বললাম—জমি কোথায়? কতটা?
—চালদীর মাঠে। তা বলি আপনার কাছেই যাই, ওঁর জমির যদি দরকার থাকে। সাত বিঘে জমি বাবু। বিক্রি করবে আমাদের গাঁয়ের সোনাই মণ্ডল।
—তুমি তার কেউ হও?
—না বাবু। ওর মধ্যে দু-বিঘে ভিটে জমি আছে, সে জমিটুকুতে আমি খাজনা দিয়ে বাস করি। জমিটা কিনলে আমি আপনার ভিটের প্রজা হব। দু-টাকা করে খাজনা করি। ধানের জমিটা আপনাকে সস্তায় করে দোব বাবু। আমাকে ধানের জমিগুলো কিন্তু ভাগে দিতে হবে। আর যদি আপনি নিজে চাষ করেন তো আলাদা কথা—
কলকাতা থেকে নতুন এসে বহুদিন পরে দেশে বসেছি, জমিজমার ব্যাপার তত বুঝিনে। ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝবার চেষ্টা করলাম। চালদীর বারিক মণ্ডল আমার কাছে এসেচে কিছু জমি বেচতে। ওর জমি নয়, সোনাই মণ্ডলের জমি। ও এসেছে কেন, এতে ওর স্বার্থ কী? না, ও আগে থেকেই এই জমার অন্তর্ভুক্ত দু-বিঘে জমিতে বাস করে, জমি নিলে ও আমার প্রজা হবে এবং আমি ওকে ধানের জমির ভাগীদার করব। বেশ কথা। বারিকের চেষ্টায় ও আমার ইচ্ছায় তিনদিনের মধ্যে জমি কেনা হয়ে গেল।
রেজেষ্ট্রি অফিসে যে দলটি জমি রেজেষ্ট্রি করতে গিয়েছিল বারিক মুসলমান দেখলুম তার মোড়ল। মহা ফুর্তিবাজ লোক সে। আধ-বুড়ো লোক হলে কী হয়। দাড়ি নেড়ে নেড়ে পান খাচ্চে, বিড়ি খাচ্চে, বেগুনি খাচ্চে, ফুলুরি খাচ্চে। রেজেস্ট্রি শেষ হয়ে গেলে বারিক আমায় ডেকে বললে—বাবু, এটুখানি দোকানে চলুন।
—কোন দোকান?
—জল খাবেন এট্টু।
জল খাওয়ানোর প্রথা আছে এদেশে, যে জমি কেনে, সে-ই মনের ফুর্তিতে সাক্ষী ও শনাক্তকারীকে মিষ্টিমুখ করায়। যে জমি বেচে সে তো রিক্ত হয়ে গেল, সে খাওয়াবে কেন? এ কথা তো এদেশে নেই। কিন্তু বারিকের আনাড়ি ধরনের বিনীত গ্রাম্য অনুরোধ এড়াতে না-পেরে খাবারের দোকানে বসলাম।
—দ্যাও, ও দোকানি বাবুরি (অর্থাৎ বাবুকে) নিমকি, সেঙ্গারা, সন্দেশ দ্যাও। আর ওই যে হ্যাদে গোল গোল তোমার, ওকী কী বলে, ওই দ্যাও একপোয়া নুচি খাবেন বাবু? হ্যাদে বাবুরি নুচি দ্যাও আটখানা—ভাজা নেই? তা ভেজে দ্যাও—
দেড় টাকা খরচ গেল শুধু আমার পিছু। খাবার খরচ গেল টাকাচারেক। বারিক মহাফুর্তিতে এক টাকার খাবার নিজেই খেলে।
সন্ধ্যা হয়ে গেল। সবাই মিলে অন্ধকারে বাড়ির দিকে রওনা হই। বারিক অন্ধকার পথে গান জুড়ে দিলে চেঁচিয়ে–
‘ওগো হরি বংশীধারী শ্যাম লটবর—‘
সোনাই মণ্ডল বাজার থেকে বড়ো দেখে দুটো ইলিশ মাছ কিনেচে, কারণ আজ তার হাতে কড়কড়ে আড়াইশো টাকা। জমি ওরা নাকি খুব সস্তায় দিয়েছে আমাকে। দলিল-লেখক আমাকে আড়ালে বলেছিল—আড়াইশো টাকায় সাত-আট বিঘের জমি কিনেছেন, তার মধ্যে পাঁচ বিঘে আমন ধানের জমি। সাব রেজিস্ট্রারবাবু এ দলিল এখন মঞ্জুর করলে হয়, দামটা কম বলে মনে হচ্ছে কিনা–
যা হোক, রেজিস্ট্রি হয়ে গেল, কোনো গোলমাল হয়নি।
বারিক মণ্ডল বললে—বাবু, আমাদের গাঁ আগে, তারপর আপনাদের গাঁ। এই অন্ধকারে কী করে যাবেন? সোনাই ইলিশ মাছ কিনেচে, আমাদের গ্রামে আজ থাকুন। ইলিশ মাছ রান্না করুন পেঁজ দিয়ে। আজ চলুন একটু ফুর্তি করা যাক—
আমি রাজি হলাম না। বাড়ি চলে এলাম অন্ধকারে।
বারিক আমার প্রজা হল। তখন শুনলাম বারিক অপরের জমিতে বাস করত, সে ভিটের খাজনা বহুদিন না-দেওয়াতে জমিদার ওর বাড়ি (অর্থাৎ একখানা চালাঘর) এবং একজোড়া বলদ বিক্রি করে ক্রোক দেবার উপক্রম করেছিল। তাই ও সে জমি ছেড়ে আমার জমিতে নতুন করে চালাঘর বাঁধল। আমার নতুন কেনা ধানের জমি ও-ই ভাগে চাষ করবার জন্যে বন্দোবস্ত করে নিলে। সেবার ধান রোয়া শেষ করলে।
বারিক রোজ সকালে একবার করে আমার বাড়ি ঠিক আসবে। এসে এ-গল্প ও গল্প করে ওঠবার সময় কিছু-না-কিছু ছুতোয় টাকা চাইবে।
—বাবু—
-–এসো বারিক। তামাক খাও।
—বাবু, বড্ড দায়ে পড়ে অ্যালাম। পাঁচটা টাকা দিতে হবে—
—কেন, হঠাৎ?
—আপনার জমিতি বারোমেসে চাষ দিয়ে রেখেচি। মুসুরি বোনতাম। যা হবে আপনার আর্ধেক, আমার আর্ধেক।
—বেশ নিয়ে যাও—
তারপর শুনলাম মুসুরি বুনবার টাকা দিয়ে বারিক ওর গানের দলের ডুগি তবলা কিনেচে।
একদিন বললাম—মুসুরি বুনলে বারিক?
—আজ্ঞে বাবু।
–ক-বিঘে?
—এক বিঘে।
—আর দু-বিঘে?
—বাবু, আর দু-টো টাকা দিতি হবে। খরচে কুলোচ্চে না।
—মিথ্যে কথা। তুমি তোমার গানের দলের ডুগি-তবলা কিনেচ সেই পয়সা দিয়ে। কোথায় তোমার গানের দল?
—ওই জেলেপাড়ার জেলে ছোঁড়াদের নিয়ে বসি। রোজ আখড়াই হয়। গান বাজনা ভালোবাসি বাবু। এবার পুজোর সময় ‘সাধন সমর’ বা ‘অজামিলের বৈকুণ্ঠলাভ’ নামাব বারোয়ারির আসরে—দেখি যদি খোদার মর্জি হয়—আমার ছোটো ছেলে কেষ্ট সাজে, দেখবেন কী গানের গলা—কী অ্যাক্টো—
—বেশ, বেশ—
—দেন বাবু দু-টো টাকা।
—নিয়ে যাও, কিন্তু মুসুরি ঠিক বুনবে।
—তা আর বলতি? কাল সকালেই বাকি দু-বিঘে সাঙ্গ করব।
ধানের সময় আমার ভাগে যে ধান দেওয়ার কথা, বারিক আমাকে তা দিলে না, অনেক কম দিলে। লোকে বললে—বাবু, ও ওইরকম। কত লোককে ফাঁকি দিয়েছে, আপনাকে ভালো মানুষ পেয়ে ফাঁকি তো দেবেই।
খুব রেগে বারিকের বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখে-শুনে বেশি রাগ রইল না। কী মুশকিল, এইরকম বাড়িঘর ওর! মাত্র একখানা চারচালা ঘর। ঘরের দরজা জানালার ফাঁকগুলো বাঁশের ঝাঁপ দিয়ে আটকানো, দোর পর্যন্ত নেই ঘরের। ওর দলিজে বিছানো আছে একখানা বেদে-চটা অর্থাৎ খেজুরপাতার বোনা পাটি, একটা কলঙ্কধরা তামার বদনা, একটা হুঁকো আর তামাক, টিকে রাখবার মাটির পাত্র। একখানা অত্যন্ত হেঁড়া ও ময়লা রাঙা নরুন-পাড় শাড়ি চালে শুকুচ্চে। চালের অন্যস্থানে একটা কুমড়োগাছ উঠেছে। উঠোনে একখানা ভাঙা গোরুরগাড়ি। সবসুদ্ধ মিলে অত্যন্ত ছন্নছাড়া অবস্থা।
