মুখুজ্যেমশায় বিশ্বাস করলেন ওর কথা। ইচুকে অন্তত চোর বলে কেউ সন্দেহ করবে না। ইচু জন-খেটে খায় বটে, কিন্তু আশেপাশে চার-পাঁচ গ্রামের লোক ওকে মনে মনে শ্রদ্ধা করে। মুখুজ্যেমশায় বললেন, তোকে সুদ দিতে হবে না ইচু, আমার ধান যা কেটেছিস ও আর ফিরিয়েও দিতে হবে না। ও তোকে দিলাম। ভুলে করে ফেলেছিস তা আর এখন কী হবে।
ইচু হাতজোড় করে বললে—তা হবে না মুখুজ্যেমশায়, ও ধান নিতি পারব না, মাপ করবেন। ও ধান আমার গলা দিয়ে নামবে না। আল্লা যা আমায় হাতে তুলে দেবেন, তাই খেয়ে পরান বেঁচিয়ে রাখব—যা না দেবেন সে আমার হারাম।
মুখুজ্যেমশায় জানতেন ইচুকে। খুশি হয়ে বললেন—যাক, দুটো চিড়ে নিয়ে যা, বাড়ির মধ্যে তোর কাকিমার কাছ থেকে চেয়েনে।
সনেকপুরের বিলটায় পৌঁছে ইচু দেখলে, জনমজুর এখনও কেউ এসে পৌঁছায়নি। এটা পছন্দ করে না সে। বেশি রেটে মজুরি নেব অথচ কাজে আসব দেরি করে, মালিকের কাজে ফাঁকি দেব, এ তার ভালো লাগে না। ধান কাটে ঘড়ির কাঁটার মতো। এ কাজে তার ফাঁকি নেই।
পথ-চলতি লোকে জিজ্ঞেস করে—কী ধান এটা গো?
—বেনাঝুপি।
–এবার ফসল কেমন?
—আড়াই বিশ থেকে তিন বিশ পড়তা হতি পারে।
—বিঘেয়?
—বিঘেয় না কি কাঠায়?
ইচু হা-হা করে হাসে পথিকের অজ্ঞতায়। পথিকের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলে— কাঠায় আড়াই বিশ ধান ফলন হলি কী আমরা জন-খেটে খাতাম গো কর্তা? হ্যাঁ—হ্যাঁ—হ্যাঁ—
—বাড়ি কোথায় তোমার?
—শাইলেপাড়া।
—নাম?
—ইচু মণ্ডল।
বেলা আড়াইটের গাড়ি দূরের রেললাইন দিয়ে গড় গড় করে চলে গেল। জনমজুরদের জন্যে জমির মালিক খাবার পাঠিয়েছে, একজন লোকে বাঁকে ঝুলিয়ে আধক্রোশ দূরবর্তী সনেকপুর গ্রাম থেকে কাঁসার জামবাটিতে সাজিয়ে এনেছে গরম ভাত, কুমড়োর ঘণ্ট ও কুচো চিংড়ি ভাজা। এ সময় ভালো খেতে দিয়ে মন খুশি করা মানে বেশি কাজ আদায় করা ওদের কাছ থেকে। জমির মালিকেরা তা জানে। আখের মণ্ডল খেতে খেতে বলে—আজ এটটু সকাল সকাল যাব। মোর ঘরে নুন নেই—বাজার থেকে নুন না-নিয়ে গেলি বাচ-কাচ খেতি পাবে না।
—নুন কনে পাবা? বাজারে কালও খোঁজ করিছি, নুন মেলে না।
—ওমা, আলুনি খেয়ে খেয়ে মুখি তো পোকা পড়ে গেল।
—আর অন্ধকারে খেয়ে খেয়ে চকি ঢ্যালা বেরুল। কেরাচিন্নি তেলের মুখ দেখিনি কতকাল।
–কুমড়োর ঝালডা করেছে বেশ। সনেকপুরের এরা খেতি দেয় ভালো, পেটটা ভরি খেতি দেয়। কেরাচিন্নি পাবা কোথায়?
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আখের মণ্ডল দা-কাটা তামাক সাজলে কলকেতে। বেশ করে আগুন ধরিয়ে প্রবীণ রমজান মণ্ডলের হাতে দিয়ে বললে—হ্যাদে ধরো চাচা।
ইচু বললে—চাচা, তোমার বয়স হল ক-কুড়ি?
—তা যে-বার জোড়া বন্যে হয়েল সেবার আমি গোরু চরাতে পারি, তিরিশ কী চল্লিশ হল পেরায়—
কেউ বিশেষ বুঝতে পারলে না। জোড়া বন্যা কত বৎসর পূর্বে কোন সালে হয়েছিল কেউ জানে না। রমজানের বয়স কম হলেও সত্তর ছাড়িয়েছে। যখন সে গোরু চরায় তখন এর কেউ জন্মায়নি। সংখ্যা সম্বন্ধে জ্ঞান এদের নিতান্তই সীমাবদ্ধ।
বেলা যায়যায়। পাঁচটার গাড়ি গড় গড় করে মাদলার বিলের ওপর দিয়ে চলে গেল। ঝিঙের খেতে ফুল ফুটেছে সনেকপুরের মাঠে। নোয়ালি সর্দার জাতে বুনো, সনেকপুরের মধ্যে অবস্থাপন্ন, গোরুর পাল তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে গ্রাম্যপথ ধরে। ইচু সন্ধ্যার নামাজ শেষ করে উঠতেই বেড়ার ধার থেকে নোয়ালি সর্দার বললে— ও ইচু, কাল আমায় জন দিতি পারবা?
—না গো।
—কেন?
—সনেকপুরওয়ালাদের বিলির ধান কাটা হচ্ছে।
–চলো আমার বাড়ি, তামুক খেয়ে যাবা।
রমজান মণ্ডলকে ইচু ডাক দিলে।—ও চাচা, সর্দারের বাড়ি তামুক খাবা চলো।
নোয়ালি সর্দারের তামুক খাওয়ানোর আসল উদ্দেশ্য মজুরির রেট সম্বন্ধে দরদস্তুর করা। ইচু রমজানের পুত্রের বয়সি—সুতরাং দরদস্তুর সম্বন্ধে রমজান নেতা হয়ে কথাবার্তা চালালে।
—সাত সিকের কম পারবনি গো, এতে তুমি রাগ কোরো না সর্দার।
রমজান চাচা, তার চেয়ে আমার গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলো না কেন?
—অন্যায্য তো কিছু বলছিনে।
—অন্যায্য নয় চাচা? যা ছেল চোদ্দো আনা তাই সাত সিকে? এট্টা ভেবেচিন্তে কথা বলো। পাঁচ সিকে করো, আর চাল ডাল মাছ পেটিয়ে দেবানি তোমরা রান্না করে খেয়ো। মোদের রান্না তো তোমরা খাবা না। আমার পুকুরি এবার এই এত বড়ো বড়ো চ্যাং মাছ–
নোয়লি সর্দার হাত দিয়ে কাল্পনিক মৎস্যের দৈর্ঘ্য নির্দেশ করলে, যদি লোভ দেখিয়ে এদের কাজে টানা যায়।
রমজান ঘাড় নেড়ে বললে–ও হবে না সর্দার। সাত সিকের কম করলি—
—আর এক কলকে ধরাও চাচা! হ্যাদে, গাছের জালি শসা গোটাকতক নিয়ে যাও। দুজনে খেয়ো।
—শসা পুঁতেছিলে? মাচার শসা, না মেঠো?
—মেঠো কোথায় পাব চাচা, এই উঠোনটাতে মাচা করে দিয়েলাম—শিম বরবটি শসা—কিনে খাবার তো ক্ষ্যামতা নেই মোদের, তরিতরকারির আগুন দাম।
—সে-কথা আর বোলো না। হাটে বাগুন কেনতাম পয়সায় দু-সের তিন সের —তাই এখন বলে আটা আনা সের। খাদ্য-খাদক উঠে গেল। ঝিঙে আছে?
—তা তোমার বাপ-মায়ের আশীর্বাদে—দুটো ক-টা দেবানি তুলে, খেয়ো।
—যাক গে, পাঁচ সিকেই দিও সর্দার, কারো কাছে পেরকাশ কোরো না যেন এ-কথা।
ইচু ও রমজান তামাক খেয়ে ঝিঙে ও শসা নিয়ে উঠে চলে এল। নোয়ালি সর্দারের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। সে জানে রমজান জনমজুরের নেতা, ওর কথায় দরদস্তুর ঠিক হয়। ওকে খুশি রাখলেই হল।
