—কী ব্যাপার? বাড়ি কোথায়?
হাফেজ মণ্ডল বললে—বিপদে পড়ে অ্যালাম বাবুর কাছে। বড় বিপদে পড়ে গিয়েছি। খুনের ফ্যাসাদ।
রামলালবাবু প্রবীণ মোক্তার। মোক্তারি ব্যাবসায় চুল পাকিয়েছেন—শক্ত কেসে লোক যখন পড়ে, তখন দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পয়সা খরচ করে, ধীরভাবে সে পয়সা আদায় করতে হয়। সুতরাং একটা সিগারেট ধরিয়ে (প্রবীণ হলেও রামলালবাবু তামাক খান না, সিগারেটখোর) আরাম করে টান দিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন—খুন? কীরকম খুন?
হাফেজ ইচুর দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে—এই লোকের বউকে গলা কাটা অবস্থায় কাল রাতে রেললাইনে পাওয়া গিয়েছে।
—ওর নাম কী?
—ইচু।
—ও রাত্রে কোথায় ছিল?
–বাড়িতেই শুয়েছিল বাবু।
–বউ-এর স্বভাবচরিত্র কেমন?
হাফেজ চুপ করে রইল। সে প্রবীণ লোক, গ্রামের মোড়ল—তার মুখ দিয়ে আর ও কথা বার হয় কেন? বছিরদ্দি শেখ পাশ থেকে ঈষৎ গলা খাঁকার দিয়ে নিয়ে বললে—বাবু, ভালো না।
ইচু অবাক হয়ে বছিরদ্দির মুখের দিকে চেয়ে রইল। নিমির স্বভাবচরিত্র ভালো ছিল না? কই, একদিনও তো সে কিছু জানে না। সে নিমির স্বামী, সে-ই কেবল জানে না, আর সবাই জানে!
হাফেজ চুপ করেই রইল। বছিরদ্দি বলে যেতে লাগল—বাবু, এ লোক বড্ড ভালোমানুষ—নিরীহ ভালোমানুষ। ও কিছু জানে না এসব কথা। খুনও ও করেনি।
রামলাল মোক্তার বাধা দিয়ে ধমকের সুরে বললেন—তুমি কী করে জানলে? তোমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে লোকে খুন করবে নাকি? যা তুমি জানো তাই বলো, যা জানো না তা নিয়ে জ্যাঠামি কোরো না। যাও বোসো ওখানে।
পরে হাফেজের দিকে চেয়ে বললেন—তুমি কী জানো বলো মোড়ল।
বছিরদ্দির অবস্থা-বিপর্যয়ে হাফেজ একটু ভয় খেয়ে গেল। সমীহ করে সংযত হয়ে বললে—আজ্ঞে বাবু যা বলছেন, অতি লেহ্য কথা। তবু ইচু আমাদের লোক ভালো। সবাই এ কথা জানে। আপনি সব লোককে জিজ্ঞেস করো, সবাই এ কথা বলবে।
রামলালবাবু সিগারেটে টান দিয়ে বললেন—ঘটনা বলো।
হাফেজ ঘটনা বর্ণনা করলে। ইচু মণ্ডলের মুখে যা সে শুনেছে। জন-খেটে এসে অঘোরে ঘুমুচ্ছিল, সবাই গিয়ে ডেকে ওর ঘুম ভাঙায়। ও বলেছিল, রাত্রে ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়ে ছিল, কী হয়েছে না-হয়েছে কিছু জানে না। শোবার আগে ওর স্ত্রী ওকে ভাত খেতে দিয়েছিল। ঝগড়া-বিবাদ হয়নি।
—আত্মহত্যা নয়?
—না বাবু। গলায় অস্তরের দাগ দেখলিই বোঝা যায়। গলা কেটে রেললাইনি ফেলে রেখেছিল।
রামলালবাবু বললেন—অন্তত তাই প্রিজামশন হবে। পুলিশেও তাই বলবে। লাশ দেখে কে আগে?
বাবু, মোর ভাই আর নবি শেখ সকালে রেললাইনির ধারে নালায় মাছ ধতি যাচ্ছিল, তারাই দেখতি পায়। পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে আমারে খবর দেয়। মুই তখনি দৌড়ালাম লাইনির ধারে।
—আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি, থাক। সুরতহাল আগে হয়ে যাক, তার পরে দেখা যাবে। গ্রামের দফাদারকে খবর দিয়ে এসেছ তো? বেশ করেছ। বড্ড শক্ত কেস। সন্দেহ গিয়ে ইচু মণ্ডলের উপরই পড়বে। বউ-এর স্বভাবচরিত্র খারাপ ছিল। ভালোমানুষ লোক হঠাৎ রেগে উঠলে এসব ক্ষেত্রে ভয়ানক হয়ে ওঠে কিনা। তোমরা লুকিয়ে চলে এসেচ?
—হ্যাঁ বাবু।
—একটা কথা শিখিয়ে দিই। ইচু?
ইচু এগিয়ে গিয়ে সেলাম করে দাঁড়াল। তার পা-দুটো ঈষৎ কাঁপছে।
—বলি শোনো। তুমি খুন করেছ কী না-করেছ তা আমি তোমায় জিজ্ঞেস করব। আমাদের তা কাজ নয়। আমরা ধরে নেব তুমি খুন করোনি। কিন্তু পুলিশে তা শুনবে না। তোমাকে আজ সম্ভবত রাস্তায় যেতে যেতেই গ্রেপ্তার করবে। তোমায় স্বীকার করাবার জন্যে নানারকম চেষ্টা হবে। কিন্তু কিছুতেই তুমি বোলো না যে তুমি খুন করেছ। স্বীকার কিছুতেই করবে না। করেই থাকো বা না-ই করে থাকো। বুঝলে? যাও, সাবধানে যাও।
হাফেজ বললে—বাবু, পুলিশি ধরলি রাখবে কনে ওরে?
—রাখবে হাজতে। যতদিন না বিচার শেষ হয়। তবে এখানে শেষবিচার হবে না—দোষী প্রমাণ হলে দায়রায় চালান হবে যশোরে। সেখানে জজসাহেব বিচার করবেন। বাড়ি গিয়ে পয়সাকড়ি জোগাড় করো গিয়ে—বড্ড ফ্যাসাদে পড়ে গিয়েছ—অনেক টাকার খেলা।
হাফেজ ও বছিরদ্দি সব শুনে যেন মাটির মধ্যে বসে গেল। বনগাঁয়ে মোক্তারবাবুর টাকাই জোগাড় হয় না, আবার যশোর জেলায় কোর্টের উকিলবাবুদের টাকা গরিব গ্রামের লোকের চাঁদায় কি জোগাড় হয়ে উঠবে? ইচুকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে উঠল।
এতক্ষণ পরে ইচু কথা বললে। এতক্ষণ সে একটি কথাও বলেনি। এইবার সে হাতজোড় করে বললে—বাবু, মোর একটি কথা বলবার আছে।
ওর মুখের দিকে সবাই চাইলে। মোক্তারবাবুও চাইলেন। এইবার বোধহয় সব প্রকাশ করতে চাইছে লোকটা। এইরকমভাবেই বলে তিনি জানেন। হাফেজ ও বছিরদ্দি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে। কী জানি ওর পেটে কী আছে। মানুষকে সবসময়ে বাইরে থেকে চেনা যায় না।
রামলাল মোক্তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে চাইলেন। ভাবটা এইরকম—বলে ফেলো বাপু যা আছে পেটে। অমন অনেক ঘুঘুই আমরা দেখলাম, তুমি এখন বাকি আছ।
ইচু রামলালবাবুর পা-দুটো জড়িয়ে ধরে বললে—বাবু, মোর একটা দরবার আছে। যাতে হয় আপনি তা দেখবেন—মুই গরিব লোক, জন-খেটে খাই, আপনার পয়সা হয়তো মুই দিতি পারব না, গরিব বলে দয়া করে একটা আবদার রাখবেন মোর—আল্লা দীনদুনিয়ার মালিক, আপনার ভালো করবে।
—আহা-হা, পা ছুঁয়ো না—কী—কী বলো—
-বাবু, যেখানে মোরে রাখে, ঝা করে ক্ষেতি নেই। কিন্তু বাবু, আপনি এইটে তাদের বলে দেবেন, ব্যবস্থা করে ঝেন পাঁচ-ওক্ত নামাজ আমি সেখানে পড়তি পারি—আর কিছু আমার বলবার নেই বাবু।
