ইচুর বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেল। নিমিকে বললে—ভাত বেঁধেছিস?
—এ বেলা শরীরডে খারাপ। পানি দেওয়া ভাত আছে, খাও।
–তরকারি?
—কিছু নেই।
—এই ঝিঙে ক-টা বেঁধে দে।
—রাঁধব কী দিয়ে, তেল কনে? পাঁচ পলা ধার করে এনেলাম আছিরন বিবির কাছ থে। এখনও শোধ দিতে পারিনি—আবার কী ধার করতি ছোটব?
—পোড়া?
নিমি খিল খিল করে হেসে উঠে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বললে—ও মা, মুই কনে যাব গো! ঝিঙে পোড়া কেউ কখনো শুনিনি। খেতি পারবা না।
—পারব পারব। দে তুই।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হল পাকাটির আলো জ্বেলে। তেল নেই। অন্ধকার ঘরদোর। কে আসে, কে যায়, কিছু বোঝা যায় না। কচুঝাড়ে কেয়োঝাঁকার ঝোপে জোনাকি জ্বলছে, উঁচুনীচু উঁচুনীচু। দেবতা ঝিলিক মারছে, রাত্রে বৃষ্টি হবে বোধ হয়। ভাদ্রের গুমোট গরম। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে ইচু যেমন মাদুর পেতে শুয়ে পড়েছে তখনই রাজ্যের ঘুম এসেছে ওর চোখে। আর জ্ঞান নেই।
কতক্ষণ পরে সে জানে না, লোকজনের গোলমালে ইচু শেখের ঘুম ভাঙল। অনেক লোকের গলা বাইরে। ওরই বাড়ির উঠোনে।
—ব্যাপারখানা কী?
পাড়ার মোড়ল হাফেজ বুড়োর গলা—ও ইচু, ইচু বাড়ি আছ?
বছিরদ্দি শেখ ডাকছে—ও ইচু, বলি ওঠো—শোনো ইদিকি।
ভোর সবে হয়েছে। কাক-পক্ষী ডাকতে শুরু করেছে। ইচু ধড়মড় করে উঠেবসে চোখ মুছলে। ফজরের নামাজের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু এত লোক ওর উঠোনে কেন? তাকে ডাকাডাকিই বা কীসের এত সকালে? বাইরে এসে ঘুমচোখে উঠোনের দিকে চেয়ে ও অবাক হয়ে গেল। পাড়াসুদ্ধ মানুষ সব ওর উঠোনে। সে বিস্মিত সুরে বললে—কী হয়েছে গো মোড়লের পো?
বুড়ো হাফেজ মণ্ডল বললে—ইদিকি এসো।
—আগে নামাজটা করে নিই—দেরি হয়ে গিয়েছে।
ইচু ঘরের পেছনের দাওয়ায় নামাজ সেরে নিয়ে আবার সামনে এল। সবাই ওর দিকে একসঙ্গে এগিয়ে এল। সবাই মিলে যেন একসঙ্গে ওকে কী বলতে চায়। ইচু ক্রমেই উদবিগ্ন হয়ে উঠছে, ওর বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ করছে। ভয়ও হয়েছে ওর, নিমি এ সময়ে কোথায় গেল? হয়েছে কী?
অন্য সবাইকে থামিয়ে দিয়ে হাফেজ বললে–-এসো মোর সঙ্গে।
ইচু শেখ ওদের পেছনে পেছনে কলের পুতুলের মতো চলল। রেললাইনের দিকে সকলেই যাচ্ছে। নাবাল খেতের একহাঁটু জল পার হয়ে সবাই রেললাইনে উঠল। একটা খেজুর ঝোপের আড়ালে রেললাইনের ওপর উঠে সবাই দাঁড়াল থমকে। হাফেজ ডেকে বললে—এখানে এসো।
কী ব্যাপার? ইচু এগিয়ে গিয়ে যা দেখলে তাতে তার মাথা ঘুরে গেল, সে নিজেকে পড়তে পড়তে সামলে নিলে। রেললাইনের ওপরে একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ—গলা সামনের দিকে গভীরভাবে কাটা, দেহের সঙ্গে একটি অস্বাভাবিক কোণের সৃষ্টি করে চিৎ হয়ে পড়ে আছে।
মৃতদেহ নিমির।
তার পর তার ভালো কিছু মনে পড়ে না। গ্রামের লোকে মিলে তাকে কত কিছু প্রশ্ন করতে লাগল। সে কোথায় ছিল, নিমি কতক্ষণ ঘরে ছিল, নানা প্রশ্ন। নিমি রেলে গলা দিয়ে মরেনি, তাকে নাকি খুন করে টেনে এনে রেলে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। ইচু বুঝতে পারলে তার ওপর অনেকের সন্দেহ এসে পড়েছে। পাশের গাঁয়ে দফাদারদের সংবাদ দিতে লোক যাবে এখুনি, তার আগে ইচুকে একবার জিজ্ঞেস করা দরকার, সে কোথায় ছিল তা জানা দরকার সেইজন্যেই গ্রামের লোক তার বাড়িতে গিয়ে ডাকাডাকি করছিল।
ইচু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে বললে—মুই কিছু বলতে পারিনে চাচা, আল্লা জানে। মুই মড়ার মতো ঘুমুতি নেগেলাম।
—বউরি কিছু বললে? ঝগড়া হয়েল?
—কিছু না চাচা।
–বউ ঘরে শুয়েল? ইচুর মনে একটা ভয়ানক সন্দেহ উঁকি মারলে। এ প্রশ্ন করে কেন লোকে? বছিরদ্দি শেখ এগিয়ে এসে ওকে উঠিয়ে বললে—মোর কথা সবাই শোনো। ইচু সেরকম লোক নয়। চলো এখুনি বনগাঁয়ে ওকে নিয়ে মোক্তার বাবুদের কাছে। বিহিত কথা তাঁরা বলবে, তাঁদের পরামর্শটা নেওয়া দরকার। এখানে থাকলি এখুনি দফাদার এসে ওকে বাঁধবে। তার আগে চলো মোরা ছ-সাত জন ওরে নিয়ে বনগাঁয়ে যাই। পরামর্শ লিয়ে ফেলি। পুলিশ গ্রেপ্তার করবার আগেই। কে কে যাবা?
দেখা গেল প্রায় সকলেই যেতে চায়।
ইচু ভগ্নস্বরে বলে—কিন্তু উকিল মোক্তার বাবুদের ট্যাকা মুই কন থে দেব? মোর হাতে একটা ট্যাকা আছে কালকার জনের দরুন। তাতে হবে?
হাফেজ বললে—ট্যাকার জন্যি তোমার ভাবনা হচ্ছে কেন। তোমার জান যদি বাঁচে কত টাকা হবে। সে ভাবনা মোদের। তুমি চলো দিনি। কী বলো বছিরদ্দি?
বছিরদ্দি বললে—তা নিচ্চয়। টাকার জন্যি তুমি ভেব না। সে মোরা দ্যাখব। হাফেজ বললে—রেললাইন ধরে চলে যাওয়া যাক। সোজা রাস্তা দিয়ে গিলে পুলিশি ধরবে।
বেলা সাড়ে সাতটার মধ্যেই ওরা বনগ্রামের বড়ো মোক্তার রামলাল চাটুজ্যেমশায়ের বাসায় পৌঁছে গেল। রামলালবাবু বেশিক্ষণ ওঠেননি, সেরেস্তায় বসেই চা খাচ্ছেন এবং মুহুরি দুলাল চক্রবর্তীকে বিলম্ব করে আসার জন্যে তিরস্কার করছেন—কাল চলে গেলে কাছারি থেকে বাড়ি, জামিননামা দুটো সই করাতে হবে, তোমার সে খেয়াল থাকে না। এখন এলে আটটার সময়—এমন করলে কী করে আমি কাজ চালাই? ওদের দরখাস্তের নকল নেওয়া হয়েছে?
–আজ্ঞে, নকলের জন্যে দরখাস্ত করা হয়েছে। কাল বিনয়বাবু সকাল সকাল চলে গিয়েছিল, দেখা পাইনি।
—সকালে কাছারিতে গিয়ে আজ নকল দু-খানা বার করে ফেলো আগে নইলে জেরাই হবে না। কে? কোথেকে আসা হচ্ছে?
হাফেজ মণ্ডল এগিয়ে এসে নীচু হয়ে ডান হাত তুলে কপালে ঠেকিয়ে বললে —সালাম, বাবু।
