে। বিনোদ ভাবিবে আমারও ওখানে যাতায়াত আছে এবং হাজুর প্রণয়ীদের দলে আমিও ভিড়িয়া গিয়াছি এই বয়সে। কী গরজ আমার?
বুধীর বাড়ি ফেরা
ঘোর দুঃস্বপ্ন হইতে বুধী জাগিয়া উঠিল।
সে একটু ঘুমাইয়াছিল কি? হয়তো তার খেয়াল নাই।
এ কোন ভীষণ জায়গায় তাহাকে আনিয়া ফেলা হইয়াছে? চারিদিকে বিশ্রী ইটের দেয়াল ও ময়লা…ময়লা অপরিষ্কার মেঝে। একটু আলো বা হাওয়া আসিবার উপায় নাই। আর কি ভিড়! এত ভিড়, এত ঠাসাঠাসি বুধী জীবনে কখনো দেখে নাই—এত ভিড়ে আর এই গুমট গরমে প্রাণ যে তার বাহির হইয়া গেল! এত ভিড়ে, এই ঠাসাঠাসির মধ্যে কি ঘুম হয়?
নতুন নতুন অপরিচিত মুখ। কাহাকেও সে দেখে নাই…নিষ্ঠুর, লোভাত মুখ, বুধী দেখিলেই বুঝিতে পারে…বুঝিতে পারিয়া বুধীর গা শিহরিয়া উঠে…মনে যে কি দুঃখ আর অস্বস্তিবোধ হয়!
