নীরেন মনে মনে হিসাব করিয়া বলিল—তা প্রায় তেইশ-চব্বিশ বছর হল।
—সই মারা গিয়েচে কতদিন?
—বেশি দিন না, বললাম যে বছর পাঁচেক হবে।
—তাহলে সই বেঁচে থাকলে এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়েস হত—
—তা হবে, আমারও হল ছাবিশ। আপনার ছেলেও তো আমার বয়সি হবে, না সইমা?
সইমা আঁচলে চোখ মুছিয়া বলিলেন—কোথায় ছেলে বাবা? সে ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়েচে অনেক কাল।
রাত্রে নীরেন খাইতে বসিয়াছে, সইমা সামনে বসিয়া খাওয়ার তদারক করিতেছেন।
নীরেন বলিল—আপনার আর দিদিমার রান্না সমান। এমন রান্না অনেকদিন খাইনি।
সইমা বলিলেন—তোর মাও ভালো রাঁধত রে—যখন কপাল পুড়ল, এ দেশ থেকে সেই পশ্চিমে চলে গেল, তখন সে কী কান্না! বলে—সই, আর কী তোর সঙ্গে দেখা হবে? এই যাওয়াই আমার শেষ যাওয়া। সে ভাগ্যিমানী, স্বগগে চলে গেল, আমিই রইলাম পড়ে।
নীরেন হাসিয়া বলিল—আপনি না-থাকলে আজ কার মুখ চেয়ে এখানে আসতাম বলুন সইমা? সইমা দুধের বাটি নীরেনের সামনে রাখিয়া পাখার বাতাস দিয়া দুধ জুড়াইতে জুড়াইতে বলিলেন—তোকে যত্ন করবার দিন যখন আমার ছিল তখন এলি নে। এখন কী আছে সইমার, কী দিয়েই বা তোকে যত্ন করব? হ্যাঁরে, এতদিন পরে কী মনে করে এলি ঠিক বল তো?
—বলি সইমা, আপনি বুঝতে পারবেন। জানেন, আমি দু-বছর বয়সে বাংলা দেশ ছেড়ে গিয়েছিলাম?
—সে তো খুব জানি।
—আর কখনো এদেশে আসিনি এর মধ্যে।
—তাও জানি।
—এতকাল পরে মায়ের ও বাবার বাক্সের কতগুলো পুরোনো চিঠি পড়লাম সেদিন। পড়ে মনটা বড়ো ব্যাকুল হল জন্মভূমি দেখবার জন্যে। সে-সব চিঠিতে আপনার নাম আছে, আমার এক পিসিমার নাম আছে। আমি বাবাকে কখনো দেখিনি, তাঁর সম্বন্ধে, আমার ঠাকুরদার সম্বন্ধে—আরও অনেক নাম আছে বাবার এক পুরোনো খাতার মধ্যে—সকলের সম্বন্ধে আমার জানবার বড়ো ইচ্ছে হল। আমি জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত মামারবাড়ির সকলকে দেখে আসছি, বাপের বাড়ির বা নিজের বংশের কিছু খবর রাখিনে। সেইসব খুঁজেপেতে বার করব বলেই এলাম।
-ওমা আমার কী হবে! কোথাকার পাগল ছেলে দ্যাখো–
—না সইমা, আপনি ভেবে দেখুন আমার মনের অবস্থা। আমার ছাব্বিশ বছর বয়স হয়েছে কিন্তু এ পর্যন্ত আমাদের বংশের কোনো খবর রাখিনে। বাপেরবাড়ির কোনো লোকের কথা জানিনে। অথচ আমার ভয়ানক ইচ্ছে জানবার। আপনি হয়তো ভাববেন এ আবার কী, আমার কিন্তু সইমা ঘুম হয় না এইসব ভেবে— সত্যি বলচি—আপনি আমায় বলে দিন কীভাবে আমি তা করতে পারি—আমি তো কাউকে চিনিনে—বাংলা দেশের ছেলে, কিন্তু কোনো খবর রাখিনে দেশের।
—সব বলে দেব, এখন খেয়ে শুয়ে পড়ো দিকি দুষ্টু ছেলে আমার!
নীরেন হাসিল। অনেকদিন পরে যেন হারানো মাকে ফিরিয়া পাইয়াছে, সেই ধরনের হাসি সইমার মুখে। ভাগ্যিস সে আসিয়াছিল। শ্যামল বাংলা মা যেন সইমার মূর্তিতে তাহাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাইতেছেন।
চৈত্র মাসের রাত্রি। হু হু দক্ষিণা হাওয়া খোলা জানালা দিয়া বহিতেছে। কী একটা ফুলের তীব্র সুবাস বাতাসে। নীরেন বাংলা দেশের অনেক কিছু গাছপালা চেনে না—কিন্তু তাহার কী ভালো লাগে এইসব পল্লিগ্রামের আগাছা জঙ্গল! আজ দু-দিন তিন দিন মাত্র ইহাদের সহিত পরিচয়—তবুও যেন মনে হয় কত দিনের নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় তাহার শিরা-উপশিরায় রক্তের সহিত আবদ্ধ ইহাদের প্রাণস্পন্দন। এইসব বনস্পতির সহিত সেও একদিন তাহার প্রিয় জন্মভূমির এই মাটিতে জন্মিয়াছে।
সে একখানা খাতা আনিয়াছে সঙ্গে।
খাতাখানা তাহার পিতামহ গদাধর মুখোপাধ্যায়ের স্বহস্তলিখিত। তাহাদের গ্রামের কত প্রাচীন দিনের তুচ্ছ গ্রাম্য ঘটনা ইহাতে কেন যে তাহার পিতামহ টুকিয়া রাখিয়াছিলেন, তিনিই বলিতে পারিতেন। ক্ষুদ্র এক অখ্যাত পল্লিগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসে কার কী ফল? অমন কত গ্রাম, কত অগুনতি গ্রাম বাংলা দেশে। কে জানিতে চাহিতেছে তাহাদের ইতিহাস? গরজই বা কাহার?
আজ রাত্রে আলোর সামনে বসিয়া খাতাখানা সে খুলিয়া দেখিল। সইমা তাহার বিছানা নির্দেশ করিয়া দিয়া চলিয়া গিয়াছেন। ঘরে সে একা। মাটির ঘর। ছোটো জানালা, কাঠের গরাদ। জানালার বাহিরে একটা কী গাছে থোকা থোকা গাদা গাদা ফুল ঝুলিতেছে—কতক ফাটিয়া তাহাদের রাঙা রাঙা বিচি বাহির হইয়াছে— দিনমানে নীরেন লক্ষ করিয়াছিল।
খাতার পাতায় লেখা আছে—
‘২২শে চৈত্র। ১২৭২ সাল…’
এইটুকু পড়িয়াই নীরেন অবাক হইয়া যায়। কত কালের কথা! ১২৭২ সালেও পৃথিবী এমনি সুন্দর ছিল, এমনি বসন্ত নামিত এ পাড়াগাঁয়ের বন-বুকে, এমনি কোকিল ডাকিত রাত্রিদিনে? সে তখন ছিল কোথায়? কোন অতীত দিনের কাহিনি এসব?
মনে পড়ে আলিগড়ে তাদের দোতলার পড়ার ঘরে বসিয়া এই ডায়েরির পুরাতন তারিখগুলো সে পড়িয়া বিস্মিত হইত—কিন্তু তাহার চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়-রহস্যের অনুভূতি আজ তাহার মনে।
তারপর লেখা আছে—
‘আজ রামলোচন রায়ের প্রথম পক্ষের স্ত্রী উহাদের আমবাগানে হারাধন মুস্তফির সহিত ধরা পড়িলেন। ইহা লইয়া আজ জ্যাঠামশায়দের চণ্ডীমণ্ডপে সারাদিন ডামাডোল চলিতেছে। রামলোচনের স্ত্রী বলিয়াছেন তিনি নিন্দুষি। আমের গুটি ঝড়ে পড়িতেছে, তাহাই কুড়াইতে গিয়াছিলেন, হারাধন মুস্তফির কথা কিছু জানেন না। আজ রামলোচন রায়ের স্ত্রীকে দেখিয়াছি। বয়স হইলেও চাহিয়া থাকিতে ইচ্ছা করে। খুব সুন্দরী। সোনা কুমোরের বউ ইহার কাছে দাঁড়াইতে পারে না–’
