বারিক এমন ভাব প্রকাশ করলে যেন সে স্বয়ং ফৈয়াজ খাঁ। আমি তাকে এক আঁটি পাকাটি দিয়ে মশাল জ্বেলে নিয়ে বাড়ি যেতে বললাম। হাটে ওদের গ্রামের সোনাই মণ্ডলের সঙ্গে দেখা—যে সোনাই মণ্ডল তার ধানের জমি আমার কাছে বিক্রি করেছিল। বেগুন বিক্রি করছে দেখে বললাম— সোনা ভালো আছ?
–আজ্ঞে হাঁ, একরকম বাবু।
—বেগুন দেও দু-সের।
—বাবু, একটা কথা আপনাকে বলতাম। বারিকের অবস্থা যে খুব খারাপ হল, আপনি মনিব, আপনাকে না-বললি আর কাকে বলি?
ভাবলাম, বারিকের বোধ হয় খুব অসুখ হয়েছে। কিন্তু দু-চার দিন আগে তাকে গান করে বাড়ি ফিরতে দেখলাম যে? কী হয়েছে তার?
সোনাই বললে, তা না বাবু। ওর বড়ো দুর্দশা হয়েছে। আপনার কাছে এক মুঠো টাকা দেনা ছিল। আপনি ধানগুলো নিয়ে গেলেন—আর ঘরে খোরাকির ধান রইল না। যার কাছে নেবে, তা আর ফেরত দেবে না এই ওর দোষ। নলে নাপিতের আর রামচরণ ময়রার গোলা থেকে আর-বছর সমানে ধান কর্জ নিয়েছে, একটি দানা শোধ করেনি। সেদিন নালিশ করে রামচরণ ময়রা ওর বলদ ক্রোক দিয়ে নিয়ে গিয়েচে গত সোমবারে। ধান কর্জ পাচ্ছে না কারো কাছে, একবেলা খেতে পাচ্চে একবেলা খাওয়া জোটচে না। বস্তুর আবানে ওর ইস্তিরির ঘরের বার হওয়ার উপায় নেই। ছেলে দুটো আহম্মদ দফাদারের বাড়ি ওবেলা দুটো ভাত খেয়েছে। স্বামী-ইস্তিরির বোধ হয় খাওয়াও হয়নি আজ।
আশ্চর্য হয়ে বললাম—সে কী কথা! গত সোমবারে ওর গোরু ক্রোক হয়েছে বলছ, সেই সোমবার সন্দের সময়েই যে ওকে বারিক অপেরা পার্টির ঘরে মহাআনন্দে দুই ছেলেকে নিয়ে গান করতে দেখিচি!
—তা দেখবেন বাবু। ও যে ওইরকম লোক। কাল কী খাবে সে ভাবনা নেই —দেখুন গিয়ে দুই ছেলে নিয়ে বেহালা বাজাচ্চে–
-–ধান নেই ঘরে?
—এক দানা নেই বাবু।
—ওর মহাজনের কাছে কর্জ করে না কেন?
–ওই যে বললাম বাবু, সেদিকি যাবার যো আছে? মহাজনের ঘরে সতেরো শলি ধান কর্জ নিয়েছিল, তার এক খুঁচি ধান শোধ করেনি। দেনায় মাথার চুল বিক্রি। যার নেবে তারে আর দেবে না। কথার একদম ঠিক নেই। কেউ বিশ্বেস করে আর দেয় না।
এর কিছুদিন পরে বারিক আমার কাছ থেকে দশটা টাকা ধার নিয়ে গেল। কলাই বেচে টাকা শোধ করবে এই শর্তে তাকে টাকা ধার দিলাম। খেতের কলাই-মুগ সব যে যার বিক্রি করে ফেললে, বারিক আমার সঙ্গে আর দেখাও করলে না। একদিন হাটে খবর পেলাম বারিকের কলাই-মুগ আহম্মদ দফাদার সব কিনে নিয়েছে। শুনে আমার ভয়ানক রাগ হল। বারিকের বাড়ি পরের দিন সকালেই গেলাম। বারিকের প্রতিবেশী তোফাজ্জেল বললে—বাবু শিগগির যান, সে এখনো তার দলিজে বসে তামুক খাচ্ছে, আপনি যাচ্ছেন শুনলি পেলিয়ে যেতে পারে। পাওনাদার এলেই পালাবে—ওর স্বভাবই ওই।
বারিকের ঘরদোরের অবস্থা আরও ছন্নছাড়া। চালের খড় গত বর্ষায় পচে ঝুলে পড়েছে, উঠোনের মাঝখানে মুগ-কলাই মাড়বার খামার, এক পাশে ভুসি পাকার হয়ে আছে! গাড়ি-গোরু নেই উঠোনে।
বারিক আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। মুখ ওর শুকিয়ে গেল।
—আসুন বাবু, সালাম। দলিজে ওঠে বসুন। ওরে আলি, খুরসি পিঁড়িখানা বাবুরি পেতে দে—
—থাক গে পিড়ি। আমি এসেছিলাম তোমার কাছে—মুগ-কলাই বিক্রি হয়েছে?
—হ্যাঁ বাবু।
—আমার টাকা দাও—
—ট্যাকা এখনো মোর হাতে আসেনি বাবু।
—মিথ্যে কথা। কার কাছে বিক্রি করেচ? আহম্মদ দফাদারের কাছে তো? সে সংবাদ আমি রাখি। আহম্মদ কারো পয়সা বাকি রাখবার লোক নয়। টাকা বের করো—
বারিক নির্বিকারভাবে আমার জন্যে তামাক সাজতে লাগল। তামাক সাজা শেষ। করে আমার দিকে কলকে এগিয়ে দিয়ে বললে, তামুক সেবন করুন—
—আমার কথার উত্তর দাও।
—আপনি নেয্য বলেচেন। টাকা ওরা দিইছিল, তা সংসারের জ্বালায়—সে টাকা মোর খরচ হয়ে গিয়েছে। তবলা ছাইতে খরচ হল তিন টাকা, বেহালার তার এনেলাম মুকুন্দ তেলির দোকান থেকে
—ওসব বাজে কথা শুনতে চাইনে। খেতে পাও না, মহাজনের দেনা শোধ করবার যখন ক্ষমতা নেই, তখন অত শখ কেন? বাড়িঘরের তো এই অবস্থা— গাড়ি-গোরু কী হল?
আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে ওর প্রতিবেশীদের মধ্যে কে একজন। আমার চড়া সুর শুনে অনেকে জড়ো হয়েছিল ওর ঘরের সামনে। বললে—ওরে আর কিছু বলবেন না বাবু। লোকটার আর কিছু নেই—
—গাড়ি-গোরু কী হল?
—রামচরণ ময়রা গোরু ক্রোক দিয়ে নিয়ে গেল, গাড়িও বিক্রি করে ফেলেছে আহম্মদ দফাদারের কাছে। গাড়ি-গোরু না-থাকলে চাষার উঠোন মানায়? বলি ও চাচা, বাবুর কাছে থেকে টাকা আনলে কেন, যদি শোধ করতে পারবা না? ভদ্রলোকের কাছে কথা ভাঙো কেন তুমি? একেবারে দশায় ধরেচে তোমায় ছ্যাঃ, জুয়েচুরি করো কেন?
বারিক মুখ চুন করে বসে রইল, আর সকলের হাতে হাতে কলকে পরিবেশন করতে লাগল। আমি নিরুপায় হয়ে চলে এলাম। বারিক কোনো কথা গায়ে মাখে না, কে যেন কাকে বলচে।
বারিকের বাড়ি কিছুদিন আর গেলাম না। টাকা আদায় হবে না জানি, ওর সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখব না। টাকাকড়ির সম্পর্ক নয়ই।
বারিকের সঙ্গে মাসদুই পরে একদিন হাটে হঠাৎ দেখা। কাঁধে একখানা ময়লা গামছা, পরণে হেঁড়া আধময়লা ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা। সদাহাস্যমুখ বারিক আমাকে দেখে বল্লে, বাবু, সালাম। আমাদের ওদিকি আর যান না?
—না। আমার অন্য কাজ আছে।
—আজ একবার মহল্লাঘরে যাবেন বাবু ও-বেলা? দুটো গান শোনাতাম আর দেখতেন আমাদের ‘সাধন সমর’ পালাটা কীরকম হল। আজ পুরো মহল্লা হবে।
