বৌদ্ধভিক্ষু কোথায় মিলিয়ে গেলেন।…কীসের শব্দে চমক ভেঙে গিয়ে দেখি ভোর হয়েছে, বাইরের বারান্দায় চাকরের ঝাঁটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ড. সেন গল্প শেষ করলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম—মূর্তিটা কোথায়?
ড. সেন বললেন—ঢাকা মিউজিয়ামে।
ফকির
ইচু মণ্ডলের আজ বেজায় সর্দি হয়েছে। ভাদ্রমাসের বর্ষণমুখর শীতল প্রভাত। তালি দেওয়া কাঁথা, ওর বউ, তার নাম নিমি, শেষরাত্রে গায়ে দিয়ে দিয়েছিল। এমন সর্দি হয়েছে যেন মনে হচ্ছে সমস্ত শরীর ভারী। ইচু শুয়েই পা দিয়ে চালের হাঁড়িটা নেড়ে দেখলে, সেটা ওর পায়ের তলার দিকেই থাকে, হাঁড়িটাতে সামান্য কিছু চাল আছে মনে হল তার।
ইচু বললে—আজ আর জনে যাব না। একটু পানি দে দিকি।
ওর বউ বললে—জনে যাবে না তবে চলবে কিসি?
—কেন, চাল তো রয়েছে তোর হাঁড়িতি, সজনে শাক-মাক সেদ্দ কর আর ভাত। নুন আছে।
—এটটু অমনি পড়ে আছে মালাটার তলায়।
—তবে আর কী? পানি দে—নামাজ করি। ইচু জল দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ওজু শেষ করে ফজরের নামাজে বসে গেল। এটি তার জীবনের অতিপ্রিয় কাজ বাল্যকাল থেকেই। মজুরি করতে না-যেতে পারে সে, কিন্তু নামাজ না-করে সে দিনের কাজ কখনো আরম্ভ করেনি।
নিমি বললে—উঠেছ যখন, তখন জনে যাও। আজকাল যুদ্ধের বাজারি দশ আনা করে জন, অন্য সময় তিন আনা হত যে। হাঁড়িতে যদি চাল থাকতি দেখলে, তবে আর তুমি জনে যাবা না! ও ভালো না।
ইচু বললে—নামাজের সময় ঘ্যান ঘ্যান করিসনে বাপু, একটু চুপ কর। নামাজ শেষ করে ইচু দা হাতে বেরিয়ে যেতে গিয়ে একটু থেমে বললে—খিদে পেয়েছে। কী আছেরে?
—কিছু নেই।
—দেখ না হাঁড়িটা—বড্ড খিদে পেয়েছিল।
—দুটো-কটা পানি দেওয়া ভাত পড়ে আছে, আর কিছু নেই।
—তাই দে। বেনবেলা না-খেয়ে গেলি দুপুরবেলা এমন খিদে পায়, দা ধরতি হাত কাঁপে। কাজ করতি পারিনে।
শাইলিপাড়া গ্রামের পাশ দিয়েই রেললাইন চলে গিয়েছে।
রেললাইন পার হয়ে ফাঁকা মাঠ একদিকে, মাঠের মধ্যে বিল, ভরা ভাদ্রের বর্ষায় থই থই করছে তার জল, ধারে ধারে কাশবনে সবে ফুল ফুটতে শুরু হয়েছে, জলে কলমিলতা জালের মতো বিস্তৃত হয়ে আছে। বনখেজুর গাছের মাথায় তেলাকুচো লতার দুলুনি। টুকটুকে লাল তেলাকুচো ফল সবুজ পাতার আড়াল থেকে উঁকি মারছে। ফিঙে পাখি ঝুলছে রেলের তারে।
রামা গোয়ালা জনমজুর নিয়ে ধান কাটছে তার নিজের জমিতে। ইচুকে দেখে বললে—যাবা কোথায়?
—সনেকপুরের বিলি ধান কাটতি।
—কত করে জন দেচ্ছে?
—সাত সিকি করে বিঘে। তামাকের আগুন দেবা?
–নিয়ে যাও, ওই বেনাঝোপের ধারে মালসা আছে।
—ভাত খেয়েই চলে আলাম, হাঁফ জিরুতে পারিনি। তামাক না-খেলি কাজে মন বসে?
মালসা থেকে আগুন নিয়ে তামাক খেতে খেতে চলল ইচু।
ইচুর গ্রাম থেকে দু-মাইল দূরে সনেকপুরের বিলে দেড়শো-দুশো বিঘে জমিতে ভাদুই ধান পেকে গাছ শুয়ে পড়েছে। যেমন বর্ষা নেমেছে, দু-পাঁচ দিনে বিলের জল বেড়ে পাকা ধান ডুবিয়ে দেবে, তাই এবার মজুরির রেট এদিকে খুব বেশি। তার ওপর আছে মজুরদের একবেলা খোরাকি।
ইচুর বড়ো ভালো লাগে আল্লার কথা শুনতে। পায়রাগাছির ফকির এ অঞ্চলের মধ্যে নামজাদা সাধু। একবার ইচু তাঁকে দেখেছিল। বাল্যকাল থেকে ইচুর ঈশ্বরের দিকে কেমন এক টান। পায়রাগাছির ফকির সে টান আরও বাড়িয়ে দেন ওর। ইচু যেন কেমন হয়ে গিয়েছে তার পর থেকে। সংসারে মন দেয় না, মজুরি করে পয়সা রোজগারের দিকে বা খাওয়া-দাওয়ার দিকেও মন নেই। কাস্তে হাতে জমির ধান কাটতে কাটতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। অনেকে ওকে তা নিয়ে খেপায়। বলে—ও ইচু, শেষকালে ফকির হবা নাকি গো? ইচু মুখে কিছু বলে না, চুপ করে থাকে। সে নিতান্ত ভালোমানুষ, কারো কোনো কথার প্রতিবাদ সে করতে পারে না।
মজুরির রেট নিয়ে দরাদরি করতে পারে না বলে অনেকে ওকে ঠকিয়ে কাজ আদায় করে। বিনি মজুরিতে অনেক সময় খাটিয়ে নেয়।
—ও ইচু, আমার বাড়ির চালকুমড়োর মাচাটা তুমি থাকতে নষ্ট হয়ে যাবে?
—কেন, কী হয়েছে চাচা?
—খুঁটিগুলো সব পড়ে গিয়েছে।
–ওবেলা এসে করে দেবানি চাচা।
ইচু কথা ঠিক রাখত নিজের। যাকে যা বলবে, তা সে রাখবার জন্যে প্রাণপণে চেষ্টা করবে এটা সকলেই জানে। মহাজনে দু-তিন বিশ ধান মুখের কথায় ওকে দিয়ে দিত, এ পর্যন্ত সে কারো টাকা বা ধান মেরে দেয়নি।
একবার পাশের গ্রামের মুখুজ্যেদের জমির ধান সে ভুল করে কেটে ফেলেছিল —বেশি নয়, কাঠাখানেক জমির পাকা ধান। মুখুজ্যেদের জমির পাশে তখন ওর নিজের ওটবন্দি জমি ছিল দু-বিঘে। মুখুজ্যেমশায় যখন জানতে পারলেন তাঁর জমির ধান কে কেটে নিয়েছে, তখন খুব হইচই জুড়ে দিলেন। কে ধান কেটেছে সন্ধান করতে পারলেন না, কারণ সবারই তখন ধান কাটবার সময়, সকলেরই বাড়িতে ধান—কার ধান তিনি গিয়ে ধরবেন? দিন-দুই পরে ইচু গিয়ে সন্ধ্যাবেলা তাঁর বাড়ি হাজির হল।
মুখুজ্যেমশায় বললেন—কী রে ইচু, কী মনে করে?
ইচু বললে—সালাম বাবু! একটা বড় ভুল করে ফেলিছি!
—কী রে?
—আপনার জমির ধানডা কাঠাখানেক কেটে ফেলে ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলোম। তা বাবু, দেড়া সুদ দিয়ে সেই ধানডা আপনারে ফেরত দিতে চাই।
—ওঃ, তোর কাজ ইচু! আমি আকাশ-পাতাল হাতড়াচ্ছি।
—আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু। সেদিন বড্ড বর্ষা, জমির আল ঠিক করতি পারলাম না। তার পর পরস্পর শুনলাম আপনার জমির ধান কে চুরি করেছে বলে আপনি খোঁজ করছেন। তখন ভাবলাম বাবুরে বলে আসি। খেতি লোকসান যখন অজান্তে করে ফেলেছি, তখন দেড়া বাড়ি সুদ দেব আপনারে।
