পরশু গান হবে আরামডাঙায় বিশ্বেসদের বাড়ি।
—আমার সময় হবে না।
—ও কথা বললি বাবু শুনচিনে। আসুন দয়া করে। আপনারে গান শোনাতে বড় ভালো লাগে। যাবেন বাবু।
ওর অনুরোধ এড়াতে পারলাম না। সন্ধ্যার কিছু আগেই বাঁওড়ের ধারে ওদের বারিক অপেরা পার্টির মহলাঘরে গিয়ে বসলাম। বারিক ও তার দুই ছেলে ঠিক সন্ধ্যার সময়ে এল। তখন বাঁওড়ের দিক থেকে ফুরফুরে হাওয়ায় বড্ড শীত করছে, সময়টা মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহ। বারিকের গায়ে একখানা বহু পুরোনো কুষ্টিয়ার চাদর। জ্যোৎস্না-রাত্রি। আমি বাইরেই বসে রইলাম। বারিক মহাব্যস্ত অবস্থায় কখনো গান করে, কখনো এর গানের ভুল ধরে, ওর তালের ভুল ধরে, হাসি ঠাট্টা ও অঙ্গভঙ্গি কীভাবে করতে হবে বিদূষকের ভূমিকায় তা শিক্ষা দেয়, ছেলেকে শিখিয়ে দেয় কৃষ্ণের ভূমিকায় কীরকম বেঁকে দাঁড়াতে হবে, এর দোষ ধরে, ওর গুণ গায়—মোটকথা এই বয়সে তার উৎসাহ, আমোদ, লম্ভঝম্প একটা দেখবার জিনিস।
আবার বাইরে এসে আমার কাছে বলে, বাবু, বিড়ি খান একটা। দ্যাখচেন কেমন? আমার নামে যখন এ দল, তখন বারিক অপেরা পার্টির যাতে বাইরে নাম ভালো হয়, তা আমাকেই দেখতে হবে, না কী বাবু? অজামিল ক্যামন দ্যাখলেন? চলবে? কেষ্ট? বেশ, আপনারা ভালো বললিই ভালো।
কে বলবে এই সেই বারিক, যার দু-বেলা খাওয়া হয় না, যার গাড়ি-গোরু পর্যন্ত মহাজন ক্রোক দিয়েছে, দেনায় যার মাথার চুল বিক্রি, যার বয়েস পঞ্চান্নর কোঠা ছাড়াতে চলছে। এই মহল্লায় ও একাই একশো।
পরদিনই হাটে আহম্মদ দফাদার ওকে কী করে অপমান করলে আমার সামনে। চেঁচামেচি শুনে গিয়ে দেখলাম, আহম্মদ ওর গলায় গামছা দিয়ে টানাটানি করছে। আহম্মদ চালদীগ্রামের অবস্থাপন্ন লোক, লম্বা দাড়ি রাখে, বেশ একটু গর্বিত, ঘোড়ায় চড়ে বেড়ায়। এবার ধানের দাম সাড়ে ষোলো টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, দুটি গোলা ভরতি প্রায় হাজার মণ ধান চড়া দরে বিক্রি করে আহম্মদ টিনের বাড়ি ঘুচিয়ে দোতলা কোঠাবাড়ি করেছে।
আমি গিয়ে বললাম—কী করো আহম্মদ? ওকে ছেড়ে দাও, ছি, তোমার চেয়ে বয়েসে কত বড়ো না!
আহম্মদ হাতে পয়সা করেছে, কাউকে মানে না। আমার দিকে ফিরে বললে— আজ জুতিয়ে ওর ইয়ে দেখিয়ে দেব বাবু, এত বড়ো আস্পদ্দা, আমার সঙ্গে জুয়াচুরি কথা বলে। মুগ দেব বলে বায়নার টাকা নিয়েচে সেই আর-বছর। দু-মণ কলাই দিয়ে আর টাকাও দেয় না, কলাইও দেয় না। রোজ বলে দিচ্ছি দেব, আজ আমি ওরে—আমার সঙ্গে কিনা ঠকামি কথা বলে বাবু? এত বড়ো ওর সাহস? (যেন সাক্ষাৎ ভাইসরয় কিংবা মহাত্মা গান্ধি কিংবা গৌরগোপাল ভক্তিবিনোদ গোস্বামী কিংবা বশিষ্ঠ মুনি কিংবা জুলু সর্দার লোচবক্ষুলা)।
বারিক তখন বলছে—ছেড়ে দ্যান বাবু, আমি ও সুমুন্দিকে একবার দেখে। নেতাম! আপনি ধরলেন কেন?
আহম্মদ আবার সবেগে ঠেলে উঠে বললে—তবে রে—
আবার তাকে কোনোরকমে ঠাণ্ডা করি।
আহম্মদকে বললাম—কত টাকা পাবে?
—তা বাবু অনেক। খেতি পায় না, দু-বিশ ধান দেলাম আশ্বিন মাসে। সাতাশ টাকা নিলে মুগির দাম, মোটে দু-মণ কলাই দিলে, এখনো পনেরো টাকা তার দরুন বাকি। ঝিঙের ভুই করে গাঙের ধারে, তার দু-বছরের খাজনা সাড়ে চার টাকা। আমার গাছ থেকে ব্যাবসা করবে বলে দেড়কুড়ি নারিকেল পেড়ে আনে, তার দরুন একটা পয়সা দেয়নি—ওর মতো মিথ্যেবাদী ফেরেববাজ জুয়াচোর এ দিগরে পাবেন না—আপনিও তো শুনি পাবেন—এক মুঠো টাকা—
বারিকের প্রতিবেশী সোনাই মণ্ডল আমাকে আড়ালে বললে—বাবু, দু-কাঠা মুসুরি আর দু-টো মানকচু বেচতি এনলে বারিক, তা সব আহম্মদ কেড়ে নিয়েছে। হাটে ওই বেচে চাল কিনে নিয়ে যাবে, তবে ওদের খাওয়া হত। কী অন্যায় কাণ্ড দেখুন দিকি? ছ-আনা পয়সা হবে আপনার কাছে? বেগুন-পটলটা ওকে কিনে দি—
সেই দিনই রাত প্রায় দশটার সময় শুনলাম বারিক উচ্চৈ:স্বরে রাগিণী ভাঁজতে ভাঁজতে বারিক অপেরা পার্টির মহল্লা দিয়ে ফিরছে—
‘তুমি কোন অংশে বলো কোন বংশে
কারে-এ-এ করেচ সুখী–
নামটি তোমার দয়াময়
কথায় বটে কাজে নয়”—ইত্যাদি।
এর পরে অনেক দিন আমার সঙ্গে ওর দেখা হয়নি।
একদিন সোনাই মণ্ডলের সঙ্গে আমার দেখা। তাকে বলি—বারিক কেমন আছে?
—আর বাবু! আপনি শোনেননি? তার যে সব্বনাশ হয়ে গিয়েছে!
—কী-কী-কী ব্যাপার? কী হল?
—ওর সেই বড়ো ছেলেটা আজ সাত দিন হবে মরে গিয়েছে!
—সে কী কথা? কি হয়েছিল?
—বাবু, পুরোনো জ্বরে ভুগছিল। পেটে পিলে। রোজ সন্দেবেলা জ্বর হত। ওষুধ নেই, পথ্যি নেই। জ্বর সেরে গেল তো পান্তা ভাত আর পটল পেঁজপোড়া খেলে! সে দিন রাত্তিরে জ্বর হয়েছে ওর সেই অপেরা পার্টি থেকে গান সেরে এসে। ভোরবেলা মারা গেল। কাফনের কাপড় জোটে না শেষে, এই তো অবস্থা। বুড়ো বয়েসে ওই ছেলেডা তবুও মাথাধরা হয়ে ঠেলে উঠছিল। আর একটা ছেলে, সে তো বাচ্চা, তার ভরসা কী?
অত্যন্ত মর্মাহত হলাম বলাবাহুল্য। মনের কোণে ঘোর মিথ্যেবাদী, জুয়াচোর, সদাপ্রফুল্ল, বৃদ্ধ বারিকের প্রতি একটু অনুকম্পার ভাব সঞ্চিত ছিল। কাল সকালে একবার বারিকের বাড়ি যাব। ভাগের জমি দু-বছর কেড়ে নিয়েছিলাম ওর কাছ থেকে, এবার ওর সঙ্গেই আবার বন্দোবস্ত করব। পুত্র-শোকাতুর বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত, সাহায্য করা উচিত।
সেই দিনই রাত দশটা-এগারোটা। গোঁসাইবাড়িতে জন্মাষ্টমীর নিমন্ত্রণ খেতে যেতে যেতে শুনি কোথা থেকে বাঁশি, বেহালা, ডুগি-তবলা ও মানুষের গলার একটা সম্মিলিত রব ভেসে আসছে। নিমচাঁদ গারই বললে—বাবু, গোঁসাইবাড়ির নাটমন্দিরে আজ জন্মাষ্টমীর দিন বারিক অপেরা পার্টির গাওনা হচ্চে। বেশ ভালো পালা হবে, গিয়ে শুনুন।
