নীরেন এই ডায়েরিটুকু পড়িয়া কতবার মনে মনে হাসিয়াছে।
পিতামহ গদাধর মুখুয্যে বহুকাল সাধনোচিত ধামেই সম্ভবত প্রস্থান করিয়াছেন, নীরেনের মায়ের বিবাহ তখনও হয় নাই। সে পিতামহের কার্যের সমালোচনা করিতেছে না, তবুও মনে হয় এই কুম্ভকার বধূটির এইখানে উল্লেখ থাকার কারণ কী? বিশেষ করিয়া ঠাকুরদাদা ইহারই নাম করিলেন কেন? গ্রামের সুন্দরীশ্রেষ্ঠা বলিয়া? না—
হায় রে সে ১২৭২ সাল! আর রামলোচন রায়ের নিরপরাধা সুন্দরী পত্নী যিনি নির্জন দুপুরে বাগানে আমের গুটি কুড়াইতে গিয়া হারাধন মুস্তফির সঙ্গে নিজের নাম যোগ করিবার সুযোগ দিয়া মিথ্যা কলঙ্ক কুড়াইয়াছিলেন একদিন প্রায় আশি বৎসর পূর্বের এক সুমধুর কোকিলমুখরিত, পুষ্পসুবাসামোদিত, প্রেমোচ্ছল বসন্তদিনে—কোথায় তিনি? আর কোথায় তাঁহার রূপের প্রতিদ্বন্দ্বী সোনা কুম্ভকারের রূপসী বধূ? আজ এইসব পল্লিগ্রামের মাটিতে তাঁহাদের নাম নিশ্চিহ্ন হইয়া মুছিয়াই যাইত যদি না তাহার পরলোকবাসী পিতামহ গদাধর মুখুয্যে এত ঘটা করিয়া উক্ত বধূদয়ের ইতিহাস তাঁহার ডায়েরিতে নিঃস্বার্থভাবে লিখিয়া রাখিতেন।
হাসি পাইবার কথাই তো।
নীরেন ডায়েরি বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িল, কিন্তু আজ রাত্রে তাহার বংশের পূর্বপুরুষেরা যেন ভিড় করিয়া আশেপাশে তাঁহাদের অদৃশ্য অস্তিত্ব জ্ঞাপন করিতেছেন। তাঁহাদের ইতিহাস ভালো করিয়া জানিবার জন্যই তো সে এত কষ্ট স্বীকার করিয়া বাংলা দেশে তাহার জন্মভূমি অঞ্চলে আসিয়াছে এতকাল পরে। তাঁহারা ঘুমাইতে দিবেন না।
সকালে সইমা ডাকিয়া ঘুম ভাঙাইলেন—ও নীরু, ওঠ বাবা, বেলা ঝাঁ ঝাঁ করচে–
নীরেন ধড়মড় করিয়া বিছানার উপরে উঠিয়া বসিল। সইমা বলিলেন—তোর আবার চা খাওয়ার অভ্যেস আছে, না?
—ছিল তো সইমা।
—এখানে কী করি উপায় তাই ভাবচি—
—ভাবতে হবে না। এখানে না-হলেও চলবে।
—তা কী হয় বাবা? দেখি। যার যা অভ্যেস—
—না সইমা, কিছু চেষ্টা করতে হবে না। তাহলে আমি দুঃখিত হব। সইমা কিছু না-বলিয়া চলিয়া গেলেন। কিন্তু আধঘণ্টা পরে এক পেয়ালা ধূমায়িত চা আনিয়া তাহার সামনে রাখিলেন এবং একটা বাটিতে একবাটি মুড়ি। রায়বাড়ি হইতে চা চাহিয়া আনিয়াছেন, সেখানে বাড়িসুদ্ধ সবাই চা খায়।
নীরেন চা পাইয়া মনে মনে খুশি হইল। মুখে বলিল—কেন বলুন তো এসব পরের বাড়ি থেকে আনতে যাওয়া!
সইমা বলিলেন—তোর মা থাকলে করত না?
—তা কী জানি।
করত রে করত! শুনবি তোর মায়ের কথা?
—কী, বলুন?
—তোর মা বড্ড শান্ত ছিল।
—মাকে আমি দেখেচি, শান্ত ছিলেন সবাই বলত।
—একবার সই আর আমি নাইতে গিয়েচি ঘাটে। সাঁতার দিয়ে দুই সই মিলে নদীর মাঝখানে গিয়েচি। এমন সময় ঘাট থেকে কে চেঁচিয়ে বললে নদীতে কুমির এসেচে। আমরা তো তাড়াতাড়ি ঘাটের দিকে এগুচ্চি, এমন সময় সইকে আমি ভয়ে জড়িয়ে ধরলাম। সই যত বলে ছাড়ো ছাড়ো, দুজনেই ডুবে যাব, আমি ততই ভয়ে সইকে জড়াই।
নীরেন রুদ্ধ নিশ্বাসে বলিল—তারপর?
—তারপর আর কী? দুজনেই বেঁচে উঠলাম, একখানা নৌকো আমাদের এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে ছুটে এল।
—তখন আপনারা একগ্রামেই থাকতেন?
—হ্যাঁ রে, নইলে আর সই বলব কী করে? পাগল ছেলে আর কী! কথাটা নীরেন সন্ধ্যাবেলা তাহার খাতায় লিখিয়া রাখে।
গ্রাম্য-জীবনের কোনো কথা সে বাদ দিতে চায় না। মরুপৰ্বত ভেদ করিয়া সুদূর পাঞ্জাব হইতে ছুটিয়া আসা (কোনো কটাক্ষ কেহ করিবেন না) তবে কীসের জন্য?
সইমার শ্বশুরবাড়ি এটা। কিন্তু একটি দেওরপো ছাড়া এখানকার বাড়িতে কেহ থাকে না। দুটি দেওর বাহিরে চাকুরি করে, সেখানেই পরিবার লইয়া থাকেঃ; যে দেওরপো এখানে আছে ওটি পিতৃমাতৃহীন অনাথ। জ্যাঠাইমার কাছে মানুষ হইতেছে। জ্যাঠাইমা ভালোও বাসেন।
দেওরপোর নাম কানু। কানু নীরেনকে খুব ভালো চোখে দেখে নাই। এই দুর্মূল্যের বাজারে ইনি আবার কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিলেন। কেন রে বাবা। যে তিন বিশ ধান হইয়াছিল, ইনি এখানে আসিলেন,—তাহাতে ক-দিন যায়? জ্যাঠাইমাও দেখিতেছি নীরু বলিতে অজ্ঞান। কানু আসিয়া বলিল—যাত্রা দেখতে যাবেন?
—কী যাত্রা?
—এই দিগি-গোনাই যাত্রা।
—সে আবার কী?
—দেখবেন এখন। দিন দিকি একটা টাকা চাঁদা।
নীরু একটা টাকা বাহির করিয়া কানুর হাতে দিল।
গোনাই যাত্রার আসরে বসিয়া নীরেন যাত্রা তত দেখে নাই, যত সে এই সুন্দর রাত্রিটি ও যাত্রার আসরের পরিবেশের কথা চিন্তা করিয়াছে। যেখানে যাত্রার আসর, সেটা ছোটো একটা মাঠ, তার চারিপাশে বনজঙ্গল, একদিকে বনের প্রান্তে একটা কামারের দোকান, সেখানে এখনও হাপরে আগুন জ্বলিতেছে। বাঁশের খুঁটিতে পাল টাঙানো হইয়াছে। পান-বিড়ির দোকান বসিয়াছে, চাষা লোকে যাত্রা দেখিতে আসিয়া পানের দোকানের সামনে ভিড় করিতেছে। একটা মুচুকুন্দ চাঁপার গাছতলায় ফুল পড়িয়া বিছাইয়া আছে। বাতাসে মুচুকুন্দ চাঁপার সুবাস।
একটি গ্রাম্য মেয়ে ছিল গোনাই বিবি। তারই সুখ-দুঃখের কাহিনি। নীরেনের পক্ষে এমন বিশেষ কিছু নয়, কিন্তু যারা শ্রোতার দল, তাদের সারারাত্রি জাগিয়া দেখিবার বস্তু। ভ্রাতার বিরহে কাতরা তরুণী গোনাই বিবির সে করুণ গান, ‘ও বছির, বছির রে, বৈঠা হাতে নিলি রে’ অনেকের চোখে জল আনিয়া দিল।
নীরেন ভাবিতেছিল বহুদূরের লিপুলেক গিরিবৰ্ম্মে বরফ গলিয়াছে। দলে দলে ঝববুর পিঠে বোঝাই দিয়া যাত্রীরা চলিয়াছে মানস সরোবরে ও কৈলাসের পথে। গুরলা মান্ধাতার তুষারাবৃত শৃঙ্গ সায়াহ্নদিনের সূর্যকিরণে সোনার রং ধরিয়াছে। তাহার দাদামহাশয়ের বন্ধু করালীচরণ মজুমদার সস্ত্রীক এই মাসের শেষে মানস সরোবরে রওনা হইবেন, সঙ্গে যাইবেন নীরেনের দিদিমা ও বড়ো মামিমা, বাড়ির গোমস্তা নাদু চক্কত্তি। আলিগড় হইতে আলমোড়া। আলমোড়া হইতে ধারচুলা। ধারচুলা হইতে লিপুলেক পাস। লিপুলেক হইতে মানস সরোবর। সে নিশ্চয় যাইত ওখানে থাকিলে।
