কিন্তু বিষয়সম্পত্তি রাখতে গেলে ভাবপ্রবণ হলে চলে না। আমি কড়া সুরে বললাম, মোটে দু-বিশ ধান পেলাম তিন বিঘে জমিতে? আমার সবসুদ্ধ বাইশ তেইশ টাকা নিয়ে এসেচ, তার বদলে ধান দাও। আর বছরের ভিটের খাজনা দু টাকা তাও শোধ করো। নইলে কালই নালিশ ঠুকে দেব।
বারিকের দুটি ছেলে, বড়োটির বয়স আঠারো-উনিশ, ছোটোটির চোদ্দো পনেরো। তারা বাবার কাছেই দলিজে বসে গল্পগুঁজব করছিল। চট করে একখানা খুরসি পিঁড়ি এনে বড়ো ছেলেটা আমায় বসতে দিলে।
বারিক বললে—যা, কাঁঠালপাতা কী কলার পাতা নিয়ে আয়, বাবু তামাক খাবেন। ওরে আলি, শিগগির ছোট।
–থাক, আমার তামাকের দরকার নেই। ধান বের করো বাকি টাকার—
—ঠাণ্ডা হোন বাবু। তামুক খান আগে—
বারিক নিজে তামাক সেজে দিলে।
বললাম—তোমার ছেলেরা কী করে?
–বড়োটি গোরু চরায়। ওরা দুজনে ভালো গান গায়, শুনিয়ে দে বাবুকে একখানা গান।
-–থাক, গান এখন দরকার নেই, তুমি ধান বের করো।
—দেব বাবু দেব।
—আর খাজনা? আজ সব শোধ করে দিতে হবে। নইলে নালিশ হবে জানো?
—দেব বাবু, দেব, তামাক খান।
একটু পরে বারিক ও তার দুই ছেলেতে ধরাধরি করে দু-বস্তা ধান বার করে নিয়ে এল। বারিক বললে, বাবুর এই ধানগুলো ওঁর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতি হবে—গোরু দুটো খুঁজে নিয়ে এসে গাড়ি জুতে দে।
আমি বাধা দিয়ে বললাম—কত ধান?
—আড়াই বিশ।
–সাড়ে সাত মণ? এতে তো শোধ হবে না দেনা।
–বাবু, আল্লার কিরে, ঘরে আর ধান নেই। সব দেলাম আপনাদের। আর কিছু নেই, আপনি দেখে আসুন ঘরে।
—তোমার ধান রইল না?
—না বাবু, সব দেলাম।
—তুমি ছেলে-পিলে নিয়ে খাবে কী?
—তা আর কী করব বাবু। আমি নালিশকে বড্ড ভয় করি।
ওর কথা আমার বিশ্বাস হল না।
দুই বস্তা ধান গোরুরগাড়ি করে ওরা আমার বাড়ি পৌঁছে দিলে।
দু-দিন পরে বারিক তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যাবেলা আমার বাড়ির সামনে দিয়ে দেখি কোথায় যাচ্ছে। বারিকের বগলে বেহালা।
বললাম, ও বারিক, কোথায় চললে?
–আজ্ঞে বাবু সালাম। মহল্লা দিতে যাচ্ছি।
—তুমি কী বেহালা বাজাও?
—ওই অমনি একটু একটু। খোদার মর্জিতে।
জেলেপাড়ায় ওদের দলের ঘরে একদিন গিয়ে বেড়াতে বেড়াতে হাজির হলাম। বাঁওড়ের ধারে একটা জামগাছের ছায়ায় লম্বা দোচালা ঘর, কঞ্চির বেড়ার দেওয়াল, বসবার জন্যে খানচারেক পুরোনো মাদুর, এককোণে দু-জোড়া ডুগি তবলা, একখানা খোল, একজোড়া মন্দিরা, গোটা দুই থেলো হুঁকো টাঙানো বাঁশের খুঁটির গায়ে। জন-পাঁচ-ছয় লোক জুটেছে, বাকি এখনও আসেনি। আমাকে ওরা সরবে অভ্যর্থনা জানাল। বটতলাতে বসলাম। সামনে বাঁওড়ের স্বচ্ছ জলে পদ্মফুল আছে। লম্বা লম্বা জলজ ঘাসের মধ্যে দিয়ে সুড়ি বালি মাটির পথ গিয়ে জলের ঘাটে নেমেচে, পানকৌড়ি বসে আছে পাটা-শ্যাওলার দামে। ওপারে কাজি সাহেবের দরগা, ভাঙা পাঁচিলে মস্তবড়ো জিউলি গাছ বেড়ে উঠে সমস্ত দরগা ঘরের ওপর ঝুপসি ছায়া পড়ে আছে, আঠা ঝরে পড়চে গাছটার কাঁধ থেকে— খানিকটা সাদা, খানিকটা লাল—আঠা ঝরে ঝরে দরগাঘরের পশ্চিম দিকের পাঁচিলের কোণটা একেবারে ঢেকে গিয়েছে। দরগাতলার ঘাটের ওপারে আমিনপুর গ্রামের কৃষক-বধূরা মাটির কলসি কাঁখে জল নিতে যাওয়া-আসা করচে!
একজন তামাক সেজে কলকে আমার হাতে দিয়ে বললে—তামুক সেবা করুন —একটা কলার ডাঁটা কী এনে দেব?
আমি তামাক খেতে খেতে বললাম—তা একটু গান-বাজনা হোক শুনি।
সে বললে, বারিক এখনো আসেনি। সে না-এলে আরম্ভ হবে না বাবু। সে হল বেয়ালাদার। এ দলই তার। এর নাম বারিক অপেরা পার্টি।
—বাঃ বাঃ, নাম দিয়েচে কে?
—বাবু, মোরা তো ইংরেজি জানিনে। অন্য অন্য যাত্রাদলের কাগজে যেমন লেখা থাকে, তাই দেখে মোরা একটা মিল খাটিয়ে করিচি। ভালো হয়নি?
একটু পরে বারিক এসেও সেই কথা জিজ্ঞেস করলে।
আমি বললাম—নামের মতো নাম একটা হয়েছে বটে। খাসা নাম।
—গান শুনিয়ে দে, বাবুরি তামুক সেজে দে। ব্যস্তসমস্ত বারিককে ঠাণ্ডা করে আমি তাকে বেহালা বাজাতে বললাম। ওর দুই ছেলে বেশ গান গায়। ছোটো ছেলে কৃষ্ণ সাজে, বেশ কালো নধর চেহারাটি। তাকে বারিক বললে গান করে আমায় শুনিয়ে দিতে। সে রগে হাত দিয়ে তারস্বরে সোনাই যাত্রার এক গান আরম্ভ করলে :—
ওরে ও কিছান ভাই,
আমি হেথা বলে যাই
গওরেতে শোন সেই বাণী—
বললাম—বেশ, বেশ। কৃষ্ণের গান?
বারিক ধমক দিয়ে বললে—মানভঞ্জর পালার সেই গানখানা গা—আমার সঙ্গে ধর।
বলেই নিজেই রগে হাত দিয়ে আরম্ভ করলে—
ধনি, কী সুখে রাখিব পরাণ,
কানু হেন গুণনিধি, গ্রেহে না আইল যদি
অঝোরে বহিল দু-লয়ান—
(ও) লয়ান যে বহে যায়।
গুণমণির বিরহ-জ্বালায়
লয়ান যে বহে যায়—
বারিক গান করে মন্দ নয়। খানিকক্ষণ থেকে আমি চলে এলাম। জ্যোৎস্নারাত ছিল। বারিক কী আসতে দেয়? বসুন বসুন, চন্দ্রাবলীর গান একটা শুনে যান না? আমি নিজে শিখিয়েছি।
রাত এগারোটার সময় দেখি আমার বাড়ির সামনে দিয়ে ছেলে দুটিকে সঙ্গে নিয়ে বারিক বাড়ি ফিরচে বন-জঙ্গলের পথ দিয়ে। বারিকের বাড়ি চালদী গ্রামে, ওদের যেখানে বাঁওড়ের ধারে গান-বাজনা হয়, বারিকের বাড়ি থেকে সে জায়গা দেড় মাইলের ওপর। এই পথের অধিকাংশই ঘন বন-জঙ্গলে ভরা, সাপখোপের ভয় তো নিশ্চয়ই আছে এত রাত্রে।
বারিককে ডেকে বললাম—আলো নিয়ে যাও না কেন বারিক? বারিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে বললে—কে, বাবু? এখানো জাগন্ত আছেন? আর বাবু আলো! কেরাচিন তেল কনে পাব? কেরাচিন তেল অভাবে অন্ধকারে ভাত খেতে হচ্চে রোজ রোজ। গান কেমন শোনলেন? আগাগোড়া নিজে শেখানো বাবু। ওরা সব জেলে-মালো, বেতালা বেসুরো গান গাইত। হাতে-নাতে শেখালাম বাবু
