উচ্ছ্বসিত প্রশংসার সুরে বলিল—এমন রান্না কখনো খাইনি দিদিমা। শুনতাম বটে বাংলা দেশের পাড়াগাঁয়ের রান্নার কথা—কিন্তু এ যে এমন চমৎকার তা ভাবিনি—
বুড়ি হাসিয়া বলিল—রান্না করতে পারতেন আমার শাশুড়ি। তাঁর কাছেই সব শেখা। ডাকসাইটে রাঁধুনি ছিলেন আটখানা গাঁয়ের মধ্যি—
বুড়ির কথার মধ্যে যশোর জেলার টান নীরেনের বড়ো ভালো লাগিল।
শুইয়া শুইয়া উঠানের নারিকেল বৃক্ষশ্রেণির পাতার কম্পন দেখিতে দেখিতে নীরেন ভাবিতেছিল, এই তাহার স্বদেশ, তাহার অতিপ্রিয় স্বদেশ। এই তাহার মায়ের জন্মভূমি, পিতার জন্মভূমি, পূর্বপুরুষদের জন্মভূমি বাংলা দেশ। কেন এতকাল সে মাতৃভূমিকে ভুলিয়া ছিল। ভাগ্যের দোষ। সে কী জানিত এত সৌন্দর্য বাংলা দেশের রাত্রির অন্ধকারে? গন্ধভরা অন্ধকারে? পাখির ডাকের মধুর তান সে হিমালয়ে শুনিয়াছে। আলমোড়ায় ল্যান্সডাউনে শুনিয়াছে। তাহার ধনী মাতামহের সঙ্গে কয়েকবার সে-সব স্থানে সে গিয়াছিল। দেবতাত্মা নগাধিরাজ মাথায় থাকুন— মাথায় থাকুক ক্যামেলস-ব্যাক-এর অপূর্ব দৃশ্য, মুসৌরির অতুলনীয় গিরিশোভা এখানকার পক্ষীকুলের সুমিষ্ট কাকলী যেন বহুপরিচিত বিগত দিনের প্রিয়জনের বার্তা বহন করিয়া আনে, কত দিনের ঘরোয়া কাহিনি এদের সঙ্গে জড়ানো। বুড়ি বলিল—ঘুম হচ্চে না ভালো গরমে বুঝি? পাখা নেবা একখানা?
—না দিদিমা। নতুন জায়গা বলে ঘুম আসছে না, গরমে নয়।
–এবার ঘুমিয়ে পড়ো ভাই—
—হ্যাঁ দিদিমা—?
—কী ভাই?
—আমার বাবাকে আপনি দেখেছিলেন?
—না ভাই, আমার কোথাও যাতায়াত ছিল না। শুনিচি তাঁর কথা, দেখিনি কখনো—তোমাদের গাঁ ছিল তো—
—গড়মুকুন্দপুর।
—নাম শুনিচি, তবে যাইনি সেখানে।
সকালে উঠিয়া বুড়ি বলিল—হ্যাঁ ভাই, তোমরা শহরের লোক, সকালে কী খাও?
নীরেন হাসিয়া বলিল—যা খাই, তা কি দিতে পারবেন দিদিমা? চা?
বুড়ি বলিল—ও আমার পোড়া কপাল! ও-সব কখনো খাইনি ভাই, ও-সবের পাটও নেই। একটু বেলের শরবত করে দি। ডোবার ধারের বেলগাছটায় কাল দুটো পাকা বেল পেইছিলাম ভাই।
চায়ের বদলে বেলের শরবত! উপায় কী? খাইতেই হইল তাহাকে। বুড়ি বলিল —তুমি কি মনে করে এসেছিলে ভাই?
সেই কথাটা বলাই নীরেনের পক্ষে শক্ত। সে যেজন্য আসিয়াছে প্রিয় পৈতৃক পল্লিগ্রামটিতে, বৃদ্ধা কী সে কথা বুঝিতে পারিবে? সে বলিল—বেড়াতে এলাম দিদিমা।
—এর আগে কখনো আসনি?
—না দিদিমা।
দুপুরের আগেই তাহার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল এখান হইতে, কিন্তু বুড়ি ছাড়িল না। দুপুরের পরে রোদ অত্যন্ত চড়িল। বেলা চারটার আগে বাহির হওয়া সম্ভব হইল না। যাইবার সময় বুড়ি তাহার মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ করিল—এসো এসো, ভাই, তোমার সইমার সঙ্গে দেখাশুনো করে আবার এখানে আসবে কিন্তু। ভুলে যেয়ো না ভাই, আচ্ছা ভাই।
আধ ঘণ্টার মধ্যে নীরেন আসিয়া মাদারহাটির মাঠ ও জলার মধ্যে পড়িল। প্রকাণ্ড বিল, পদ্মফুল ফুটিয়া থই থই করিতেছে, পদ্মের পাতার ভিড়ে জল দেখা যায় না, একদিকে একটি অন্তরীপ মতোন স্থানে অনেকগুলি বড়ো বড়ো গাছ— নীরেনের ইচ্ছা হইল এই গাছগুলির তলায় সে কিছুক্ষণ বসিয়া বিশ্রাম করে। এই সুন্দর জলাভূমি যেন কাশ্মীরের ডাল বা উলার হ্রদের মতো শোভাময়, কিন্তু এসব স্থানে টুরিস্ট ব্যবসায়ীদের ঢাক পিটানোর শব্দ নাই, সুতরাং এমন সুন্দর একটি সৌন্দর্যময় স্থানে কখনো কেহ আসে না।
সইমাদের গ্রামটিতে জঙ্গল তত নাই—ব্রাহ্মণপাড়ায় অনেকগুলি কোঠাবাড়ি, প্রায়ই সব চাষি গৃহস্থ, বড়ো বড়ো গোলা উঠানে, গোয়ালবাড়ি-ভর্তি গোরু। একজনের উঠানে দোতলা বাড়ি তৈয়ারি হইতেছে, উঠানের বাতাবী লেবুগাছের তলায় মজুরেরা দুমদাম শব্দে সুরকি ভাঙিতেছে। নীরেন সেখানে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল—চক্কত্তিদের বাড়ি যাব কোন দিকে?
একজন বলিল—কোন চক্কত্তি? অনেক চক্কত্তি আছে এ গাঁয়ে।
ভুবনমোহন চকত্তি—
—সে ও-পাড়ায়। ওই তেঁতুলগাছের পাশে রাস্তা দিয়ে যান—
আধঘণ্টা পরে সে সইমাকে প্রণাম করিয়া তাঁহার প্রদত্ত পিঁড়িতে বসিয়া কথাবার্তা বলিতেছিল। নীরেন দেখিল তাহার সইমার বয়স খুব বেশি নয়, মাথার চুল এখনও একগাছি পাকে নাই, রং বেশ ফর্সা, দোহারা চেহারা, এক সময়ে যে ইনি সুন্দরী ছিলেন, এখনও দেখিলে বোঝা যায়।
সইমা চোখের জল ফেলিলেন। অনেক আশীর্বাদ করিলেন। পাকা বেলের শরবত, মুগের ডাল ভিজানেনা ও আখের গুড় খাইতে দিলেন। সইমাকে পাইয়া নীরেন যেন হারানো মায়ের সান্নিধ্য বহুদিন পরে অনুভব করিল। সে সইমাকে কখনো দেখে নাই এর আগে। সইমা কিন্তু তাহাকে দেখিয়াছিলেন সে যখন দুই বৎসরের খোকা তখন। প্রৌঢ়া মহিলার বহু পুরোনো দিনের শোকস্মৃতি উথলাইয়া উঠিল আজ তাহাকে পাইয়া। এমন কত লোকের নাম করিতে লাগিলেন যাহাদের কথা মায়ের মুখে আলিগড়ে নীরেন শুনিত বাল্যকালে—কত বাল্যস্মৃতি-জাগানো নামাবলী। দেশের-ঘরের সব লোকের নাম। বাঁচিয়া আছে কেউ কেউ এখনও তবে বেশির ভাগই মারা গিয়াছে।
সইমা বলিলেন—তোর মুখে সইয়ের মুখ যেন মাখানো রয়েছে—
নীরেন হাসিয়া চুপ করিয়া রহিল।
—সই বড়ো সুন্দরী ছিল। গ্রামের কাজকর্মে যখন সেজেগুজে নেমন্তন্ন খেতে কি বিয়েথাওয়ায় জল সইতে যেত তখন লোকে দু-দণ্ড চেয়ে দেখত। এদানি রোগে-শোকে আর কিছু ছিল না চেহারার। এখান থেকে চলে যাওয়ার পরে আর কখনো দেখা হয়নি সইয়ের সঙ্গে। সে কতদিন হবে রে নীরু?
