একটা লোক প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে দাঁড়াইয়া প্ল্যাটফর্মে সাজানো দূর্বাঘাসের ওপর গোরু ছাড়িয়া দিয়া গোরুর দড়ি হাতে দাঁড়াইয়া ছিল। নীরেনের আহবানে সে নিকটে আসিল। নীরেন বলিল—রামচন্দ্রপুর কতদূর জানো?
লোকটা বলিল—কেন জানব না? মেটিরি রামচন্দ্রপুর তো? এখেন থে ঝাড়া তিনকোশ পথ—
—তিন কোশ!
—হাঁ বাবু। কনে যাবেন সেখানে?
–বাঁড়ুয্যে-বাড়ি।
—তা যান বাবু এই পথ দিয়ে—
নীরেনের কাছে এসব একেবারেই নতুন। এই আসন্ন সন্ধ্যায় মাঠের মধ্যের পথ দিয়া সে যাইবে তিনক্রোশ দূরের গ্রামটিতে। ওই মাঠের মধ্যে কত মাটির ঘরে ভর্তি পাড়াগাঁয়ের পাশ কাটাইয়া তাহাকে যাইতে হইবে। মাত্র ছাব্বিশ বৎসর বয়স যার—দুনিয়া তার পায়ের তলায়, সে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে স্বর্ণখনির সন্ধানে বাহির হইতে পারে, সে উত্তরমেরু-অভিযানে একঘণ্টার নোটিশে যোগ দিতে পারে, মাত্র একটা ছোটো সুটকেসের মধ্যে টুথব্রাশ আর তোয়ালে পুরিয়া।
চৈত্র মাস। স্টেশনের পিছনে মাঠের ধারে বড়ো একটা নিম গাছ। ফুটন্ত নিমফুলের ভুরভুরে সুবাস বাতাসে। নিমগাছ অবশ্য তাদের আলিগড়েও আছে, কিন্তু এমন রহস্যময়ী অজানা সন্ধ্যা মাঠের প্রান্তে তাহার জীবনে ক-টা নামিয়াছে?
নীরেন জানে, যদিও সে দিল্লি ও আলিগড়ে মানুষ, একবার কানপুরে আসিয়া ভাবিয়াছিল, প্রায় বাংলা দেশের কাছে আসিয়া পড়িয়াছে বুঝি। পাঞ্জাবের অসম জলহাওয়ায় তার শরীর গড়িয়া উঠিয়াছে—হয় ভীষণ শীত, নয়তো দুর্দান্ত গরম— একশো বত্রিশ ডিগ্রি উত্তাপের হাওয়া গা-হাত-পা পুড়াইয়া বহিতেছে—সেখানে গ্রীষ্মের দুপুরে বসিয়া বসিয়া বাদশাহী তয়খানা ও সুন্দরী ইরানিদের স্বপ্ন লুর আগুনে ঝলসাইয়া যায়।
নীরেন মাঠের মাঝখানের পথ বাহিয়া হনহন করিয়া হাঁটিয়া চলিল। দূর মাঠের প্রান্তে চাঁদ উঠিতেছে—নিশ্চয় আজ পূর্ণিমা, নতুবা সন্ধ্যার পরে চাঁদ উঠিবে কেন? দু-খানা গ্রাম পথে পড়ে—রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া গ্রাম্য লোকেরা দেখিতেছে। একজন বলিল—কনে যাবা?
–রামচন্দ্রপুর।
—বাড়ি কনে?
–কলকাতা।
কলকাতা বলাই সহজ, কারণ আলিগড় বলিলে ইহারা কিছুই বুঝিবে না। কিছুদূর গিয়া আর একটি ক্ষুদ্র পল্লি-নীরেন্দ্র নাম জিজ্ঞাসা করিল। রাস্তার ধারেই একটা পুরোনো কোঠাবাড়ি, গোটা দুই নারিকেল গাছ, দুটি বড়ো ধানের গোলা নারিকেল গাছটির তলায়। জন পাঁচ-ছয় লোক গোলার কাছে উঠানে বসিয়া তামাক খাইতে খাইতে কথাবার্তা বলিতেছে—নীরেনকে দেখিয়া বলিল—বাড়ি কোথায়?
–কলকাতায়।
—এদিকি কোথায় যাওয়া হবে?
—রামচন্দ্রপুর।
তাহারা পরস্পর চাওয়াচায়ি করিয়া বলিল—এই রাত্তিরি সেখানে যাতি পারবেন না।
নীরেন বলল—কেন?
—তিনকোশ পথ এখান থেকে, তা ছাড়া গরমকাল, মাঠের পথ, সাপ-খোপের ভয়। কার বাড়ি যাবা রামচন্দ্রপুর?
—বাঁড়য্যে-বাড়ি।
—কোন বাঁড়য্যে-বাড়ি? সে গাঁয়ে ব্রাহ্মণ তো নেই?
—এক বুড়ি আছে না?
—আছেন বটে এক মা ঠাকরুন। ওই বাঁওড়ের ধারে গোলাবাড়িতে থাকেন। তা তিনি আবার মাঝে মাঝে তাঁর জামাইয়ের বাড়ি যান কিনা? দেখুন আছেন কিনা।
সেখানে পৌঁছাইতে নীরেনের বড্ড রাত হইয়া গেল। গ্রামটিতে চারিধারে বাঁশবন আমবনের নিবিড় ছায়া, প্রথমেই গোয়ালাদের পাড়া, তারপর বড়ো মাঠ একটা, গোটা দুই বড়ো পুকুর শ্যাওলায় ও কচুরিপানায় ভর্তি।
পথের ধারে একটা খড়ের ঘরে তখনও টিমটিম করিয়া আলো জ্বলিতেছিল। নীরেনের প্রশ্নের উত্তরে একটি লোক উত্তর দিল, সেই গ্রামই রামচন্দ্রপুর বটে। বাঁড়ুয্যেবাড়ির বুড়ি? হ্যাঁ, আর একটু আগে বাঁওড়ের ধারে সারি সারি নারিকেল গাছওয়ালা বড়ো আটচালা খড়ের ঘর।
নীরেন বাড়ি খুঁজিয়া বাহির করিল। বড়ো একখানা আটচালা ঘরের পাশে ছোটো রান্নাঘর, সেখানে আলো জ্বলিতেছিল।
নীরেন উঠানে দাঁড়াইয়া ডাকিল—বাড়িতে কে আছেন? একটি বৃদ্ধা টেমি হাতে বাহিরে আসিয়া বলিলেন—কে ডাকে?
—আমি।
—কে বাবা তুমি?
—আমাকে কি চিনতে পারবেন? আমি আলিগড় থেকে আসছি।
বুড়ি টেমিটা উঁচু করিয়া তুলিয়া ধরিয়া নীরেনের মুখ দেখিবার চেষ্টা করিল। তাহার মুখে কৌতূহল ও সন্দিগ্ধতার রেখা। হাতের তালু চোখের উপর আড় করিয়া ধরিয়া আলো হইতে চোখ বাঁচাইবার ভঙ্গি করিয়া আরও দু-এক পা আগাইয়া আসিয়া বলিল—কে বাবা?
—আমার বাবার নাম রাজকৃষ্ণ মুখুয্যে—
বুড়ি আপন মনে বিড় বিড় করিয়া বলিল—রাজকেষ্ট? রাজকেষ্ট?
—আমাদের পৈতৃক বাড়ি ছিল গড়মুকুন্দপুর—আমার ঠাকুরদাদার নাম তারিণীচরণ মুখুয্যে—আমার মায়ের বাপেরবাড়ি ছিল সামবেড়ে, মায়ের নাম ছিল অমিয়বালা—
—ও! এখন বুঝলাম। তুমি আমার মেয়ের সইয়ের ছেলে!
—হ্যাঁ দিদিমা।
–এসো এসো ভাই। কত কালের কথা সব। তোমাদের মুখ দেখে মরব এইটুকু বোধ হয় ছিল অদেষ্টে। আর সবাই ছেড়ে গিয়েছে বাবা, শুধু আমিই পড়ে আছি!
—সইমা কোথায়?
—সে তো আজকাল এখানে থাকে না। সে থাকে তার শ্বশুরবাড়ি, এই পাশের গাঁ।
—আমি তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি।
—আজ রাত্তিরে এখানে থাকো। কাল যেয়ো এখন সকালে। এখান থেকে দু কোশ।
—এই যে বললেন পাশের গাঁ?
—মধ্যে মাদারহাটির মাঠ আর জলা পড়ে যে ভাই। দু-কোশের বেশি ছাড়া কম হবে না।
নীরেন হাত-পা ধুইয়া ঠাণ্ডা হইয়া বসিল। এ যেন নতুন একটা জগতে সে আসিয়া পড়িয়াছে। এমন দেশে সে কখনো আসে নাই। যে দেশে তাহার জন্ম, সে দেশে এত বনজঙ্গল কেহ কল্পনা করিতে পারে না গ্রামের মধ্যে। নতুন ধরনের গাছপালা, অসংখ্য পাখির কলকাকলী, বনফুলের মৃদু সৌরভ। বুড়ির রান্না শেষ হইতে রাত দশটা বাজিল। কেবল সোঁদা সোঁদা মাটির গন্ধ বাহির হওয়া লেপাপোঁছা মাটির ঘরের দাওয়ায় কলার পাতা পাতিয়া বুড়ি তাহাকে খাইতে দিল। রাঙা আউশ চালের ভাত, পেঁপের ডালনা, সোনা-মুগের ডাল, উচ্ছেভাজা, আলুভাতে, ঘন আওটানো সরপড়া দুধ, দুটি পাকা কলা, একদলা আখের গুড়ের পাটালি। অদ্ভুত রান্না বুড়ির হাতের। আলিগড়ের পশ্চিমা পাচকের হাতের রান্না খাইয়া সে আজীবন অভ্যস্ত—এমন চমৎকার রান্নার সঙ্গে পরিচয় ছিল না।
